ইরান যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজছে ট্রাম্প

লক্ষ্য অর্জনের স্পষ্ট কোনো পথ প্রেসিডেন্টের সামনে নেই। জয়ের সুনির্দিষ্ট কৌশল ছাড়াই যুদ্ধে জড়ানোর পর, এখন তিনি সম্মানজনকভাবে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজছেন।

ইরান যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজছে ট্রাম্প

গাজীপুর কণ্ঠ, আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রেসিডেন্টের ঘনিষ্ঠরা বলছেন, ট্রাম্পের হতাশার পুরোটাই যুদ্ধকেন্দ্রিক নয়, তবে এর বড় অংশই যুদ্ধ থেকে আসছে।

ওয়াশিংটন পোস্ট ও ইপসোসের সাম্প্রতিক এক জরিপ অনুযায়ী, মাত্র ২৯ শতাংশ আমেরিকান এই যুদ্ধ পরিচালনায় ট্রাম্পের ভূমিকা সমর্থন করেছেন।

মিত্ররাই যখন এই যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পক্ষে, তখন যেকোনো মূল্যে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ট্রাম্প নিজেকে আরও চাপে ফেলছেন।

স্পিকার মাইক জনসন গত সপ্তাহে বলেন, “আমাদের এটা শেষ করতে হবে।” ট্রাম্পের সবচেয়ে কট্টর সমর্থকদের কাছ থেকেও এখন এমন মন্তব্য শোনা যাচ্ছে।

নিউ ইয়র্ক টাইমস লিখেছে, লক্ষ্য অর্জনের স্পষ্ট কোনো পথ প্রেসিডেন্টের সামনে নেই। জয়ের সুনির্দিষ্ট কৌশল ছাড়াই যুদ্ধে জড়ানোর পর, এখন তিনি সম্মানজনকভাবে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজছেন।

এক মাস আগেও ট্রাম্প আত্মবিশ্বাসী ছিলেন যে জয়ের পথ তিনি পেয়ে গেছেন। গত ১৭ জুন তিনি ফ্রান্সের ভার্সাই প্রাসাদে তাড়াহুড়ো করে ১৪ দফার একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে সই করেন। ১৯১৯ সালে সেখানেই প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটেছিল।

সে সময় ট্রাম্প বলেছিলেন, ইরানের একদল ‘যুক্তিবাদী’ নেতা এখন বুঝতে পারছেন কীসে তাদের অর্থনীতির লাভ হবে।

১৪ জুন নিউ ইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, “আমি বিশ্বাস করি, তারা যথেষ্ট শিক্ষা পেয়েছে।”

তিনি দাবি করেন, তাঁর ব্যাপক হামলার হুমকির কারণেই ইরান পিছু হটতে বাধ্য হয়েছিল। “আমরা বড় ধরনের হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম, আর তারা বলল, ‘দয়া করে এটা করবেন না, আমরা চুক্তি করব।’ আর ঠিক তার পরপরই আমরা চুক্তি করলাম,” বলেছিলেন তিনি।

কিন্তু সেই চুক্তি টিকেছিল মাত্র দুই সপ্তাহ।

নিউ ইয়র্ক টাইমস লিখেছে, যেসব ইরানি নেতা চুক্তি নিয়ে আলোচনা করছিলেন, তাঁরা বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েছিলেন বলে ধারণা করা হয়। হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নির্ধারিত চ্যানেল ব্যবহার করতে অস্বীকৃতি জানানো জাহাজগুলোর ওপর গুলি চালায় আইআরজিসি।

ট্রাম্প সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ইরানি নেতারা চান বিদেশে আটকে থাকা কোটি কোটি ডলারের তহবিল অবমুক্ত হোক এবং তেল রপ্তানি ফের চালু হোক। কিন্তু আইআরজিসি নিজেদের নিয়ন্ত্রণ জাহির করতেই বেশি আগ্রহী বলে মনে হচ্ছে।

পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে নিউ ইয়র্ক টাইমস লিখেছে, ট্রাম্পের সামনে এখন তিনটি পথ খোলা—আরও সামরিক হামলা চালানো, আরও কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা, অথবা বিজয় ঘোষণা করে যুদ্ধ থেকে সরে আসা।

গত কয়েক সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ, জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন, ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার এবং বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের সঙ্গে বৈঠকে এই তিনটি বিকল্প নিয়েই আলোচনা হয়েছে। তবে প্রতিটি পথই ভিন্ন ভিন্ন কারণে কঠিন বলে মনে হচ্ছে।

গত সপ্তাহজুড়ে ইরানে বড় ধরনের সামরিক অভিযানের হুমকি দিলেও শুক্রবার সে অবস্থান থেকে সরে আসেন ট্রাম্প।

কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্যমতে, ব্রিফিংয়ে ট্রাম্পের সহযোগীরা সন্দেহ প্রকাশ করেন—ব্যাপক বোমা হামলা চালিয়ে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করলে বা ইরানের শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংস করলেই যে তারা আবার আলোচনায় ফিরবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। বরং এতে যুক্তরাষ্ট্রকে অনেক বেশি মূল্য দিতে হতে পারে।

