সবুজ নক্ষত্রের সন্ধান পেলেন বিজ্ঞানীরা

সবুজ নক্ষত্রটির বিষয়ে হল্যান্ডস জানান, এতে প্রধানত যেসব উপাদান রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম হলো ক্যালসিয়াম, সোডিয়াম এবং লিথিয়াম।

সবুজ নক্ষত্রের সন্ধান পেলেন বিজ্ঞানীরা

সিএনএন

শ্বেত বামন নক্ষত্র বিশ্লেষণ করতে গিয়ে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা প্রথমবারের মতো এমন একটি নক্ষত্রের সন্ধান পেয়েছেন, যা মানুষের চোখে সবুজ রঙের দেখাবে। এক নতুন গবেষণায় এমন তথ্য জানা গেছে।

অধিকাংশ তারার ক্ষেত্রেই রঙ মূলত এর তাপমাত্রার ওপর নির্ভর করে এবং তা কয়েকটি নির্দিষ্ট রঙেই সীমাবদ্ধ থাকে। তবে সূর্যের মতো যেসব তারা মারা যাওয়ার পর অতি-ঘন অবশিষ্টাংশে পরিণত হয়—সেই শ্বেত বামন নক্ষত্রগুলো চমৎকার নানা বৈচিত্র্যময় রঙে জ্বলজ্বল করতে পারে। বৃহস্পতিবার এমন তথ্য জানিয়েছেন এই গবেষণার প্রধান লেখক ও যুক্তরাজ্যের ওয়ারউইক বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্বিজ্ঞানী মার্ক হল্যান্ডস।

হল্যান্ডস বলেন, ‘সাধারণ তারাগুলোর রঙ কেবল কমলা, সাদা কিংবা নীল রঙেরই হয়ে থাকে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা যা পেয়েছি তা হলো—বেশিরভাগ শ্বেত বামন নক্ষত্রের ক্ষেত্রেও বিষয়টি একই রকম (অর্থাৎ সাধারণ রঙের মতো)। তবে কিছু ব্যতিক্রমী ক্ষেত্র রয়েছে যেখানে এই তারাগুলোর বাইরের স্তরের ভৌত প্রক্রিয়া এতটাই অদ্ভুত যে, তা তাদের আলোর বর্ণালীতে বেশ বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটায়।’

হল্যান্ডস জানান, এই তারাগুলোর বায়ুমণ্ডলে থাকা হিলিয়াম এবং অন্যান্য উপাদানের সামান্য উপস্থিতির মধ্যে পারস্পরিক বিক্রিয়ার ফলেই বর্ণালীর এই বিচ্যুতি ঘটে। তারাগুলো তাদের জীবদ্দশায় অন্যান্য কী ধরনের উপাদানের সংস্পর্শে এসেছে, তার ওপর ভিত্তি করে এক শ্বেত বামন নক্ষত্র থেকে আরেকটিতে এসব উপাদানের তারতম্য ঘটে।

উদাহরণস্বরূপ, পাথরে সাধারণত যে ধরনের উপাদান পাওয়া যায়—যেমন আয়রন (লোহা), ম্যাগনেশিয়াম এবং সোডিয়াম তা এই তারাগুলোর উপরিভাগে মিলতে পারে। এটি মূলত অতীতে আশেপাশে থাকা কোনো গ্রহমণ্ডলের অস্তিত্ব কিংবা “গ্রহাণুর মতো এমন কোনো বস্তুর প্রমাণ বহন করে, যা হয়তো একসময় এই শ্বেত বামন নক্ষত্রটির খুব কাছাকাছি চলে এসেছিল।”

তিনি বলেন, ‘গ্রহাণুটি চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে ধুলায় পরিণত হয় এবং সেই পাথুরে ধুলাবালি ও ধ্বংসাবশেষ শ্বেত বামন নক্ষত্রটির ওপর গিয়ে পড়ে।’

হল্যান্ডস আরও বলেন, ‘আর সেগুলো তারার বাইরের স্তরের সাথে মিশে যায়। তখন মূলত এটিকে কাজে লাগিয়েই বোঝা সম্ভব হয় যে ঐ পাথুরে বস্তুটি কী দিয়ে তৈরি ছিল। তাই শ্বেত বামন নক্ষত্রটিকে আমরা এক ধরনের রোগনির্ণায়ক যন্ত্র বা ডায়াগনস্টিক টুলের মতো ব্যবহার করে গ্রহের উপাদানের রাসায়নিক গঠন মেপে দেখতে পারি।’

ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় সান দিয়েগোর জ্যোতির্বিজ্ঞান ও জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক অ্যাডাম বারগাসার বলেন, ‘শ্বেত বামন নক্ষত্রটি গ্রহগুলোকে খণ্ড-বিখণ্ড করে ফেলছে, আর আমরা দেখতে পাচ্ছি প্রকৃতপক্ষে সেই গ্রহের ভেতরে কী ছিল—কোন উপাদানের অনুপাত কতটা ছিল—যা গ্রহগুলো কীভাবে গঠিত হয়েছিল তার সূত্র দেয়। এটি যেন একটি অপরাধের দৃশ্যপট, আর আমরা সেখানে পড়ে থাকা আলামতগুলো একে একে জড়ো করছি। এটি আমাদের সুদূর অতীতের কোনো এক সময়ে গ্রহটি কেমন ছিল এবং তা কীভাবে তৈরি হয়েছিল, সেই পুরো ইতিহাসটি পুনর্নির্মাণ করতে সাহায্য করছে।’

মানুষের কৌতূহল ও আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু

এই গবেষণার জন্য হল্যান্ডস পৃথিবীর ২০ পারসেক (প্রায় ৬৫ আলোকবর্ষ) দূরত্বের মধ্যে থাকা পরিচিত ১৫১টি শ্বেত বামন নক্ষত্র পর্যবেক্ষণ করেছেন।

সবুজ তারাটির বিষয়ে হল্যান্ডস জানান, এতে প্রধানত যেসব উপাদান রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম হলো ক্যালসিয়াম, সোডিয়াম এবং লিথিয়াম।

এই গবেষণার সঙ্গে যুক্ত না থাকা অধ্যাপক বারগাসার বলেন, ‘এটি এই তারাটি সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে এবং এতে কেন এত বিপুল পরিমাণ বস্তু বা উপাদান শোষিত ও সঞ্চিত হচ্ছে—তা অনুধাবনে আমার মধ্যেও বিশেষ আগ্রহ জাগিয়ে তুলেছে। মহাবিশ্বের এই নমুনার মধ্যে থাকা চরম ও ব্যতিক্রমী বস্তুপুঞ্জ সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানার ক্ষেত্রে এটি বিজ্ঞানীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও বেশ রোমাঞ্চিত করতে পারে।’

হল্যান্ডস আরও বলেন, ‘তালিকায় থাকা আরেকটি উল্লেখযোগ্য তারা দেখতে ছিল “প্রায় স্যামন মাছের মতো গোলাপি (স্যামন পিঙ্ক) রঙের, যার মূল কারণ ছিল সেখানে কার্বন অণুর উচ্চ ঘনত্বের উপস্থিতি।’

যদিও কোনো শ্বেত বামন নক্ষত্রই পৃথিবী থেকে সরাসরি খালি চোখে দেখা যায় না, তবে হল্যান্ডস নক্ষত্রের ‘বর্ণালী সংক্রান্ত ডেটা’ ব্যবহার করে সেগুলোর রঙ নির্ণয় করতে সক্ষম হয়েছেন। গবেষকদের এক বিবৃতিতে বিষয়টি সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘সূর্যের আলো প্রিজমের মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় যেমন সাতটি রঙে বিভক্ত হয়ে রংধনু তৈরি করে, ঠিক তেমনি তারার আলো যখন তরঙ্গদৈর্ঘ্য অনুযায়ী আলাদা হয়ে যায়, তখন যে রঙের বিন্যাস পাওয়া যায় সেটিই হলো এই বর্ণালী—যা মূলত তারাগুলোর অনন্য ‘আঙুলের ছাপ’ (ফিঙ্গারপ্রিন্ট) হিসেবে কাজ করে।’

হল্যান্ডস আরও বলেন, ‘এই গবেষণা মহাকাশের এই সুদূর ও রোমাঞ্চকর বস্তুগুলোকে আমাদের চেনা জগতের অনেক কাছাকাছি নিয়ে এসেছে।’

তিনি বলেন, ‘এটি বহুদূরে অবস্থিত এই মহাজাগতিক বস্তুগুলোর সাথে মানুষের এক চমৎকার আবেগীয় সম্পর্ক তৈরি করে। এগুলো এতটাই দূরে যে, অনেক সময় একজন গবেষক হিসেবেও আপনি যে জিনিসগুলো নিয়ে গবেষণা করছেন, সেগুলোর থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন বলে মনে হতে পারে। কিন্তু তখন আপনি যদি এর মধ্যে একটি মানবিক উপাদান যুক্ত করতে পারেন, তখন সেটিকে অনেক বেশি বাস্তব ও স্পষ্ট বলে মনে হয়।’

