উদ্বোধনের আগে দুই দিনেই ধসে গেলো ৪ কোটি টাকার সড়ক

সড়ক নির্মাণে বিভিন্ন স্থান থেকে সংগ্রহ করা পুরোনো ও নিম্নমানের ইট ব্যবহার করা হয়েছে, আর ঢালাইয়ে সিমেন্ট দেওয়া হয়েছে নামমাত্র।

উদ্বোধনের আগে দুই দিনেই ধসে গেলো ৪ কোটি টাকার সড়ক

গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক

সাভারের ধামসোনা ইউনিয়নে জাইকার অর্থায়নে প্রায় চার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত একটি সড়ক ও তিনটি ব্রিজের অংশবিশেষ উদ্বোধনের আগেই ধসে পড়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার মাত্র দুই দিনের মাথায় নদীসংলগ্ন অংশ ও একটি ব্রিজের সংযোগস্থলের মাটি সরে গিয়ে সড়কের একাংশ ধসে যায়।

সাভারের ধামসোনা ইউনিয়নের নলাই মুকেন্দ্র হাউস থেকে কারিগরপাড়া ব্রিজ পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার সড়ক এইচবিবিকরণ এবং তিনটি ব্রিজ নির্মাণের এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা)-র অর্থায়নে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে প্রায় চার কোটি টাকা ব্যয়ের এই কাজের দায়িত্ব পায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সালেহ এন্টারপ্রাইজ। ২০২২ সালের ২ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন ঢাকা-১৯ আসনের সংসদ সদস্য ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান কাজটির উদ্বোধন করেছিলেন।

সরেজমিন পরিদর্শন ও স্থানীয় বাসিন্দাদের বরাত দিয়ে জানা গেছে, সড়ক নির্মাণে বিভিন্ন স্থান থেকে সংগ্রহ করা পুরোনো ও নিম্নমানের ইট ব্যবহার করা হয়েছে, আর ঢালাইয়ে সিমেন্ট দেওয়া হয়েছে নামমাত্র। রাস্তার দুই পাশে স্থায়ী গাইডওয়াল ও মাটি ফেলার কথা থাকলেও সেখানে ব্যবহার করা হয়েছে বাঁশের চাটাই ও কাঠের বেড়া। ঝুঁকিপূর্ণ কিছু স্থানে প্লাস্টিকের বস্তায় মাটি ও বালুর মিশ্রণ ফেলা হলেও তা ছিঁড়ে ইতোমধ্যে বেরিয়ে গেছে।

ব্রিজের দুই পাশে মাটি ধরে রাখতে স্থায়ী ঢালাই বেষ্টনী নির্মাণের কথা থাকলেও তার পরিবর্তে শুধু মাটি দিয়ে ভরাট করা হয়, যা দুই দিনের মধ্যেই ধসে পড়ে। যেসব স্থানে সিমেন্ট ঢালাইয়ের বেষ্টনী দেওয়া হয়েছে, তা আঁকাবাঁকা ও অনেক জায়গায় ভেঙে পড়ে আছে। অভিযোগ রয়েছে, ইট বাঁচাতে সড়কের কিছু অংশে ফাঁকা জায়গা রেখে তা কেবল মাটি দিয়ে ভরাট করা হয়েছে। বংশাই নদীর পাশের অংশে ইট-সিমেন্টের ব্লকের বদলে ফাঁকা স্থানে সিমেন্টের পরিবর্তে বালু ও মাটি দিয়ে বাঁধ তৈরি করা হয়েছিল, যা দেখতে অনেকটা কাঁচা রাস্তার মতো।

স্থানীয় বাসিন্দা জহিরুল ইসলাম বলেন, ব্রিজের গোড়ায় নদীতীর রক্ষায় বড় কংক্রিট ব্লক ব্যবহারের কথা থাকলেও সেখানে বাঁশ ও কাঠ ব্যবহার করা হয়েছে, ফলে নির্মাণ শেষ হওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই সেগুলো নদীতে ভেসে যায়।

কসাইপাড়া এলাকার বাসিন্দা মিষ্টু কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর নির্মাণকাজ শেষ হলেও তা টেকসই হয়নি এবং নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহারের কারণে সামান্য বৃষ্টি ও চাপেই সড়কের অংশবিশেষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার না করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সালেহ এন্টারপ্রাইজের প্রতিনিধি সিরাজুল ইসলাম সুমন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, তিনি ২০২২-২৩ সাল থেকে কাজটি শুরু করেছিলেন, কিন্তু বিভিন্ন পক্ষের অসহযোগিতার কারণে কাজের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। কাজটি এখনও শেষ করা যায়নি এবং এর পেছনে দীর্ঘ প্রেক্ষাপট রয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) ফাইজুল ইসলাম জানান, ২০২২-২৩ অর্থবছরে প্রায় চার কোটি টাকা বাজেটে জাইকার অধীনে এই সড়ক ও তিনটি ব্রিজের উন্নয়নকাজ শুরু হয়েছিল এবং পরে সময় বাড়িয়ে কাজ চলমান রাখা হয়। নিয়ম অনুযায়ী ব্রিজের গোড়ায় ও ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোতে ভাঙন রোধে স্থায়ী প্রটেকশন ব্লক দেওয়ার কথা থাকলেও তা করা হয়নি বলে তিনি জানান, এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাজের মান নিয়ে কর্তৃপক্ষ নিজেরাও অসন্তুষ্ট বলে জানান তিনি। তার ভাষ্যমতে, প্রকল্প পরিদর্শনে এসে সংশ্লিষ্ট মহাপরিচালকও (ডিজি) তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

তিনি আরও জানান, সম্প্রতি ভারী বৃষ্টির মধ্যেও এলাকাটি সরেজমিন পরিদর্শন করে ঠিকাদারকে সব ত্রুটি ও অনিয়ম সংশোধনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সরকারি নিয়ম মেনে টেকসই গাইডওয়াল ও ব্লক নির্মাণ না হওয়া পর্যন্ত ঠিকাদারকে চূড়ান্ত বিল পরিশোধ করা হবে না বলে জানান তিনি, এবং নিয়ম অনুযায়ী কাজ না হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানান।

সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন