গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক
কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারে গত ১৩ বছরে ৭০ জন বন্দির মৃত্যু হয়েছে। দীর্ঘদিন একই কারাকক্ষে বন্দিজীবন, মানসিক অবসাদ, নানা রোগ ও বার্ধক্যজনিত জটিলতাকে এর কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। মৃতদের মধ্যে আনুমানিক ৪২ জনই ছিলেন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত (ফাঁসি) বন্দি।
২০১৩ সালের ৬ মার্চ থেকে ২০২৬ সালের ২৮ মে পর্যন্ত সময়ে এসব মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। মৃতদের মধ্যে ৪২ জন ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত এবং ২৮ জন সাধারণ বন্দি ছিলেন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের অপেক্ষা, আপিল ও আইনি প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা এবং অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটানো বন্দিদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। দীর্ঘদিন কারাগারে থাকার কারণে অনেক বন্দির সঙ্গে পরিবার-পরিজনের যোগাযোগও বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। চরম মানসিক বিপর্যয়ের মধ্যে দিন কাটাতে গিয়ে এই সময়ে দুজন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি আত্মহত্যাও করেছেন।
কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মামুন গত ১৬ জুলাই সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, হাইসিকিউরিটি কারাগারে বন্দি রাখা শুরুর (২০১৩ সাল) পর থেকে বার্ধক্যজনিত জটিলতা ও বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে ৭০ জন বন্দির মৃত্যু হয়েছে, যাদের অধিকাংশই ছিলেন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি এবং তাদের অধিকাংশের আপিল তখনও বিচারাধীন ছিল।
কারা নথি অনুযায়ী, হৃদরোগ, কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট, বার্ধক্যজনিত জটিলতাসহ বিভিন্ন শারীরিক অসুস্থতায় এসব বন্দির মৃত্যু হয়েছে। গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়া বন্দিদের উন্নত চিকিৎসার জন্য কারাগারের বাইরে সরকারি হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা তাদের হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই মৃত্যু হয়েছে বলে ‘ব্রট ডেড’ ঘোষণা করেন।
আব্দুল্লাহ আল মামুন সংবাদ মাধ্যমকে জানান, মৃত ৭০ বন্দির মধ্যে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় কারাগারে বন্দিদের বিদ্রোহের ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত ৬ জনও এই তালিকায় রয়েছেন।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দিদের মধ্যে সর্বশেষ ২৮ মে মারা যান কয়েদি নং-৮১৮৭/এ মো. আলাউদ্দিন। এর আগে ২ মে মারা যান ৬৮৬০/এ আকবর আলী ওরফে অটো আকবর। ২০২৫ সালে মারা যাওয়াদের মধ্যে ছিলেন কয়েদি নং ৫০৫০/এ সোহরাব ফকির।
নথিতে উল্লেখিত অন্যান্য মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দিরা হলেন— ৪৪৩/এ মো. রজব আলী, ২১৬/এ ফরিদ, ৬৬১/এ কামু ওরফে কামরুল, ২৪২/এ আলমগীর, ১৫২৫/এ মির্জা হাবিবুর রহমান, ১১৫২/এ গোপাল করাতী, ১৩১/এ রহিম খান, ১৬১৭/এ নুরুল ইসলাম হাওলাদার, ২৯১১/এ মো. আল আমিন, ৩১৮১/এ ওমর আলী, ৬৭৫/এ সিরাজুল ইসলাম, ৭৪৫/এ বিশারত ওরফে বিশা, ১৪২৯/এ আবদুল গফুর, ৮৪৭/এ আশরাফ আলী ওরফে মালেক, ৩৪৭৪/এ আব্দুর রহিম ওরফে কাচা আবু, ৩৬৫০/এ মো. নজরুল ইসলাম, ৩২৪০/এ আফসার আলী শেখ, ১৯০/এ দুধ মিয়া, ৩৬৯৪/এ হাফেজ মাওলানা ইয়াহিয়া, ২৭৩৫/এ সামসুল হক ওরফে পাঠা সামসুল, ৪২৬৯/এ সাত্তার প্যাদা, ৪৪১২/এ মো. মাহবুবুর রহমান, ৪২৬৩/এ মো. জনি, ২৪৪৯/এ মো. মুলুক হোসেন ভূঁইয়া, ৪৩২২/এ কান্তি মারাক, ৪৩৩৪/এ লিয়াকত আলী, ৩৭০১/এ সিরাজ প্রামাণিক, ৫০২৭/এ শাহিদ খাঁ, ৫০৪৫/এ গোলাম মোস্তফা, ৩৬১০/এ মো. ডালিম, ৩৬২১/এ কালাম ওরফে নমো কালাম, ৪০৪৮/এ আবু বক্কর সিদ্দিক, ২৫৯৭/এ আমিরুল ইসলাম ওরফে রাশেদ উদ্দিন, ৪২৭৭/এ জহিরুল হক ভূঁইয়া ওরফে জহির মেম্বার, ৪৯৭৬/এ নজরুল ইসলাম, ৫০৪৮/এ সুমন ঢালী ওরফে ডাকু সুমন, ৩৮১৮/এ হেলপার আকরাম, ২১০৯/এ আনোয়ার হোসেন সরকার, ৬০৬৪/এ বদর উদ্দিন ওরফে বদু, ৪৪৯৯/এ রাধে শ্যাম হরিজন জমাদার, ৪৫৯৬/এ মো. আফজাল হোসেন, ৪৬২৩/এ মো. আসলাম হোসেন র্যাশ এবং ৫৯০১/এ মহিউদ্দিন ওরফে মহি ফিটার।
কারা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের বিভিন্ন কারাগারে মোট ২ হাজার ৭০৮ জন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি রয়েছেন, যাদের মধ্যে ২ হাজার ৬১৫ জন পুরুষ ও ৯৩ জন নারী। কারা অধিদপ্তরের সহকারী কারা মহাপরিদর্শক (গণমাধ্যম ও উন্নয়ন) মো. জান্নাত উল ফরহাদ সংবাদ মাধ্যমকে জানান, তাদের প্রত্যেকের রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল বিচারাধীন রয়েছে।
