গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক
খুলনাভিত্তিক ফাতাহ কমব্যাট সিস্টেমের (এফসিএস) প্রশিক্ষক ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) গাজীপুর মহানগর আহ্বায়ক কমিটির যুগ্ম সদস্যসচিব আতাউল্লাহ শাহকে বহিষ্কার করেছে দলটি। উগ্রবাদী সংগঠনের কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত থাকার সন্দেহে গ্রেপ্তারের পর তাঁকে এই বহিষ্কারাদেশ দেওয়া হয়।
মঙ্গলবার (০৭ জুলাই) এনসিপির দপ্তর সেলের সদস্য সাদিয়া ফারজানা দিনার স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বহিষ্কারের বিষয়টি জানানো হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, আতাউল্লাহ শাহের বিরুদ্ধে দলের নীতি ও আদর্শবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে। এর ভিত্তিতে দলীয় গঠনতন্ত্র ও প্রযোজ্য সাংগঠনিক বিধান অনুযায়ী তাঁকে গাজীপুর মহানগর আহ্বায়ক কমিটির যুগ্ম সদস্যসচিব পদসহ দলের সব পর্যায়ের সাংগঠনিক দায়িত্ব ও প্রাথমিক সদস্যপদ থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে।
এনসিপির কেন্দ্রীয় শৃঙ্খলা কমিটির সদস্য শাহেরিন ইরা সংবাদমাধ্যমকে বলেন, আতাউল্লাহ শাহ সরাসরি এফসিএসের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। গত দুই-তিন মাস তিনি সাংগঠনিকভাবে নিষ্ক্রিয় থাকায় দল বিষয়টি জানতে পারেনি। তাঁর গ্রেপ্তারের পরই এই সংশ্লিষ্টতা দলের নজরে আসে বলে জানান তিনি।
খুলনাভিত্তিক ফাতাহ কমব্যাট সিস্টেম (এফসিএস) একটি স্ব-প্রতিরক্ষা বা মার্শাল আর্ট প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান। সংগঠনটির বিরুদ্ধে মার্শাল আর্ট শেখানোর আড়ালে দেশের বিভিন্ন এলাকায় তরুণদের উগ্রবাদী কর্মকাণ্ডে উদ্বুদ্ধ করার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। তবে সংগঠনটির সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা এই সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

জানা গেছে, গত ৫ জুলাই ভোরে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থানাধীন মিনি কক্সবাজার এলাকায় আমিন মোহাম্মদ গ্রুপের পাশের বালুর মাঠে অভিযান চালিয়ে এফসিএসের প্রশিক্ষণপ্রধান শাহ আমানত সাবিরসহ (২৩) ছয়জনকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর পুলিশ। গ্রেপ্তার অন্যরা হলেন মো. হোসাইন তানিম (২০), মো. জুনায়েদ (২২), আতাউল্লাহ শাহ (৩২), মো. আবিদুর রহমান (২০) ও মো. বায়েজিদ (৩০)।
তাঁদের মধ্যে শাহ আমানত সাবির ফাতাহ কমব্যাট সিস্টেমের (এফসিএস) প্রশিক্ষক ও প্রতিষ্ঠাতা এবং আতাউল্লাহ শাহ এফসিএসের প্রশিক্ষক ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) গাজীপুর মহানগর আহ্বায়ক কমিটির যুগ্ম সদস্যসচিব।
পরে ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় তাঁদের আদালতে সোপর্দ করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করলে আদালত তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
গ্রেপ্তারের পর যাত্রাবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ রাজু সংবাদমাধ্যমকে জানান, একটি সাধারণ ডায়েরির (জিডি) ভিত্তিতে পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) এ বি সিদ্দিকের নেতৃত্বে গত ৫ জুলাই ভোরে অভিযান পরিচালিত হয়। গোপন সংবাদ ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায়, উগ্রবাদী সংগঠনের কয়েকজন ব্যক্তি সেখানে কার্যক্রম পরিচালনার লক্ষ্যে প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্যে সমবেত হয়েছেন। পরে থানার একাধিক টিম ঘটনাস্থলে অভিযান চালিয়ে পালানোর চেষ্টাকালে ছয়জনকে আটক করে।
ওসি রাজু বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আটক ব্যক্তিরা ঘটনাস্থলে সমবেত হওয়ার সন্তোষজনক কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। গোয়েন্দা তথ্য ও প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতে ধারণা করা হচ্ছে, তাঁরা উগ্রবাদী সংগঠনের কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন। তবে বিষয়টি এখনো তদন্তাধীন।
সূত্র জানায়, ঘটনার সূত্রপাত হয় একদিন আগে। শনিবার ভোরে সাবির রমনা পার্কে প্রশিক্ষণ দিতে গেলে সেখানে আগে থেকেই রমনা থানা-পুলিশের উপস্থিতি দেখতে পান। পুলিশ প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে বাধা দিলে সাবির বায়তুল মোকাররমে চলে যান। এরপর প্রশিক্ষণার্থীদের সঙ্গে পরামর্শ করে কোনাপাড়া বালুর মাঠে যান, যেখানে অন্তত ১৮ জন প্রশিক্ষণ নিতে এসেছিলেন।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার নিয়াজ মেহেদী সংবাদমাধ্যমকে জানান, ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় ছয়জনকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করা হলে আদালত তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। জিজ্ঞাসাবাদে তাঁদের সমবেত হওয়ার কারণ ও অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল কি না, তা জানার চেষ্টা করা হবে।
এর আগে আল জাজিরার অনুসন্ধানী দলের চুক্তিভিত্তিক সদস্য সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের ফেসবুকে এক পোস্টে দাবি করেন, শাহ আমানত সাবিরের সরাসরি নেতৃত্বে ফাতাহ কমব্যাট সিস্টেমের (এফসিএস) কার্যক্রম পরিচালিত হয়। তাঁর দাবি, এই চক্রের নেটওয়ার্ক বেশ বিস্তৃত এবং এর সঙ্গে আফগানিস্তানফেরত উগ্রপন্থীদের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, বসিলায় বিদেশি দাতব্য প্রতিষ্ঠানের অর্থে আবাসন প্রকল্পের আড়ালে তারা তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের (টিটিপি) জন্য রিক্রুটমেন্ট প্রক্রিয়া চালাচ্ছে। পাশাপাশি এই চক্রটি টিটিপির আদলে তেহরিক-ই-তালেবান বাংলাদেশ (টিটিবি) গঠনের চেষ্টাও চালাচ্ছে বলে তার দাবি।
সাংবাদিক সায়েরের দাবি অনুযায়ী, ফাতাহ কমব্যাট সিস্টেম এ পর্যন্ত খুলনা, যশোর ও চাঁদপুর জেলায় এবং সুতারখালী (খুলনা) ও অভয়নগর (যশোর) উপজেলায় মার্শাল আর্ট সেন্টার পরিচালনা করছে।
ছয়জন গ্রেপ্তারের পর ফাতাহ কমব্যাট সিস্টেমের (এফসিএস) ফেসবুক পেজের প্রশাসক এক পোস্টে দাবি করেন, ঢাকা শাখায় প্রশিক্ষণে আসার পথে সংগঠনটির একেবারে নতুন দুজন শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং তাঁদের ছাড়ানোর জন্যই সাবির থানায় গিয়েছিলেন।