বিচারকদের নতুন পদায়ন নিয়ে প্রশাসনে অসন্তোষ, প্রশ্নের মুখে প্রক্রিয়া

প্রতিটি প্রজ্ঞাপনেই বলা হয়েছে, সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শ করেই এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

বিচারকদের নতুন পদায়ন নিয়ে প্রশাসনে অসন্তোষ, প্রশ্নের মুখে প্রক্রিয়া

গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক

সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থায় একগুচ্ছ বিচারিক কর্মকর্তাকে সরাসরি বদলি করে দেওয়া প্রজ্ঞাপনের পর প্রশাসনের ভেতরে ক্ষোভ ও অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে না জানিয়েই এসব পদায়ন হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে, যা নিয়ে সংশ্লিষ্টরা বলছেন—এমন নজির অতীতে দেখা যায়নি। আগামীর সময় এক প্রতিবেদনে এ তথ্য প্রকাশ করেছে।

যে ঘটনা নিয়ে বিতর্ক শুরু

প্রতিবেদন অনুযায়ী, গাজীপুরের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক (সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ) এ কিউ এম নাছির উদ্দীনকে গত বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব পদে বদলি করে প্রজ্ঞাপন জারি করে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়। প্রজ্ঞাপনে তাঁকে ওই মন্ত্রণালয়ের ‘আইন অনুবিভাগ’ দেখাশোনার দায়িত্ব দেওয়া হলেও বাস্তবে পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের সাংগঠনিক কাঠামোতে এই নামে কোনো শাখাই অস্তিত্বহীন।

প্রতিবেদনে পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের চিঠির বিষয়বস্তু উদ্ধৃত করে জানানো হয়েছে, বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিসের সদস্য নাছির উদ্দীনকে (আইডি নং ১৯৯৯১১৮০৮) সরাসরি বদলির যে আদেশ জারি হয়েছে, তাতে গুরুতর প্রশাসনিক ত্রুটি রয়েছে। নতুন পদ সৃজন এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে যথাযথ প্রেষণাদেশ ছাড়া এভাবে কাউকে ‘অতিরিক্ত সচিব (আইন অনুবিভাগ)’ পদে বসানোর কোনো বিধিগত সুযোগ নেই। এ ছাড়া নন-সেক্রেটারিয়েট কর্মকর্তাদের কোনো মন্ত্রণালয়ে পদায়নের ক্ষেত্রে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে পরামর্শ করা বাধ্যতামূলক হলেও এক্ষেত্রে তা মানা হয়নি বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে। এই অসঙ্গতি সামনে আসার পর গতকাল বৃহস্পতিবার পরিবেশ মন্ত্রণালয় জনপ্রশাসন সচিবের কাছে চিঠি দিয়ে পরবর্তী করণীয় জানতে চায়।

একই দিনে আরও অন্তত ১৪ জনের পদায়ন

শুধু এই একটি ঘটনা নয়, একই সপ্তাহে আরও অন্তত ১৪ জন বিচারিক কর্মকর্তাকে একই ধরনের প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, সংসদ সচিবালয়, দুর্নীতি দমন কমিশন ও নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে পদায়ন করা হয়েছে। এর মধ্যে গত বুধবার জারি হওয়া প্রজ্ঞাপনে যাঁদের নাম আছে তাঁদের মধ্যে রয়েছেন: পটুয়াখালীর বিশেষ জজ আদালতের বিশেষ জজ (জেলা ও দায়রা জজ) মো. গোলাম ফারুক—জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের যুগ্ম সচিব পদে, চট্টগ্রামের মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. আবু বকর সিদ্দিক—সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রীর একান্ত সচিব (পিএস) পদে, ময়মনসিংহের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ ওয়ায়েজ আল করুনী—ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আইন উপদেষ্টা পদে (সংযুক্তিতে) ও ঢাকার অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মোহাম্মদ মঈন উদ্দীন চৌধুরী—ভূমি নিবন্ধন ব্যবস্থাপনা অটোমেশন প্রকল্পে (সংযুক্তিতে)।

