গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক
স্থানীয় সরকারের সবচেয়ে নিচের স্তর ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনকে সবার আগে সারতে চাইছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এই সিদ্ধান্তের কারণে সিটি করপোরেশন, উপজেলা পরিষদ ও পৌরসভার ভোট আগামী এক বছরেও শুরু না হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
ইসির একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সংবাদ মাধ্যমকে জানিয়েছেন, ইউপি নির্বাচন সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত অন্য কোনো স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের ভোট আয়োজনের কোনো পরিকল্পনা কমিশনের নেই। আগামী বছরের জুন মাসের মধ্যে ইউপি নির্বাচন শেষ করাই তাদের লক্ষ্য। ওই কর্মকর্তার ভাষ্য, ইউপি ভোটের তফসিলে যত দেরি হবে, বাকি নির্বাচনগুলোও ততই পিছিয়ে যাবে।
একসঙ্গে অনেক নির্বাচনের চাপ
বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে এ বছর ইউপি নির্বাচন করতে গিয়ে যেসব বাধার মুখে পড়তে হতে পারে, তা তুলে ধরেন সংশ্লিষ্টরা। এর মধ্যে আছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বার্ষিক পরীক্ষা, সরকারের নানা কর্মসূচি, ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জনবল সংকট।
ইসি সূত্রের বরাতে জানা গেছে, দেশে এখনো ১৩টি সিটি করপোরেশন, ৩৩০টি পৌরসভা, ৪৯৫টি উপজেলা পরিষদ ও ৬১টি জেলা পরিষদে নির্বাচন বাকি। আগে এসব প্রতিষ্ঠানের মেয়াদ শেষ হতো ভিন্ন ভিন্ন সময়ে, তাই ভোটও হতো আলাদাভাবে। কিন্তু এবার একসঙ্গে অনেক প্রতিষ্ঠানের নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে আসায় কমিশনকে ধাপে ধাপে ভোট করাতে হবে।
‘আগে ইউপি, পরে বাকিগুলো’
বৈঠকে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাসুদ বলেন, বাকি স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোর কথা মাথায় রেখেই ইউপি ভোট দ্রুত সারা দরকার। তাঁর ভাষ্যে, ইউপি নির্বাচনের পরপরই সিটি করপোরেশন, উপজেলা পরিষদ ও পৌরসভার ভোটে যেতে হবে কমিশনকে—যার অনেকগুলো এমনিতেই নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত হয়ে আছে। তিনি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলোকে দ্রুত সুপারিশ পাঠানোর অনুরোধ জানান।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন এ ক্ষেত্রে জাতীয় নির্বাচনের মতোই সবার সহযোগিতা চেয়েছেন এবং দ্রুত মতামত দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন কর্মকর্তাদের।
সরকারের ব্যস্ততা, স্কুলের পরীক্ষা—দুদিক থেকেই চাপ
মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণি বৈঠকে জানান, ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড বিতরণের মতো অগ্রাধিকারমূলক কর্মসূচি নিয়ে সরকার এখন খুবই ব্যস্ত, আর এ বছর অনেক বেশি মানুষের মধ্যে কার্ড বিতরণের পরিকল্পনাও আছে। একই সময়ে নির্বাচন করতে গেলে সীমাবদ্ধতা তৈরি হতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়, নভেম্বর-ডিসেম্বরে দেশজুড়ে স্কুলে বার্ষিক পরীক্ষা চলবে, সঙ্গে চলবে জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষাও। যেহেতু নির্বাচনের কাজে স্কুল-শিক্ষক-কর্মচারীদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ, তাই এই সময়ে ভোট করা কঠিন হবে। মন্ত্রণালয় এটাও জানিয়েছে যে আগামী ফেব্রুয়ারিতে এসএসসি এবং জুনের শুরুতে এইচএসসি পরীক্ষা হওয়ার কথা—সবকিছু মিলিয়ে তফসিল ঠিক করার পরামর্শ দিয়েছে তারা।