গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক
জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানোর দুই দিনের মাথায় সরকার বাসভাড়া বাড়ানোর ঘোষণা দেয়। প্রতি কিলোমিটারে ভাড়া বাড়ানো হয় ১৭ পয়সা করে। কিন্তু রাজধানীর বিভিন্ন বাস টার্মিনাল ঘুরে দেখা গেছে, সরকার নির্ধারিত এই হার মানছে না অধিকাংশ পরিবহন প্রতিষ্ঠান। যাত্রীদের কাছ থেকে আদায় করা হচ্ছে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে অনেক বেশি।
গত সপ্তাহের মতো এবারও গাবতলী থেকে রংপুর যাওয়ার জন্য ৮০০ টাকা ভাড়া হবে বলে ধরে নিয়েছিলেন রেহানা খাতুন। কিন্তু এসআর ট্রাভেলসের কাউন্টারে গিয়ে দেখেন, তেলের দাম বাড়ার কথা বলে তার কাছে চাওয়া হচ্ছে ৯৫০ টাকা। শেষে দরদাম করে ৯০০ টাকায় টিকিট কেনেন তিনি।
রেহানা খাতুন সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ‘অনেক বাসই আরও বেশি চাইছে। দরদাম করা ছাড়া কোনো উপায় ছিল না।’
তবে এসআর ট্রাভেলসের কর্মী মো. বদিউলের দাবি, বাড়তি ভাড়া নেওয়া অযৌক্তিক নয়। তিনি সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ‘কিলোমিটার হিসাবে ধরলে আমাদের ভাড়া আরও বেশি হওয়া উচিত। সেই তুলনায় ৯৫০ টাকা কমই।’
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ৫১ আসনের বাসে ঢাকা-রংপুর রুটে ভাড়া বাড়ার কথা ছিল মাত্র ৬১ টাকার মতো, ৪০ আসনের বাসে ৭৭ টাকা। বাস্তবে যাত্রীদের গুনতে হচ্ছে এর কয়েক গুণ বেশি।
নিয়মের তোয়াক্কা নেই
সরকার দূরত্বের ভিত্তিতে ভাড়া নির্ধারণ করে দিলেও দূরপাল্লা কিংবা নগর পরিবহন—কোনো ক্ষেত্রেই তা মানা হচ্ছে না বলে অভিযোগ যাত্রীদের। বিশেষ করে নগর পরিবহনগুলো কিলোমিটারের হিসাব বাদ দিয়ে নিজেদের মতো স্টপেজ ঠিক করে ভাড়া আদায় করছে। কোথাও কোথাও আড়াই কিলোমিটার দূরত্বের দুটি স্টপেজের মধ্যে ভাড়ার পার্থক্য দাঁড়িয়েছে ১০ টাকা পর্যন্ত।
মঙ্গলবার গাবতলী, সায়েদাবাদ ও মহাখালী বাস টার্মিনাল ঘুরে দেখা গেছে, বিভিন্ন রুটে আগের তুলনায় ১০০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত বেশি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। গাবতলীতে গোল্ডেন লাইন পরিবহন ঢাকা-ফরিদপুর রুটের ভাড়া ৪০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে করেছে ৪৫০ টাকা। মাগুরাগামী একজন যাত্রী জানান, মাত্র একদিনের ব্যবধানে তার টিকিটের দাম ৬০০ থেকে বেড়ে হয়েছে ৭৫০ টাকা।
সূর্যমুখী পরিবহনের কর্মী শফিক আলম সংবাদ মাধ্যমকে জানান, ফরিদপুর, বরিশাল, কুষ্টিয়া ও রাজবাড়ীসহ বিভিন্ন রুটে তাদের প্রতিষ্ঠান টিকিটপ্রতি বাড়তি নিচ্ছে ৫০ টাকা করে।
ঢাকা-বরিশাল রুটের যাত্রী মহিউদ্দিন জনি বলেন, তাদের ভাড়া ৬০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে করা হয়েছে ৬৫০ টাকা। অথচ বিআরটিএর হিসাবে ১৫৬ কিলোমিটারের এই রুটে ভাড়া বাড়ার কথা ছিল মাত্র ২৬ টাকা। এ বিষয়ে কাউন্টার ইনচার্জ নাসির উদ্দিনের ভাষ্য, তেলের দাম বাড়ায় প্রতি ট্রিপে তাদের বাড়তি খরচ হচ্ছে প্রায় ৩ হাজার টাকা।