আর বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) আরও যে ১০ জনকে পদায়ন করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়, তাঁরা হলেন: সিলেটের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক (জেলা ও দায়রা জজ) স্বপন কুমার সরকার—প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের আইন উপদেষ্টা, ঝিনাইদহের ল্যান্ড সার্ভে আপিল ট্রাইব্যুনালের বিচারক (জেলা ও দায়রা জজ) মো. মাসুদ আলী—আইন ও বিচার বিভাগের উপসচিব, পাবনার পারিবারিক আপিল আদালতের বিচারক (জেলা ও দায়রা জজ) মো. ফেরদৌস ওয়াহিদ—শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের আইন উপদেষ্টা, সোনিয়া আহমেদ (আইন ও বিচার বিভাগের সংযুক্ত কর্মকর্তা)—একই মন্ত্রণালয়ের উপসলিসিটর, পিরোজপুরের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ইফতেখার আহমেদ—নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের উপসচিব (আইন), কুমিল্লার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কামরুল হাসান—দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) উপপরিচালক, আবদুল মোমেন, অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ (আইন ও বিচার বিভাগের সংযুক্ত কর্মকর্তা)—তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের আইন কর্মকর্তা, রাফিয়া সুলতানা, যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ (আইন ও বিচার বিভাগের সংযুক্ত কর্মকর্তা)—দুদকের উপপরিচালক, সুব্রত ঘোষ শুভ, যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ (আইন ও বিচার বিভাগের সংযুক্ত কর্মকর্তা)—একই মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব এবং মেহেরপুরের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট জাহিদুর রহমান—নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব (সিনিয়র সিভিল জজ)।

প্রতিটি প্রজ্ঞাপনেই উল্লেখ করা হয়েছে, ‘বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শক্রমে’ এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

কেন এত অসন্তোষ

প্রতিবেদনে বলা হয়, স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় কোনো মন্ত্রণালয় বা সংস্থার বিচার-সংক্রান্ত জনবলের প্রয়োজন হলে প্রথমে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কাছে আনুষ্ঠানিক চাহিদা পাঠানো হয়, এরপর সুপ্রিম কোর্টের সম্মতি নিয়ে আইন মন্ত্রণালয় প্রজ্ঞাপন জারি করে। কিন্তু সাম্প্রতিক এই পদায়নগুলোয় সেই রীতি এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে বলে আইন মন্ত্রণালয়ের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র পত্রিকাটিকে জানিয়েছে।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব কামরুজ্জামান চৌধুরী সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, “আমি এখনো এ-সংক্রান্ত চিঠি পাইনি। তবে এ ধরনের ঘটনা ঘটলে আমাদের প্রতিমন্ত্রী ও উপদেষ্টাদের সঙ্গে পরামর্শ করে প্রয়োজনীয় আইনি সুরাহা করা হবে।”

জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ মো. ফিরোজ মিয়া সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, “এ পদগুলো জুডিশিয়াল সার্ভিসের পদ নয়। তাই আইন মন্ত্রণালয় সরাসরি পদায়ন দেওয়া যথাযথ নয়। কোনো মন্ত্রণালয়ের চাহিদা থাকলে ভিন্ন বিষয়। তা ছাড়া মাসদার হোসেন মামলার রায়ের সঙ্গে বিষয়টি সাংঘর্ষিক কি না, তাও বিবেচনায় নেওয়া উচিত। এতে করে জনপ্রশাসনে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে, ব্যাহত হবে কাজ।”

প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের একাধিক কর্মকর্তা এ নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানালেও জনপ্রশাসন বা আইন মন্ত্রণালয়ের কোনো দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ করে এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি।

একই সময়ে ৯৯ বিচারকের রুটিন বদলি

এর পাশাপাশি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শক্রমে আইন ও বিচার বিভাগ বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) আলাদা ছয়টি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে মোট ৯৯ জন বিচারককে বদলি করেছে। এর মধ্যে রয়েছেন ৪৪ জন জেলা ও দায়রা জজ, ২৬ জন অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ, ২৫ জন যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ, দুজন সিনিয়র সিভিল জজ এবং দুজন সিভিল জজ।

এই বদলির অংশ হিসেবে যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ পদমর্যাদার ১৭ জন বিচারককে চিফ লিগ্যাল এইড অফিসার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বাকি জেলা জজ ও অতিরিক্ত জেলা জজ পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের পাঠানো হয়েছে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, আইন ও বিচার বিভাগ, দুর্নীতি দমন কমিশন এবং নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের আইন-সংক্রান্ত বিভিন্ন পদে।

সূত্র: আগামীর সময়