মিডল ইস্ট আই
সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের প্রধান বিমানবন্দরে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের হামলায় অন্তত ১২ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন তিন শতাধিক মানুষ। এই হামলার পর দেশটিতে বসবাসরত বিদেশিদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে।
শনিবারের হামলাটি হয়েছে কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। নিহতদের মধ্যে একজন বাংলাদেশি ধর্মীয় নেতা, চার সন্তানের এক সিরীয় মা এবং একজন মার্কিন নাগরিক আছেন। পরদিন আরেক দফা হামলায় একজন নিহত ও অন্তত ১১ জন আহত হন।
সৌদি রাষ্ট্রীয় টিভি আল-এখবারিয়ার প্রচারিত ভিডিওতে দেখা যায়, ওমরাহ পালনে মক্কা যাওয়ার অপেক্ষায় থাকা সাদা পোশাকের যাত্রীরা আতঙ্কে ছোটাছুটি করছেন। লাউঞ্জে ধুলা ছড়িয়ে পড়েছে, ভেঙে পড়ছে ছাদের অংশ।
হুতিরা বলছে, তারা পূর্ব সৌদি আরবের তেল স্থাপনা ও দাম্মাম বিমানবন্দরেও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে সরকারি বাহিনীকে সৌদি সমর্থন এবং এ বছর সানা বিমানবন্দরে সৌদি বিমান হামলার প্রতিশোধ হিসেবে এ হামলা বলে তারা জানিয়েছে।
মিডল ইস্ট আইয়ের সঙ্গে কথা বলেছেন রিয়াদে থাকা কয়েকজন ব্রিটিশ নাগরিক। সাত বছর ধরে সেখানে থাকা ৩৯ বছর বয়সী বিলাল বলেন, সৌদি আরব ছাড়ার পরিকল্পনা তাঁর নেই। তবে হামলা ঘন ঘন হলে পরিবারকে ব্রিটেনে পাঠানোর কথা তিনি ভাববেন।
প্রায় এক দশক ধরে রিয়াদে যাওয়া-আসার মধ্যে থাকা মোহাম্মদের মতে, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধব্যবস্থা বিমানবন্দর রক্ষা করতে পারেনি, এটাই তাঁকে সবচেয়ে বেশি অস্বস্তিতে ফেলেছে। স্কুল বন্ধ থাকা এবং কিছু বিদেশির দেশে ফেরার কথা বলা তাঁর সন্তানদেরও ভীত করেছে। তাঁর ভাষায়, রিয়াদ আর আগের মতো নিরাপদ লাগছে না।
যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান সৌদি আরবকে বিদেশি বিনিয়োগ, পর্যটন, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক সম্মেলনের গন্তব্য বানাতে চাইছেন। হামলার প্রভাব সেই পরিকল্পনার ওপর পড়তে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
হামলার পরদিন রিয়াদে একটি জ্বালানি সম্মেলনে হাতে গোনা কয়েকজন প্রতিনিধি এসেছিলেন। আর দুই সপ্তাহ পরই দেশটির সবচেয়ে বড় ব্যবসায়িক আয়োজন ফিউচার ইনভেস্টমেন্ট ইনিশিয়েটিভ।
ইয়েমেনে সংঘাতের শুরু ২০১৪ সালে। জ্বালানি ভর্তুকি কমানো নিয়ে অসন্তোষ এবং জাতিসংঘের উদ্যোগে হওয়া জাতীয় সংলাপের ব্যর্থতার সুযোগ নিয়ে ইরানপন্থী হুতিরা রাজধানী সানা দখল করে। প্রেসিডেন্ট হাদির সরকার পিছু হটে। ২০১৫ সালের মার্চে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট সামরিক হস্তক্ষেপ শুরু করে। এ যুদ্ধে ক্ষুধা, রোগ ও মৌলিক সেবা ভেঙে পড়ায় কয়েক লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে।
দীর্ঘদিন অচলাবস্থার পর পরিস্থিতি বদলায় এ বছরের জুলাইয়ে। ইরান থেকে হুতি কর্মকর্তাদের নিয়ে আসা একটি বিমানের অবতরণ ঠেকাতে সৌদি নেতৃত্বাধীন বাহিনী সানা বিমানবন্দরে হামলা চালায়। জবাবে হুতিরা পাল্টা অবরোধের হুমকি দেয় এবং লোহিত সাগরে সৌদি জাহাজ চলাচলে নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করে। ইরান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল রপ্তানি ব্যাহত হওয়ায় লোহিত সাগর সৌদি আরবের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প পথ ছিল।
এ ঘটনা উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের টানাপোড়েনও সামনে এনেছে। একজন উপসাগরীয় বিশ্লেষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ইরানের সঙ্গে কূটনীতির বদলে যুদ্ধের পথে যাওয়ার ট্রাম্পের সিদ্ধান্তে সৌদি আরব আগে থেকেই অসন্তুষ্ট ছিল। হামলার পর ট্রাম্প মন্তব্য করেছেন, সৌদি আরব নিজেকে রক্ষা করতে সক্ষম। এতে ক্ষোভ আরও বেড়েছে।
ওই বিশ্লেষকের প্রশ্ন, দশকের পর দশক মার্কিন অস্ত্র কেনা ও নিরাপত্তার জন্য ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভর করার পর বিপদের সময় এমন অবস্থান নিলে সেই অংশীদারত্বের মূল্য কী থাকে।
এর মধ্যে গত আগস্টে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি সই করেছে। তবে তুরস্ক কবে, কতজন সেনা পাঠাবে তা এখনো অস্পষ্ট।