তিনি বলেন, ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার (কেরানীগঞ্জ)-সহ দেশের ৭৫টি কারাগারে বন্দিদের প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে হাসপাতাল ও চিকিৎসক রয়েছেন, এবং গুরুতর অসুস্থ বন্দিদের দ্রুত বাইরের হাসপাতালে নেওয়ার জন্য আনুমানিক ২০ থেকে ২২টি কারাগারে নিজস্ব অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে। এ ছাড়া ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার প্রাঙ্গণে ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট একটি আধুনিক কারা হাসপাতাল নির্মাণের প্রকল্প প্রক্রিয়াধীন।
কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারে বর্তমানে একতলা ভবনে একটি কারা হাসপাতাল আছে, যেখানে বহির্বিভাগে রোগী দেখা ও প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়। সেখানে একটি ইসিজি মেশিন রয়েছে এবং ছোটখাটো সাধারণ অস্ত্রোপচারও করা হয়। দুজন চিকিৎসক ও একজন ফার্মাসিস্টসহ কয়েকজন কর্মী সেখানে দায়িত্বে আছেন। কারাগারের নিজস্ব অ্যাম্বুলেন্স থাকায় চিকিৎসকের সুপারিশ পাওয়ার পর গুরুতর অসুস্থ বন্দিদের দ্রুত বাইরের সরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয়।
একটি সূত্র জানায়, বিভিন্ন কারাগারে এমন অনেক বন্দি আছেন যাদের সঙ্গে পরিবারের যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।
পরিবার থাকলেও অনেকে খোঁজখবর নেন না, ফলে চিকিৎসাসহ সার্বিক দায়িত্ব কারা কর্তৃপক্ষকেই নিতে হয়। কারা সূত্র জানায়, বন্দিদের এমআরআই, সিটি স্ক্যানসহ জটিল পরীক্ষার ব্যয় কারা কর্তৃপক্ষ বহন করে। সম্প্রতি এক বন্দির হৃদযন্ত্রে ভালভ প্রতিস্থাপনের খরচও কারা কর্তৃপক্ষ বহন করেছে। এসব খরচ মেটাতে ব্যবহার করা হয় ‘বন্দি কল্যাণ ফান্ড’, যা কারাগারের বেকারির লভ্যাংশ দিয়ে পরিচালিত হয়। অসচ্ছল ও পরিবার-বিচ্ছিন্ন অসুস্থ বন্দিদের চিকিৎসায় এই তহবিল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কারা কর্মকর্তারা বলছেন, বন্দি অবস্থায় প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব, তাই জীবন রক্ষায় সম্ভাব্য সব পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই মারা যাওয়া রোগীদের বিষয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের আবাসিক চিকিৎসক (আরএস) ডা. মোস্তাক আহমেদ সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, চিকিৎসকরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তাদের ব্রট ডেড ঘোষণা করেন, অর্থাৎ ওই ব্যক্তিকে হাসপাতাল মৃত অবস্থায় গ্রহণ করেছে। তিনি বলেন, আত্মহত্যা করে হাসপাতালে আনা হলে চিকিৎসকরা গলায় থাকা দাগ দেখে তা প্রাথমিকভাবে শনাক্ত করতে পারেন। একইভাবে শরীরে আঘাতের চিহ্ন থাকলে সেটি নতুন না পুরোনো এবং কতক্ষণ আগে হয়েছে তা পর্যবেক্ষণ করে চিকিৎসকরা মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে ধারণা নিয়ে ডেথ সার্টিফিকেটে তা উল্লেখ করেন।
তিনি আরও বলেন, অসুস্থতাজনিত কারণে মারা গেলেও সরকারি হাসপাতালের নিয়ম অনুযায়ী ডেথ সার্টিফিকেটে ‘ব্রট ডেড’-এর পাশাপাশি ‘পুলিশ কেস’ উল্লেখ করতে হয়। সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে স্বজনরা ময়নাতদন্ত না চাইলে পুলিশের লিখিত ছাড়পত্রের ভিত্তিতে ছাড় দেওয়া গেলেও কয়েদিদের ক্ষেত্রে নিয়ম আলাদা— মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দিদের ক্ষেত্রে মৃত অবস্থায় আনা হলেও আইন অনুযায়ী ময়নাতদন্ত বাধ্যতামূলক।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের একজন সাবেক সিনিয়র চিকিৎসক সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, দীর্ঘদিন বন্দিজীবন শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। সীমিত পরিসরে বসবাস, নিরন্তর মানসিক চাপ, অনিশ্চয়তা ও শারীরিক কর্মকাণ্ডের অভাবে উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, বিষণ্নতা, অনিদ্রা, গ্যাস্ট্রিক, বাত এবং চোখ ও শ্বাসতন্ত্রের নানা রোগ জটিল রূপ ধারণ করে, যা অকাল মৃত্যুর ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
দেশজুড়ে ৭৫টি কারাগারের মধ্যে কেবল একটিতেই ১৩ বছরে ৭০ জন বন্দির মৃত্যু— দীর্ঘ সময় আপিল শুনানির অপেক্ষায় থাকা মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের জীবনযাপন, স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং বন্দিজীবনের মানবিক ও আইনি বাস্তবতাকে নতুন করে সামনে এনেছে।
সূত্র: বাংলানিউজ