ট্রাম্পকে জানানো হয়েছে, এ ধরনের হামলায় ব্যাপক বেসামরিক প্রাণহানি ও দুর্ভিক্ষ দেখা দিতে পারে—অথচ একসময় তিনিই ইরানিদের নিজ সরকারের হাত থেকে রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

শুক্রবার ওভাল অফিসে ট্রাম্পকে জিজ্ঞাসা করা হয়, ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতু ধ্বংস করতে তিনি দ্বিধা বোধ করছেন কি না, যেহেতু এটি যুদ্ধাপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে। জবাবে তিনি বলেন, “আমি এই প্রশ্নের উত্তর দেব না।”

নিউ ইয়র্ক টাইমস লিখেছে, ট্রাম্পের দ্বিধার আসল কারণ হতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র-বিধ্বংসী অস্ত্রের মজুদ ফুরিয়ে আসা।

সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ গত এপ্রিলের এক মূল্যায়নে বলেছিল, যুক্তরাষ্ট্রের কিছু গুরুত্বপূর্ণ ইন্টারসেপ্টরের মজুদ ইতিমধ্যে অর্ধেক শেষ হয়ে গেছে। চলতি মাসে টানা ১৩ রাত ধরে চলা হামলা-পাল্টা হামলার পর, কিছু কর্মকর্তার মতে, সেই মজুদ এখন আশঙ্কাজনক পর্যায়ে নেমে এসেছে। এটাই ট্রাম্পকে নতুন করে বড় সামরিক অভিযান থেকে বিরত রাখছে বলে মনে করা হচ্ছে।

মার্কিন কর্মকর্তারা এখন চিন্তিত যে, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং যুক্তরাষ্ট্রের এই ঘাটতির সুযোগ নিতে পারেন—পুতিন ইউক্রেইন ও ইউরোপে, আর সি চিন পিং তাইওয়ানে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে এই বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে পারেন।

ট্রাম্পের দ্বিতীয় বিকল্প হল, ইরানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হতে দেওয়া। হরমুজ প্রণালিতে ইরানি জাহাজ চলাচলে নতুন করে অবরোধ আরোপ এবং তেল রপ্তানির ওপর আরও কঠোর ব্যবস্থা নিলে তা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে পারে।

কিন্তু নিষেধাজ্ঞার প্রভাব পড়তে সময় লাগে। ২০১৮ সালে ওবামা প্রশাসনের করা পারমাণবিক চুক্তি থেকে বেরিয়ে এসে ট্রাম্প ধারণা করেছিলেন, ইরানের অর্থনীতি ধ্বংস হয়ে যাবে। কিন্তু আট বছর পরও ইরানের শাসনব্যবস্থা টিকে আছে নতুন এক নেতার নেতৃত্বে, যিনি গোপনে পারমাণবিক কর্মসূচি ফের চালুর উদ্যোগ নিতে পারেন।

অবরোধের কৌশল হয়তো কাজে দেবে, তবে এ জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে ওই অঞ্চলে ব্যয়বহুল সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখতে হবে। পাশাপাশি মাঝেমধ্যে সংঘাত মার্কিন সেনাদের ঝুঁকি বাড়াবে এবং মিত্র দেশগুলোও হামলার শিকার হতে পারে।

তৃতীয় পথ হল নিজের বিজয় ঘোষণা করে ফিরে আসা। ট্রাম্প এক মাস আগে সেটাই করতে চেয়েছিলেন। তিনি যুদ্ধবিরতি বেছে নিয়েছিলেন কারণ হার্বার্ট হুভারের সময়কার মতো অর্থনৈতিক মন্দা তিনি চাননি।

৩১তম মার্কিন প্রেসিডেন্ট হুভারের প্রসঙ্গ টেনে ট্রাম্প বলেছিলেন, “আমি কখনোই তাঁর মতো হতে চাইনি। আমি অর্থনৈতিক বিপর্যয় দেখতে চাইনি। যুদ্ধ চলতে থাকলে বিশ্বে তেলের মজুত ফুরিয়ে যেত।”

কিন্তু এই প্রস্থানের জন্যও ট্রাম্পকে মূল্য দিতে হবে। তিনি যদি ইরানে বোমা তৈরির উপযোগী ইউরেনিয়াম রেখে চলে আসেন এবং হরমুজ প্রণালি ইরানের হাতে ছেড়ে দেন, তাহলে যে কারণে তিনি হামলার সূচনা করেছিলেন তার সমাধানে ব্যর্থ হবেন এবং জ্বালানি বাজারের জন্য নতুন এক বড় সংকট তৈরি করবেন।

এটি তাঁর নামের সঙ্গে জড়িয়ে থাকবে এবং প্রমাণ করবে যে তাঁর ক্ষমতারও সীমা আছে—জানুয়ারিতে যা তিনি কল্পনাও করতে পারেননি।