অন্তরঙ্গ ভিডিও ভাইরাল: নৈতিক স্খলনের অভিযোগে আসন হারানোর ঝুঁকিতে জামায়াত এমপি

দ্বিতীয় বিয়ে নিষিদ্ধ না হলেও প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমতি না নিলে তা বেআইনি এবং ‘মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) আইন, ১৯৭৪’ অনুযায়ী নিবন্ধনের অযোগ্য হয়ে পড়ে।

অন্তরঙ্গ ভিডিও ভাইরাল: নৈতিক স্খলনের অভিযোগে আসন হারানোর ঝুঁকিতে জামায়াত এমপি

গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক তরুণীর সঙ্গে অন্তরঙ্গ ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম দাবি করেছেন, এটি তার ‘দ্বিতীয় বিয়ে’।

তবে আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই দাবি বাংলাদেশের আইনি শর্ত পূরণ করে না—ফলে তার সংসদীয় পদের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

একটি হোটেলে এক তরুণীর সঙ্গে কাটানো অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ভিডিও ক্লিপ ভাইরাল হওয়ার পর এমপি নজরুল ফেসবুকে নীরবতা ভাঙেন এবং দাবি করেন, তারা বিবাহিত। শুরুতে জামায়াত সমর্থকরা ভিডিওটিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি বলে দাবি করলেও পরে নজরুল নিজেই ওই নারীর পরিচয় স্বীকার করেন এবং জানান, গত ১৭ জুন তিনি তাকে বিয়ে করেছেন।

ফাঁস হওয়া একাধিক ভিডিওর একটিতে দেখা যায়, নজরুল দুই হাত জোড় করে ক্ষমা প্রার্থনা করছেন এবং দাবি করছেন, হোটেল কক্ষটি তার গাড়িচালক ভাড়া করেছিলেন।

বাংলাদেশের ‘মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১’ অনুযায়ী সালিসি পরিষদের পূর্বানুমতি ছাড়া বিদ্যমান স্ত্রী থাকা অবস্থায় কোনো পুরুষ পুনরায় বিয়ে করতে পারেন না।

আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্বিতীয় বিয়ে নিষিদ্ধ না হলেও প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমতি না নিলে তা বেআইনি এবং ‘মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) আইন, ১৯৭৪’ অনুযায়ী নিবন্ধনের অযোগ্য হয়ে পড়ে।

নজরুল দাবি করেন, সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা গ্রামে তরুণীর বাবার বাড়িতে বিয়েটি অনুষ্ঠিত হয়। তবে গাবুরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জিএম মাসুদুল আলম জানান, দ্বিতীয় বিয়ের অনুমতির জন্য এমপি কখনও আবেদন করেননি। বিয়ে সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, তিনি এ বিষয়ে সেদিনই শুনেছেন।

কাবিননামায় সিলমোহরকারী কাজী বদরুল আলম মো. বাকী বিল্লাহ জানান, তিনি বিয়ে পড়াননি, শুধু নিবন্ধন করেছেন—প্রথম স্ত্রী উপস্থিত ছিলেন বলেই তিনি তা করেছেন। আইনজীবীরা বলছেন, প্রথম স্ত্রীর উপস্থিতি সালিসি পরিষদের অনুমতির বিকল্প হতে পারে না।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী নাহিদা খানম বলেন, শারীরিক অক্ষমতা, সন্তান ধারণে অক্ষমতা বা গুরুতর দাম্পত্য বিরোধের মতো নির্দিষ্ট কারণ দেখিয়েই কেবল সালিসি পরিষদে দ্বিতীয় বিয়ের আবেদন করা যায়। তবে নজরুলের প্রথম স্ত্রী সন্তান ধারণে অক্ষম নন—তার নির্বাচনী হলফনামাতেই সন্তানদের উল্লেখ রয়েছে।

আইন অনুযায়ী, সালিসি পরিষদের অনুমতি ছাড়া পুনর্বিবাহ করলে সর্বোচ্চ এক বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড, ১০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড হতে পারে এবং বিদ্যমান স্ত্রীর বকেয়া দেনমোহর অবিলম্বে পরিশোধ করতে হবে।

নজরুল দাবি করেছেন, ১৩ জুলাই ঢাকার মগবাজারে তার দুই স্ত্রীসহ শ্বশুর মো. মাসুম বিল্লাহর অফিসে গেলে দ্বিতীয় স্ত্রীর মামা ওবায়দুল্লাহ কয়েকজন অচেনা লোক নিয়ে তাদের আটকে রাখেন এবং এক লাখ টাকা আদায় করেন।

তবে এত বড় অভিযোগের পরও তিনি থানায় কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করেননি। হাতিরঝিল ও রমনা মডেল থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন, এমপি তাদের কাছে কোনো অভিযোগ নিয়ে আসেননি।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, অতীতে গাড়ির যন্ত্রাংশ চুরির মতো তুলনামূলক ছোট ঘটনায়ও তিনি পুলিশের দ্বারস্থ হয়েছিলেন বলে পল্লবী থানা জানিয়েছে।

তরুণীর জীবনবৃত্তান্তে নজরুল ২২ জুন ২০২৬ তারিখে ‘জোর সুপারিশ করছি’ লিখে স্বাক্ষর করেছিলেন—অথচ একই জীবনবৃত্তান্তে তার বৈবাহিক অবস্থা লেখা ছিল ‘অবিবাহিত’। এ ছাড়া সুপারিশপত্রে এমপির সই এবং কাবিননামায় বর হিসেবে করা সইয়ের মধ্যেও স্পষ্ট গরমিল ধরা পড়েছে।

প্রথম স্ত্রী প্রকাশ্যে স্বামীর পাশে দাঁড়িয়েছেন এবং মিথ্যা তথ্য ছড়ানোর অভিযোগে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বিয়ে ব্যক্তিগত বিষয় হলেও আইনি বাধ্যবাধকতা সবার জন্য প্রযোজ্য, বিশেষত একজন জনপ্রতিনিধির ক্ষেত্রে তা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক প্রক্রিয়া অনুসরণ না হলে আইনি পরিণতির পাশাপাশি তার নৈতিক যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

ভাইরাল হওয়া প্রায় ছয় মিনিটের দীর্ঘতম ফুটেজে দেখা যায়, কয়েকজন ব্যক্তি হোটেল কক্ষের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে নজরুল ও তরুণীকে জিজ্ঞাসাবাদ করছেন। তারা দুজনের নাম-পরিচয় ও ঠিকানা জানতে চান। ফুটেজে থাকা কয়েকজন অভিযোগ করেন, প্রলোভন দেখিয়ে তরুণীকে সেখানে আনা হয়েছে বলে তাদের কাছে প্রমাণ রয়েছে।

ভিডিওর শেষে নজরুল নিজেকে সাতক্ষীরার জামায়াত নেতা হিসেবে পরিচয় দিয়ে বিষয়টি সামাজিক আপস-রফার মাধ্যমে মেটানোর প্রস্তাব দেন।

সূত্র: ডেইলি টাইমস অব বাংলাদেশ