কাঁঠালের বীজ থেকে খনিজসমৃদ্ধ খাদ্য উপাদান তৈরির প্রযুক্তি উদ্ভাবন

শুকনো কাঁঠালের বীজে খনিজ উপাদান থাকে প্রায় ২ শতাংশ। তবে নতুন প্রযুক্তিতে তা ঘনীভূত করে ৩৩ শতাংশের বেশি পর্যন্ত নেওয়া সম্ভব হয়েছে, অর্থাৎ খনিজের ঘনত্ব বেড়েছে প্রায় ১৬ থেকে ১৭ গুণ।

কাঁঠালের বীজ থেকে খনিজসমৃদ্ধ খাদ্য উপাদান তৈরির প্রযুক্তি উদ্ভাবন

হাসমত আলী , বিশেষ প্রতিনিধি

বিশ্বের অন্যতম কাঁঠাল উৎপাদনকারী দেশ বাংলাদেশে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ কাঁঠাল উৎপাদিত হলেও এর বীজ ও খোসার বড় অংশ বর্জ্য হিসেবে নষ্ট হয়ে যায়। অথচ কাঁঠালের বীজে রয়েছে মানবদেহের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নানা খনিজ ও পুষ্টি উপাদান। 

এই বীজ থেকেই ঘনীভূত খনিজসমৃদ্ধ খাদ্য উপাদান তৈরির প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (গাকৃবি), যা দেশের পুষ্টি নিরাপত্তা ও কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন গবেষকেরা।

গাকৃবির খাদ্য প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মো. এমদাদুল হক ও তাঁর স্নাতকোত্তর গবেষক মো. আকরাম হোসেন যৌথভাবে এই মিনারেল কনসেন্ট্রেট তৈরির প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেন, যা ইতিমধ্যে সরকারি পেটেন্ট পেয়েছে।

অধ্যাপক এমদাদুল হক জানান, শুকনো কাঁঠালের বীজে খনিজ উপাদান থাকে প্রায় ২ শতাংশ। তবে নতুন প্রযুক্তিতে তা ঘনীভূত করে ৩৩ শতাংশের বেশি পর্যন্ত নেওয়া সম্ভব হয়েছে, অর্থাৎ খনিজের ঘনত্ব বেড়েছে প্রায় ১৬ থেকে ১৭ গুণ। এত দিন রান্নাঘর ও প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে অবহেলিত বর্জ্য হিসেবে ফেলে দেওয়া এই বীজ এখন পুষ্টি নিরাপত্তা ও খাদ্যশিল্পে নতুন দ্বার খুলে দিতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

গবেষকদের ভাষ্য, এই মিনারেল কনসেন্ট্রেট বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাত খাদ্যে ব্যবহার করে অধিক পুষ্টিমানের খাদ্য তৈরি করা যাবে। অবহেলিত এই বীজ এর মধ্য দিয়ে উচ্চমূল্যের খাদ্য উপাদানে রূপান্তরিত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে, যা খাদ্য অপচয় কমানো, কৃষিজ বর্জ্যের কার্যকর ব্যবহার ও পরিবেশ সংরক্ষণেও ভূমিকা রাখবে বলে আশা প্রকাশ করা হয়েছে।

গাকৃবির জনসংযোগ বিভাগের সেকশন অফিসার রনি ইসলাম জানান, দীর্ঘ তিন বছরের গবেষণার পর ২০২৫ সালের নভেম্বরে এই প্রযুক্তি উদ্ভাবিত হয়। গবেষণায় অর্থায়ন করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ‘গ্র্যান্টস ফর অ্যাডভান্সড রিসার্চ অ্যান্ড এডুকেশন’ (জিএআরই) প্রকল্প। পরে শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তর (ডিপিডিটি) থেকে প্রযুক্তিটি পেটেন্ট নম্বর পি/বিডি/২০২৪/০০০০৪০-এর মাধ্যমে নিবন্ধন পায়।

অধ্যাপক এমদাদুল হক বলেন, মানবদেহের স্বাভাবিক বৃদ্ধি, হাড় ও দাঁতের গঠন, রক্ত উৎপাদন, স্নায়ুতন্ত্র ও পেশির কার্যক্রম এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বজায় রাখতে খনিজের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পটাশিয়াম, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, ফসফরাস, আয়রন, জিঙ্ক ও ম্যাঙ্গানিজের ঘাটতি এখনো দেশের বড় জনগোষ্ঠীর পুষ্টি সমস্যার অন্যতম কারণ বলে জানান তিনি। তিনি আরও বলেন, প্রযুক্তিটি বাণিজ্যিকভাবে কাজে লাগানো গেলে পুষ্টিসমৃদ্ধ নতুন খাদ্যপণ্য উন্নয়নের পাশাপাশি কাঁঠালভিত্তিক শিল্পের বিকাশ ও কৃষকের আয় বাড়ানো সম্ভব হবে।

গাকৃবির উপাচার্য অধ্যাপক জিকেএম মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, এই উদ্ভাবন কেবল একটি পেটেন্ট অর্জনের বিষয় নয়, বরং দেশের কৃষি, খাদ্য ও পুষ্টি গবেষণার জন্য একটি নতুন মাইলফলক। কৃষিজ বর্জ্য হিসেবে পরিচিত একটি উপাদানকে কীভাবে উচ্চমূল্যের সম্পদে রূপান্তর করা যায়, তা গবেষকেরা প্রমাণ করেছেন বলে মন্তব্য করেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভাবনী গবেষণার পরিবেশ আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি গবেষণাগারের ফল শিল্প ও সমাজের উপযোগী করে তোলাই লক্ষ্য বলে জানান উপাচার্য।