এই গবেষণার সাথে যুক্ত না থাকা পেন স্টেট স্ক্র্যান্টন-এর পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক ও জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানী অ্যাগনেস কিম বলেন, ‘সবুজ তারা সম্পর্কিত এই পর্যবেক্ষণগুলো বিদ্যমান তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি এবং এটি হয়তো শ্বেত বামন নক্ষত্র সম্পর্কে নতুন কোনো বড় আবিষ্কার তুলে ধরে না। তবে গবেষণাটি এই মহাজাগতিক বস্তুগুলোকে দেখার এবং বোঝার একটি অত্যন্ত চমৎকার ও আকর্ষণীয় দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে।’

কিম এক বার্তায় লেখেন, ‘বর্ণালী বিশ্লেষণ থেকে মানুষের চোখ প্রকৃতপক্ষে কী দেখতে পাবে—তা নিয়ে গবেষণা করাটা আমার কাছে পদার্থবিজ্ঞান ও জীববিজ্ঞান বা শারীরবিদ্যার এক দারুণ সংযোগস্থল বলে মনে হয়েছে। তারাগুলো যদি আমাদের খালি চোখে দেখার মতো যথেষ্ট কাছাকাছি থাকত, তবে কিছু তারাকে সবুজ এবং আরও মজার বিষয় হলো কিছু তারাকে গোলাপি দেখাত—বিষয়টি আমার খুব পছন্দ হয়েছে।’

বারগাসার আরও বলেন, ‘তাপমাত্রা এবং বায়ুমণ্ডলের বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে করা এই গবেষণার শ্রেণীবিন্যাসটি আগামী দিনে এই সংক্রান্ত গবেষণার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’

বারগাসার বলেন, ‘কিছু তারা হালকা বেগুনি-গোলাপি রঙের এবং অন্য কিছু তারা হালকা সবুজ ও নীল রঙের। আমরা জ্যোতির্বিজ্ঞানে সবসময় যেভাবে মহাজাগতিক বস্তুগুলোর শ্রেণীবিন্যাস করে থাকি, এ ধরনের শ্রেণীবিন্যাসও মূলত আমাদের একটি বিষয়ে আলোকপাত করতে সাহায্য করে—তা হলো, কেন এই ধরণের বস্তুগুলো নির্দিষ্ট এই রঙের হয়ে থাকে এবং তাদের রাসায়নিক গঠনের ভিত্তিতে তাদের মধ্যে কোনো পারস্পরিক সম্পর্ক রয়েছে কি না? এই তথ্যগুলো আমাদের কাছে অন্যান্য রূপেও রয়েছে, তবে আমার মনে হয় ডেটা বা তথ্যগুলোকে গুছিয়ে উপস্থাপন করার এটি একটি সহজ পদ্ধতি।’

পরবর্তীতে হল্যান্ডস আরও বেশ কিছু শ্বেত বামন নক্ষত্রের বর্ণালী বিশ্লেষণের পরিকল্পনা করছেন। বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তির অগ্রগতির কল্যাণে গবেষকরা এবার পৃথিবী থেকে আরও বহুদূরে অবস্থিত তারাগুলোর ওপর অনুসন্ধান চালাতে সক্ষম হবেন।

তিনি বলেন, ‘আমরা এমন কিছু শ্বেত বামন নক্ষত্র সম্পর্কে জানি যেগুলোর বর্ণালী এখনো আমাদের কাছে নেই। তবে খুব শিগগিরই এই পরিস্থিতির পরিবর্তন হতে যাচ্ছে; কারণ বেশ কিছু ‘স্পেকট্রোস্কোপিক সমীক্ষা’ (বর্ণালীবীক্ষণ জরিপ) থেকে তথ্য আসতে শুরু করবে।’

হল্যান্ডস আরও বলেন, ‘এর ফলে স্পেকট্রাম রয়েছে এমন শ্বেত বামন নক্ষত্রের সংখ্যা আগের চেয়ে প্রায় ১০ গুণ বেড়ে যাবে। আর তাই আমরা যদি ভাগ্যবান হই, তবে হয়তো মাত্র এক বা দুইটি সবুজ শ্বেত বামন নক্ষত্রের জায়গায় ১০ থেকে ২০টির সন্ধান পাবো।’