গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক
দেশে প্রথমবারের মতো কোনো রেলপথ বিদ্যুতায়নের উদ্যোগ নিল সরকার। নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর রুটে বৈদ্যুতিক ট্রেন চালুর একটি প্রকল্পে সায় দিয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৮২২ কোটি ৫১ লাখ টাকা।
বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) ঢাকার শেরেবাংলা নগরে বাংলাদেশ সচিবালয়ে একনেকের চলতি অর্থবছরের তৃতীয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান একনেক চেয়ারপারসন হিসেবে সভায় সভাপতিত্ব করেন। পরে এনইসি সম্মেলন কক্ষে সাংবাদিকদের বিষয়টি জানান পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি এবং পরিকল্পনা বিভাগের সচিব এস এম শাকিল আখতার।

যা থাকছে প্রকল্পে
রেলপথ মন্ত্রণালয়ের অধীন এই প্রকল্পের নাম— ‘বাংলাদেশ রেলওয়ের নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর সেকশনে ইলেকট্রিক ট্র্যাকশন বাস্তবায়ন’। বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ রেলওয়ে নিজেই। মূল কাজ হবে এই রুটে ওভারহেড ক্যাটেনারি ব্যবস্থা ও ট্র্যাকশন সাব-স্টেশন নির্মাণ।
অর্থায়নের ক্ষেত্রে সরকারি কোষাগার থেকে আসবে ৯৪২ কোটি ৯ লাখ টাকা। বাকি প্রায় ২ হাজার ৮৮০ কোটি টাকা ঋণ হিসেবে জোগাড় করা হবে, যাতে ঋণ দিতে আগ্রহী এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংক (ইআইবি)।
কাজ শুরু হবে ২০২৭ সালের জুলাইয়ে, শেষ হওয়ার কথা ২০৩১ সালের জুনে। এই সময়ের মধ্যে প্রায় ৫২ কিলোমিটার পথজুড়ে বসবে ওভারহেড ক্যাটেনারি লাইন, কেনা হবে পাঁচ কোচবিশিষ্ট ১৬টি ইলেকট্রিক মাল্টিপল ইউনিট (ইএমইউ), গড়ে তোলা হবে একটি রক্ষণাবেক্ষণ কারখানাও।
রেলওয়ে বলছে, নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর করিডর দেশের সবচেয়ে ব্যস্ত রেলপথগুলোর একটি হলেও ট্রেন ও অবকাঠামোর সংকটে বাড়তি যাত্রীর চাপ সামলানো যাচ্ছে না। বিদ্যুতায়নের ফলে—
– জ্বালানি ব্যয় প্রায় ৪০ শতাংশ কমবে ডিজেল-ইলেকট্রিক ব্যবস্থার তুলনায়
– রক্ষণাবেক্ষণ খরচ কমবে ৩৫-৪০ শতাংশ
– ট্রেনের গড় গতি বাড়তে পারে ১৮-২০ শতাংশ
– কমবে কার্বন নিঃসরণ, বাড়বে রেলের রাজস্ব
রেলওয়ে কর্মকর্তাদের ভাষ্য, প্রকল্পটি শেষ হলে সীমিত ডিজেল লোকোমোটিভনির্ভরতা কমবে, লাইনের সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার সম্ভব হবে, সড়কের ওপর চাপও কিছুটা কমবে। এসব বিবেচনায় পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগ প্রকল্পটি অনুমোদনের সুপারিশ করেছিল, যা একনেক সভায় চূড়ান্ত অনুমোদন পেল।
প্রকল্পের আওতায় বিদ্যমান রেললাইনের ওপর স্থাপন করা হবে ‘ওভারহেড ওয়্যার’ বা ওভারহেড ক্যাটেনারি সিস্টেম। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য নির্দিষ্ট দূরত্বে নির্মাণ করা হবে ‘ট্রাকশন সাবস্টেশন’। ফলে একই লাইনে চলতে পারবে পুরোনো ডিজেল ইঞ্জিন ও নতুন বৈদ্যুতিক ‘ইলেকট্রিক মাল্টিপল ইউনিট’ (ইএমইউ) ট্রেন। নতুন করে রেললাইন নির্মাণের প্রয়োজন হবে না।
প্রকল্পের নথি অনুযায়ী, ৫২ দশমিক ৩২ কিলোমিটার রেলপথে ওভারহেড ক্যাটেনারি সিস্টেম নির্মাণের পাশাপাশি ১৬ সেট ইলেকট্রিক মাল্টিপল ইউনিট (ইএমইউ) সংগ্রহ এবং ইএমইউ মেরামত কারখানা নির্মাণ করা হবে। এর সঙ্গে যুক্ত হবে বৈদ্যুতিক ইঞ্জিন এবং কম্পিউটারভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় সিগন্যালিং ব্যবস্থা। অর্থাৎ শুধু ট্রেনের ইঞ্জিন পরিবর্তন নয়, বিদ্যুৎনির্ভর ট্রেন পরিচালনার প্রয়োজনীয় অবকাঠামোও গড়ে তোলা হবে।
নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর সেকশনে ট্রেনের গড় গতিবেগ বৃদ্ধি, পরিচালন ব্যয় হ্রাস ও আয় বৃদ্ধি, কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং সবুজ পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলাকে প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য হিসেবে ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে এ রুটে সড়ক পরিবহনের ওপর চাপ কমানো এবং বাংলাদেশ রেলওয়ের অপারেশনাল ইফিসিয়েন্সি বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। বিদ্যুতায়নের ফলে যাত্রার সময় কমবে, প্রতি ট্রেনের বহনক্ষমতা বাড়বে এবং পরিবহন ব্যয় কমবে বলে প্রকল্পের নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।