শিগগিরই পদত্যাগ করছে রাষ্ট্রপতি: হাসিনার সঙ্গে ফোনালাপের রেশ ধরেই এই বার্তা?

গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ওই ফোনালাপের বিষয়ে জানতে পারে, এরপরই তাঁকে পদত্যাগের বার্তা দেওয়া হয় বলে সূত্রগুলোর দাবি।

শিগগিরই পদত্যাগ করছে রাষ্ট্রপতি: হাসিনার সঙ্গে ফোনালাপের রেশ ধরেই এই বার্তা?

গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক 

লন্ডন সফরে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলার পরই রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে পদত্যাগের বার্তা দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে একাধিক সূত্র।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য, রাষ্ট্রপতি শিগগিরই পদত্যাগ করতে পারেন। কয়েক সপ্তাহ ধরে এই সম্ভাবনা আরও জোরালো হয়ে উঠেছে।

২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল দায়িত্ব নেন সাহাবুদ্দিন। ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আগের শীর্ষ কোনো সাংবিধানিক পদে এখনো বহাল থাকা একমাত্র ব্যক্তি তিনি

সূত্রগুলোর দাবি, চলতি বছরের মে মাসে চিকিৎসার জন্য লন্ডনে থাকা অবস্থায় রাষ্ট্রপতি টেলিফোনে শেখ হাসিনার সঙ্গে কথা বলেন। ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ভারতে অবস্থান করছেন হাসিনা। রাষ্ট্রপতি ৯ মে লন্ডনে যান, ফেরেন ১৮ মে। পরে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ওই ফোনালাপের বিষয়ে জানতে পারে, এরপরই তাঁকে পদত্যাগের বার্তা দেওয়া হয় বলে সূত্রগুলোর দাবি।

তবে বিএনপির এক জ্যেষ্ঠ নেতার ভাষ্য, সম্ভাব্য পদত্যাগের পেছনে শুধু ওই ফোনালাপই কারণ নয়, বিষয়টি আরও জটিল।

তিনি সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, শেখ হাসিনা সম্প্রতি ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরার পরিকল্পনার কথা জানানোর পর রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে।

গত ১০ জুলাই রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনা ও নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে ভারত থেকে দেশে ফিরে আত্মসমর্পণের পরিকল্পনা করছেন। একই সঙ্গে দলটির কিছু নেতা-কর্মীর পুনর্গঠন-উদ্যোগও পর্যবেক্ষণ করছে কর্তৃপক্ষ।

ওই বিএনপি নেতার ভাষ্য, রাষ্ট্রপতির পদত্যাগকে সরকার একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে তুলে ধরতে চাইবে—তারা পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটাতে পারে এমন যেকোনো কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে থাকবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র সংবাদ মাধ্যমকে জানায়, গত ১৭ জুলাই মন্ত্রিসভার এক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আওয়ামী লীগ, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও তাদের সহযোগী সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে চলমান অভিযান জোরদারের নির্দেশ দেন।

তবে রাষ্ট্রপতি ঠিক কবে পদত্যাগ করতে পারেন বা তাঁর স্থলাভিষিক্ত কে হবেন, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানা গেছে। 

এ বিষয়ে বক্তব্যের জন্য সংবাদ মাধ্যম থেকে রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিব সরওয়ার আলমের সঙ্গে বারবার ফোনে যোগাযোগ ও বার্তা পাঠানো হলেও বৃহস্পতিবার দুপুর পর্যন্ত কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

দুদক থেকে বঙ্গভবন

২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন মো. সাহাবুদ্দিন। আওয়ামী লীগের মনোনয়নে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তিনি নির্বাচিত হয়েছিলেন। তাঁর পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ২০২৮ সালের এপ্রিলে।

২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তিনি বলেছিলেন, ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর মেয়াদের মাঝামাঝি সময়ে পদত্যাগ করতে চান। তখন তিনি আরও বলেন, মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের আচরণে তিনি অপমানিত বোধ করেছেন। বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর চলতি বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি এক সংবাদপত্রকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সাহাবুদ্দিন বলেন, সরকার চাইলে তিনি দায়িত্বে থাকবেন, অন্যথায় স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করবেন।

সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করলে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত জাতীয় সংসদের স্পিকার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন।

সরকারের উচ্চপর্যায়ের একটি সূত্রের ভাষ্য, সাহাবুদ্দিনের পদ ছাড়াটা ‘স্বাভাবিক প্রক্রিয়া’। সূত্রটি আরও দাবি করে, রাষ্ট্রপতি আগের রাজনৈতিক যোগাযোগ পুনঃস্থাপনের চেষ্টা করছেন—এমন তথ্য সরকারকে অসন্তুষ্ট করেছে। গণ-অভ্যুত্থান-পূর্ববর্তী সময়ের কোনো ব্যক্তিকে দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে রাখাকে সরকার আর সমীচীন মনে করছে না বলেও সূত্রটির দাবি।

বঙ্গভবন-সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র সংবাদ মাধ্যমকে জানায়, এক-দুই দিনের মধ্যেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসতে পারে। তবে একই সূত্রের তথ্যমতে, আগামী ২৯ জুলাই চারটি দেশের অনাবাসিক রাষ্ট্রদূতের পরিচয়পত্র গ্রহণ উপলক্ষে রাষ্ট্রপতির একটি পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি রয়েছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আমূল বদলে যায়। সে সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছাড়েন। সংসদ ভেঙে দেওয়া ও অন্তর্বর্তী সরকার গঠনসহ রাজনৈতিক পালাবদলের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পর্যায়ে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন সাহাবুদ্দিন।

গণ-অভ্যুত্থানের পর ছাত্রনেতারা রাষ্ট্রপতির অপসারণ চেয়েছিলেন। তাঁর পদত্যাগের দাবিতে বঙ্গভবন ঘেরাওসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে জুলাই আন্দোলনকেন্দ্রিক বিভিন্ন সংগঠন। তবে অন্তর্বর্তী সরকার তাঁকে সরানোর কোনো উদ্যোগ নেয়নি।

পরবর্তী সময়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় আসে বিএনপি, ফলে রাষ্ট্রপতি ও সরকারের রাজনৈতিক পটভূমিতে ভিন্নতা তৈরি হয়। তবে সরকার বা বিএনপি প্রকাশ্যে কখনো তাঁর পদত্যাগ দাবি করেনি।

সাহাবুদ্দিনকে রাষ্ট্রপতি করা নিয়ে আওয়ামী লীগের আমলেই নানামুখী আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয়েছিল। ২০১১ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত তিনি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, সে সময় তাঁর বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ ওঠে। পরে বিতর্কিত ব্যবসায়ী গ্রুপ এস আলমের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতাও প্রকাশ্যে আসে। দুদকের দায়িত্ব শেষে তিনি ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের ভাইস চেয়ারম্যান ও এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন—তখন এই দুই ব্যাংকের মালিক ছিল প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গ্রুপ এস আলম, যাদের সময়ে ব্যাংক দুটিতে সবচেয়ে ব্যাপক লুটপাট হয়।

ইসলামী ব্যাংকের পদে থাকা অবস্থাতেই সাহাবুদ্দিনকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে নিয়োগ দেয় তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। ব্যাংক থেকে পদত্যাগ করে ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল থেকে তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে আলোচনা ছিল, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর বোন শেখ রেহানা মিলে সাহাবুদ্দিনকে রাষ্ট্রপতি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে তখন তাঁকে এস আলমের প্রতিনিধি হিসেবেও আখ্যা দেওয়া হয়।

সূত্রগুলো বলছে, রাষ্ট্রপতি নিজে থেকে দায়িত্ব ছাড়েন কি না, তা দেখতে ক্ষমতাসীন দল কিছুটা সময় নিয়েছে। সম্প্রতি তাঁকে বিএনপির উচ্চপর্যায়ের মনোভাব জানানো হয়েছে।

রাষ্ট্রপতি শেষ পর্যন্ত পদত্যাগ করলে গণ-অভ্যুত্থান ও পরবর্তী জাতীয় নির্বাচনের পর রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটবে। একই সঙ্গে ক্ষমতায় আসার পর নিজেদের পছন্দের কাউকে রাষ্ট্রপতি করার সুযোগ প্রথমবারের মতো পাবে বিএনপি। পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচন নতুন রাষ্ট্রপতির মেয়াদে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকায় পরবর্তী রাষ্ট্রপতি কে হচ্ছেন, তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে যথেষ্ট আগ্রহ রয়েছে।