নিজস্ব সংবাদদাতা
কালীগঞ্জের জামালপুরে মেয়াদোত্তীর্ণ নথিপত্রে পরিচালিত নুবহা জেনারেল হাসপাতালের বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযোগ, জেল-জরিমানা ও মামলার পরও থামছে না অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা।
এবার অপারেশন থিয়েটারে যথাযথ যন্ত্রপাতি না থাকায় এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র হালনাগাদ না থাকায় ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করেছে উপজেলা প্রশাসন।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) দুপুরে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আল-আমিন হালদার এ জরিমানা করেন।
মোবাইল কোর্ট ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, শনিবার দুপুরে নুবহা জেনারেল হাসপাতালে অভিযান চালানো হয়। তখন অপারেশন থিয়েটারে যথাযথ যন্ত্রপাতি পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় হালনাগাদ নথিপত্র দেখাতে ব্যর্থ হয়। পরে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯-এর ৩৭ ও ৫২ ধারায় ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
উল্লেখ্য, এর আগে ব্যবসার আড়ালে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের অর্থসহায়তাকারী হিসেবে চিহ্নিত নুবহা জেনারেল হাসপাতালের মিলন মিয়াকে গ্রেপ্তার করে ২০২৫ সালের ১১ আগস্ট আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠায় পুলিশ।
৪৭ বছর বয়সী মিলন মিয়া জামালপুর গ্রামের মৃত রওশন আলীর ছেলে। তিনি নুবহা জেনারেল হাসপাতালের পরিচালক ও মালিক।
হাসপাতাল ব্যবসার আড়ালে আওয়ামী লীগের ‘অর্থ সহায়তাকারী’ মিলন মিয়া কারাগারে
সে সময় পুলিশের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি রাতে কালীগঞ্জ উপজেলার তুমুলিয়া ইউনিয়নের ফিরিন্দা মোড়ে বিএনপির কার্যালয় ও মুদি দোকানে আগুন ধরিয়ে দেন আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা। এ ঘটনায় শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান, বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও সাবেক সংসদ সদস্য ফজলুল হক মিলনের ছবি পুড়ে যায়।
পরে ১৯ ফেব্রুয়ারি তুমুলিয়া ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক এনামুল হাসান বাদী হয়ে বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা করেন। ওই মামলায় জড়িত সন্দেহে ১০ আগস্ট রাত সোয়া ৮টার দিকে জামালপুর এলাকা থেকে মিলন মিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশ প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, নুবহা জেনারেল হাসপাতাল আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের আড্ডাখানা ও কার্যক্রমের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হতো। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় মিলন মিয়া বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে আর্থিক সহায়তা দিতেন এবং সরাসরি উপস্থিত থাকতেন।
জানা গেছে, ২০২৩ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকীতে তিনি হাসপাতালে বিনা মূল্যে মেডিকেল ক্যাম্পের আয়োজন করেন এবং জাতীয় দিবসগুলোতে আওয়ামী লীগের প্রচারমূলক বিজ্ঞাপন প্রকাশ করতেন।
তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তিনি স্থানীয় বিএনপি ও জামায়াতের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরি করেন। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের সঙ্গেও যোগাযোগ বজায় রাখেন এবং আর্থিক সহায়তা অব্যাহত রাখেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া ২০২৫ সালের ২২ জুলাই নুবহা জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসকের অবহেলায় অপারেশনের পর ছয় বছর বয়সী কাদ্দিহান খন্দকার সাদ্দান নামের এক শিশুর মৃত্যু হয়।
নিহত শিশু জামালপুর এলাকার বাসিন্দা যুবদল নেতা ও প্রকৌশলী খন্দকার ইমনের ছেলে। সে স্থানীয় একটি স্কুলের প্রথম শ্রেণিতে পড়ত।
কালীগঞ্জে পুনরায় চিকিৎসকের ‘অবহেলায়’ শিশু মৃত্যুর অভিযোগ
সে সময় জানা যায়, ২০ জুলাই সন্ধ্যায় শিশুটির নিতম্বে ব্যথা অনুভূত হলে তাকে নুবহা জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। কর্তব্যরত চিকিৎসক জানান, তার ফোঁড়া হয়েছে এবং অপারেশন প্রয়োজন। ওই দিন রাত ৯টা ১৫ মিনিটে গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দিন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. মাইনুল ইসলামের নেতৃত্বে মাত্র ১৫ মিনিটে অপারেশন সম্পন্ন হয়।
অপারেশনের কিছুক্ষণ পর শিশুটির রক্তবমি শুরু হয় এবং তার শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে। রাত সাড়ে ১১টার দিকে তাকে ঢাকায় রেফার করা হয়। পরে উত্তরা জেনারেল হাসপাতালের আইসিইউতে নেওয়ার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২২ জুলাই (মঙ্গলবার) ভোররাত ৩টার দিকে শিশু সাদ্দান মারা যায়। পরে হাসপাতালের মালিক মিলন মিয়া ও ডা. মো. মাইনুল ইসলামের নামে মামলা হয় বলেও জানা গেছে।
কালীগঞ্জে মেয়াদ উত্তীর্ণ নথিপত্রে পরিচালিত হাসপাতালে নবজাতকের মৃত্যু!
এটি ছিল নুবহা জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা-পরবর্তী দ্বিতীয় মৃত্যুর ঘটনা। এর আগে ২০২৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি একই হাসপাতালে বাহাদুরসাদী ইউনিয়নের সুমন মিয়ার স্ত্রী তাসলিমা আক্তার (২১) সিজারিয়ানের মাধ্যমে সন্তান প্রসবের পর নবজাতকের মৃত্যু হয়। সে সময় অভিযোগ ওঠে, গাইনি চিকিৎসক রাহিমা সুলতানার ভুল চিকিৎসায় নবজাতক মারা যায়।