বাংলাদেশে হামের প্রকোপ বিশ্বে সর্বোচ্চ, টিকাদানে ঘাটতিকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা

সেপ্টেম্বরে দৈনিক গড়ে ১ হাজার ১৯৮ জন নতুন রোগী শনাক্ত হয়, যা মে-র পর সর্বোচ্চ।

বাংলাদেশে হামের প্রকোপ বিশ্বে সর্বোচ্চ, টিকাদানে ঘাটতিকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা

রয়টার্স

চলতি বছর বিশ্বের অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় বেশি হামের সন্দেহভাজন রোগী পাওয়া গেছে বাংলাদেশে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য উল্লেখ করে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, মার্চের মাঝামাঝি থেকে ৯ অক্টোবর পর্যন্ত প্রায় দুই লাখ দুই হাজার জনের শরীরে হামের লক্ষণ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ২২ হাজার জনের রোগ ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় নিশ্চিত হয়েছে।

এ সময়ে মারা গেছেন ১ হাজার ১৪৭ জন, যাদের ৯৪ শতাংশ পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু।

টিকার হার কমে যাওয়া

রয়টার্স বলছে, হামের প্রকোপ ঠেকাতে অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুর টিকা পাওয়া দরকার বলে মনে করে ডব্লিউএইচও। ২০২৪ সালে বাংলাদেশে প্রথম ডোজের হার ছিল ৯৬ শতাংশ, দ্বিতীয় ডোজের ৯৩ শতাংশ। কিন্তু ২০২৫ সালে তা নেমে আসে যথাক্রমে ৯০ ও ৮৬ শতাংশে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর সৃষ্ট অস্থিরতায় স্বাস্থ্যকর্মীদের ধর্মঘট হয়, টিকার সরবরাহ পিছিয়ে যায় এবং নিয়মিত টিকাদানের সঙ্গে চলা ফলোআপ কার্যক্রম ব্যাহত হয়।

সাজিনা বেগম তার স্বামী, মেয়ে এবং দুই বছর বয়সী ছেলে আরমান হোসেনের একটি ছবি দেখাচ্ছেন, যে জুলাই মাসে এই রোগে মারা যায়।

ডব্লিউএইচও ও ইউনিসেফের জুলাইয়ের প্রতিবেদনে ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের সরকারি টিকাদান-তথ্যের নির্ভুলতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে টিকা পাওয়া শিশুর সংখ্যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি দেখানো হয়েছিল।

বিশেষ অভিযানেও বাদ পড়ে শিশু

এপ্রিল ও মে মাসে বিশেষ অভিযানে প্রায় দুই কোটি শিশুকে টিকা দেওয়া হয়। সরকারের দাবি ছিল, ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী সবাই এর আওতায় এসেছে। তবে জুনে অন্য একটি স্বাস্থ্য কর্মসূচির তালিকায় একই বয়সী শিশু পাওয়া যায় প্রায় ৪০ লাখ বেশি, যা থেকে বোঝা যায় অনেক শিশু বাদ পড়েছিল।

সিলেটে একটি দড়িতে হামে আক্রান্ত লাবিবা আক্তারের নীল রঙের পোশাকটি ঝুলছে।

রয়টার্স সরকার ও ডব্লিউএইচওর বৈঠকের কার্যবিবরণী দেখেছে বলে জানিয়েছে। তাতে দেখা যায়, সময়ের অভাবে চার দফার জায়গায় মাত্র একবার প্রস্তুতি যাচাই করে অভিযান শুরু হয়। আগস্টের বৈঠকে উঠে আসে, হামে আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে টিকাবিহীনের হার অভিযানের আগে ছিল ৮২ শতাংশ, পরে ৮৫ শতাংশ।

প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী জিয়াউদ্দিন হায়দার সেপ্টেম্বরে রয়টার্সের কাছে ঘাটতির কথা স্বীকার করেন। তিনি এর জন্য অভিভাবকদের অনীহা ও শিশুদের অসুস্থতাকে দায়ী করেন।

২০২৬ সালের ১১ই মে, নারায়ণগঞ্জের একটি হাসপাতালের নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে পাঁচ মাস বয়সী ছেলে ঈসা হামের চিকিৎসা নেওয়ার সময় ইকবাল ও শারমিন অপেক্ষা করছেন।

সিলেটের চিত্র

সরকারি হিসাবে সিলেটে ১৮০ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। রয়টার্স সেখানে ১৬টি পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছে। আটটি পরিবার জানায়, তাদের এলাকায় টিকা দিতে কোনো স্বাস্থ্যকর্মী যাননি। অন্তত ছয়টি পরিবারের ভাষ্য, সন্তানের মৃত্যুর পরই স্বাস্থ্যকর্মীরা এসেছেন।

জুলাইয়ে সিলেটের এক গ্রামে টিকা না নেওয়া দুই বছরের আরমান হোসেনের মৃত্যু হয়। চিকিৎসার খরচ মেটাতে তার পরিবার অটোরিকশা বিক্রি করেছিল। ছাতকে জুনে নয় মাস বয়সী লাবিবা আক্তারও টিকা না নিয়েই মারা যায়। অথচ এপ্রিলে টিকার ন্যূনতম বয়স ছয় মাসে নামানোয় সে টিকা পাওয়ার যোগ্য ছিল। দুই পরিবারই বলেছে, টিকার বিষয়ে তাদের কেউ জানায়নি।

হাম প্রাদুর্ভাবে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর অন্যতম সিলেটের শহীদ শামসুদ্দিন আহমেদ হাসপাতালের জনাকীর্ণ হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে চিকিৎসা নিচ্ছে আট বছর বয়সী মাসুম।

সরকারের অবস্থান

মে মাসে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছিলেন, প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে এসেছে। কিন্তু সেপ্টেম্বরে দৈনিক গড়ে ১ হাজার ১৯৮ জন নতুন রোগী শনাক্ত হয়, যা মে-র পর সর্বোচ্চ।

মাসের শেষে সরকার আগে বাদ পড়া ৩৪ লাখ শিশুকে টিকা দিতে নতুন অভিযান শুরু করেছে। অক্টোবরে রয়টার্সের পাঠানো আরও প্রশ্নের উত্তর সরকার দেয়নি।

সিলেট অঞ্চলে হাম থেকে সেরে ওঠা দুই বছর বয়সী আল রাইয়ান তোহা তার মা রাজিয়া বেগমের কাঁধে ঘুমিয়ে আছে।

সামনের চ্যালেঞ্জ

ইউনিসেফ ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে, দেশের ৪০ শতাংশ পর্যন্ত শিশুর জন্মনিবন্ধন নেই। ফলে তাদের খুঁজে বের করা কঠিন। এ ছাড়া স্বাস্থ্যকর্মীর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ পদ খালি। বিশেষজ্ঞরা পাঁচ বছরের বেশি বয়সীদেরও টিকার আওতায় আনতে বলছেন, কারণ আক্রান্তদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এই বয়সের। একই সঙ্গে দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপও চলছে।

ডব্লিউএইচওর টিকা উপদেষ্টা ও নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মার্ক জিত বাংলাদেশের পরিস্থিতিকে অন্য দেশগুলোর জন্য সতর্কসংকেত হিসেবে দেখছেন। তাঁর মতে, আগে থেকে টিকা দিয়ে প্রাদুর্ভাব ঠেকানো জরুরি সাড়া দেওয়ার চেয়ে সহজ, সস্তা ও নিরাপদ।

সূত্র: রয়টার্স