নগর পরিবহনেও একই চিত্র। গুলিস্তান-মহাখালী রুটে আজমেরী গ্লোরি পরিবহন ভাড়া ২০ টাকা থেকে বাড়িয়ে করেছে ৩০ টাকা। অথচ সরকার নগর পরিবহনে ভাড়া বাড়ানোর অনুমতি দিয়েছে মাত্র ৬ শতাংশ। এই হিসাবে ভাড়া বাড়ানো হয়েছে প্রায় ৫০ শতাংশ।
সবচেয়ে ক্ষতির মুখে পড়েছেন অল্প দূরত্বের যাত্রীরা। রুটভেদে ১০ টাকার ভাড়া এখন ১৫ টাকা, ১৫ টাকা থেকে ২০ টাকা, আবার কোথাও ২০ টাকার ভাড়া গিয়ে ঠেকেছে ৩০ টাকায়।
তদারকির অভাবের অভিযোগ
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, বিআরটিএর ভাড়া নির্ধারণী বৈঠকে যাত্রীদের কোনো প্রতিনিধি রাখা হয়নি। তার ভাষ্যে, সেসব বৈঠকে মূল সিদ্ধান্ত নেন বাস মালিকরাই।
নৌ, সড়ক ও রেলপথ রক্ষা জাতীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক আশিস কুমার দে সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ‘বিআরটিএর কাছে অভিযোগ জানানোর নম্বরগুলো সচল থাকে না। রাস্তায় তদারকি করারও কেউ নেই।’
তবে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. সাইফুল আলম সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, নতুন ভাড়া কাঠামোয় মালিকদের সব খরচ বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। শুধু তেলের দামের হিসাব ধরা হয়েছে, অন্য পরিচালন ব্যয় বিবেচনা করা হয়নি বলে দাবি তার। তিনি বলেন, ‘২০২২ সালে যখন শেষবার ভাড়া বাড়ানো হয়েছিল, তখন ডলারের দাম ছিল ৮৬ টাকা। এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২৫ টাকায়।’
ভাড়ার আঁচ পড়েছে রিকশায়ও
বাড়তি বাসভাড়ার প্রভাব গিয়ে পড়ছে রিকশাভাড়ায়ও। গাজীপুরে রাজবাড়ী থেকে সিটি করপোরেশন এলাকা পর্যন্ত রিকশাভাড়া ১০ টাকা থেকে বেড়ে দ্বিগুণ হয়ে হয়েছে ২০ টাকা। জয়দেবপুর রেলস্টেশন থেকে উত্তর ছায়াবীথি রুটের ভাড়া ২০ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৩০ টাকা।
যাত্রী ফিরোজা খাতুন প্রশ্ন তোলেন, ‘তেলের দাম বেড়েছে বলে বাসের ভাড়া বেড়েছে, বুঝলাম। কিন্তু রিকশাভাড়া কেন এত বাড়বে?’
স্থানীয় এক রিকশাচালক সংবাদ মাধ্যমকে জানান, মালিককে প্রতিদিন জমা দিতে হয় ৩০০ টাকার জায়গায় এখন ৪০০ টাকা, তাই ভাড়া বাড়াতে বাধ্য হচ্ছেন তারা।
ব্যাটারিচালিত রিকশার একটি চার্জিং গ্যারেজের মালিক হৃদয় হোসেন সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, বিদ্যুৎ বিল বৃদ্ধির কারণেই মূলত জমার টাকা বাড়াতে হয়েছে। গত মাসে তার গ্যারেজের বিদ্যুৎ বিল প্রায় ৫০ হাজার টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১৭ হাজার টাকায়। তিনি বলেন, ‘ব্যবসা করে আর পোষাচ্ছিল না, তাই গ্যারেজ বন্ধ করে ব্যবসা ছেড়ে দিতে হয়েছে।’
সূত্র: টাইমস অব বাংলাদেশ