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতিনিধিরাও নভেম্বর-ডিসেম্বরে নির্বাচন নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন—এ সময় জাতীয় দিবস, সরকারি কর্মসূচি ছাড়াও নতুন নিয়োগ পাওয়া পুলিশ সদস্যদের প্রশিক্ষণ চলবে, যা শেষ করতে বাড়তি সময় লাগবে বলে তাঁরা জানিয়েছেন।
হাতে সময় সামান্যই
সরকার আগামী জুনের মধ্যে ইউপি নির্বাচন সারতে চাইলেও নানা পরীক্ষা আর কর্মসূচির ভিড়ে ইসির হাতে সময় ক্রমশ কমে আসছে। বৈঠক শেষে নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ জানান, এইচএসসি পরীক্ষা শুরুর আগেই ইউপি ভোট সারতে হবে—এ বিষয়ে সবাই একমত হয়েছেন। তবে ভোট নভেম্বরে হবে নাকি ডিসেম্বরে, সে সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি।
এ প্রসঙ্গে সানাউল্লাহ সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ‘এটা এখন একা আমি কীভাবে বলব? প্রয়োজনীয় তথ্য আমরা পেয়েছি। এখন কমিশনে বসে নির্দিষ্টভাবে সিদ্ধান্ত নেব।’ তিনি জানান, নভেম্বর-ডিসেম্বরের প্রায় পুরো সময়টাই নানা পরীক্ষায় ভরা। এরপর তিনি যোগ করেন, ‘জানুয়ারিতে কিছুটা সময় পাওয়া যাবে। এরপর ৭ বা ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে রমজান শুরুর সম্ভাবনা আছে। রমজান শেষ হতে না হতেই শুরু হবে এসএসসি পরীক্ষা, আর ৬ জুন থেকে এইচএসসি।’ ফলে ভোট আয়োজনের জন্য সময় সত্যিই কম বলে জানান তিনি।
তাঁর ভাষায়, ‘এবার আমাদের সময়ের পরিসর খুবই সংকুচিত। এই সীমিত সময়ের মধ্যে সবকিছু কীভাবে সমন্বয় করা যায়, সে বিষয়ে আরও কিছু আনুষঙ্গিক কাজ করতে হবে।’ প্রয়োজনীয় সমন্বয় ও বাজেট পরিকল্পনা শেষ করে যত দ্রুত সম্ভব ভোটের তারিখ ঘোষণা করা হবে বলে জানান তিনি। এর আগে কর্মকর্তা ও সচিব পর্যায়ে সমন্বয় করবেন ইসি সচিব, এরপর কমিশন সভায় বসে চূড়ান্ত করবে তফসিল।
আগের সময়সূচি বাতিল, বিরোধীদের সমালোচনা
এর আগে সাত ধাপে ইউপি নির্বাচনের একটি প্রাথমিক সময়সূচি ঘোষণা করেছিল ইসি। কিন্তু সরকারের তীব্র আপত্তির মুখে কয়েক দিনের মধ্যেই সেই পরিকল্পনা থেকে সরে আসতে হয় কমিশনকে। এ নিয়ে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপিসহ বিরোধী দলগুলো কড়া সমালোচনা করে এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে অগ্রাধিকার দেওয়ার সরকারি প্রতিশ্রুতি নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
কেন এত জট
২০২৪ সালের আগস্টে গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের অধিকাংশ শীর্ষ ও মধ্যম স্তরের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান নেতৃত্বশূন্য হয়ে পড়ে। তখন থেকে এসব প্রতিষ্ঠান চলছে প্রশাসকের মাধ্যমে। শুরুতে অন্তর্বর্তী সরকার প্রশাসক বসিয়েছিল, পরে বিএনপি সরকার তাদের বেশিরভাগকে বদলে নিজেদের দলের নেতাদের বসায়—যা স্থানীয় নির্বাচনের এই দীর্ঘসূত্রতার একটি বড় প্রেক্ষাপট।
সূত্র: টাইমস অব বাংলাদেশ