কালীগঞ্জে পুনরায় চিকিৎসকের ‘অবহেলায়’ শিশু মৃত্যুর অভিযোগ

কালীগঞ্জে পুনরায় চিকিৎসকের ‘অবহেলায়’ শিশু মৃত্যুর অভিযোগ

নিজস্ব সংবাদদাতা : কালীগঞ্জ উপজেলার জামালপুরে মেয়াদোত্তীর্ণ লাইসেন্সে পরিচালিত ‘নুবহা জেনারেল হাসপাতাল’-এ চিকিৎসকের অবহেলায় অপারেশনের পর এক শিশুর মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে।

মঙ্গলবার (২২ জুলাই) ভোরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় প্রাণ হারায় সাড়ে ছয় বছর বয়সী কাদ্দিহান খন্দকার সাদ্দান।

নিহত শিশু জামালপুর এলাকার বাসিন্দা যুবদল নেতা ও প্রকৌশলী খন্দকার ইমনের পুত্র। সে স্থানীয় একটি স্কুলে প্রথম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত ছিল।

নুবহা জেনারেল হাসপাতাল ও নিহতের পরিবার সূত্রে জানা গেছে, রোববার (২০ জুলাই) সন্ধ্যায় শিশুটির নিতম্বে ব্যথা অনুভূত হলে তাকে নুবহা জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। সে সময় কর্তব্যরত চিকিৎসক জানান, তার ফোঁড়া হয়েছে এবং অপারেশন প্রয়োজন। ওইদিন রাত ৯টা ১৫ মিনিটে গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দিন আহমেদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. মাইনুল ইসলামের নেতৃত্বে মাত্র ১৫ মিনিটে অপারেশন সম্পন্ন হয়।

অপারেশনের কিছুক্ষণ পর শিশুটির রক্তবমি শুরু হয় ও তার শারীরিক অবস্থা দ্রুত অবনতি ঘটে। রাত সাড়ে ১১টার দিকে তাকে ঢাকায় রেফার্ড করা হয়। পরে তাকে উত্তরা জেনারেল হাসপাতালের আইসিইউতে নেওয়ার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় পরদিন মঙ্গলবার (২২ জুলাই) ভোর রাত ৩টার দিকে মৃত্যুবরণ করে শিশু সাদ্দান।

চিকিৎসকের বিরুদ্ধে একাধিক মৃত্যুর অভিযোগ

এটি ছিল নুবহা জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা-পরবর্তী দ্বিতীয় মৃত্যুর ঘটনা। এর আগে ২০২৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি একই হাসপাতালে বাহাদুরসাদী ইউনিয়নের সুমন মিয়ার স্ত্রী তাসলিমা আক্তার (২১) সিজারিয়ানের মাধ্যমে প্রসব করার পর নবজাতকের মৃত্যু হয়। সে সময় অভিযোগ ওঠে গাইনী চিকিৎসক রাহিমা সুলতানার ভুল চিকিৎসায় নবজাতক মৃত্যুবরণ করে বলে।

অভিযুক্ত চিকিৎসক মাইনুল ইসলামের বিরুদ্ধে অবহেলায় এর আগেও একাধিক রোগীর মৃত্যুর অভিযোগ রয়েছে

২০২৩ সালের ১৮ নভেম্বর কালীগঞ্জ সেন্ট্রাল হাসপাতালে কালীগঞ্জ মহিলা ডিগ্রি কলেজের ম্যানেজমেন্ট বিভাগের প্রসূতি শিক্ষক মুক্তা দে সিজারিয়ান অপারেশনের পর মারা যান।

এর আগে ২০২০ সালের ১০ এপ্রিল কালীগঞ্জ জনসেবা জেনারেল হাসপাতালে সিজারিয়ানের অপারেশনের পর মৃত্যু হয় বেতুয়া এলাকার মিন্টু মিয়ার স্ত্রী প্রসূতি মিশু বেগমের।

অপরদিকে ২০১৮ সালে একই চিকিৎসকের ভুল চিকিৎসায় কালীগঞ্জ সেন্ট্রাল হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করে পৌরসভার ৬নং ওয়ার্ডের ভাদগাতী গ্রামের নওশাদের ছেলে।

পরিবারের অভিযোগ ও কর্তৃপক্ষের বক্তব্য

সর্বশেষ নিহত শিশু কাদ্দিহান খন্দকার সাদ্দানের পিতা খন্দকার ইমন বলেন, “অপারেশনের পরপরই আমার ছেলের রক্তবমি শুরু হয়। সঠিক চিকিৎসা না পাওয়ার কারণেই তার মৃত্যু হয়েছে। চিকিৎসকের অবহেলার কারণে এই মৃত্যু ঘটেছে। আমরা আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি।”

নুবহা জেনারেল হাসপাতালের পরিচালক মিলন মিয়া দাবি করেন, “অপারেশনের পর শিশুটি স্বাভাবিক ছিল। হঠাৎ রক্তবমি শুরু হলে তাকে রেফার্ড করা হয়। অপারেশনের সঙ্গে মৃত্যুর কোনো সম্পর্ক নেই।”

ডা. মাইনুল ইসলামের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

কালীগঞ্জ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. আশরাফুল ইসলাম বলেন, “মৌখিক অভিযোগের ভিত্তিতে মঙ্গলবার দুপুরে কালীগঞ্জ সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আসাদুজ্জামান ও আমি হাসপাতালে পরিদর্শনে যাই। তবে লিখিত অভিযোগ না থাকায় আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ সম্ভব হয়নি।”

স্থানীয়রা অভিযোগ করছেন, কালীগঞ্জে অনেক প্রাইভেট ক্লিনিক ও হাসপাতাল মেয়াদোত্তীর্ণ লাইসেন্স নিয়ে চললেও যথাযথ তদারকি নেই। এ কারণে রোগী মৃত্যুর ঘটনা বাড়ছে এবং চিকিৎসকেরা দায় এড়িয়ে যাচ্ছেন।

আরো জানতে….

কালীগঞ্জ সেন্ট্রাল হাসপাতালে অভিযান, ২ লাখ ৫ হাজার টাকা জরিমানা

কালীগঞ্জে মেয়াদ উত্তীর্ণ নথিপত্রে পরিচালিত হাসপাতালে নবজাতকের মৃত্যু!

কালীগঞ্জে ভুল চিকিৎসায় প্রসূতির মৃত্যু, লাখ টাকায় রফাদফা!

কালীগঞ্জে প্রসূতির মৃত্যু: ময়নাতদন্তের জন্য কবর থেকে লাশ উত্তোলন

কালীগঞ্জে প্রসূতির মৃত্যু: কবর থেকে লাশ উত্তোলনের নির্দেশ এবং ঘটনার আদোপান্ত

কালীগঞ্জে প্রসূতির মৃত্যু: সেই মাসুদসহ ৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা, জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদ করবে পুলিশ

কালীগঞ্জে প্রসূতির মৃত্যু: হাসপাতালের পরিচালক বন্যাসহ ৬ জনকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব

কালীগঞ্জে ‘অ্যানেস্থেসিয়া’ চিকিৎসক দিয়ে সিজারিয়ান, প্রসূতির মৃত্যু: ৬ জন গ্রেপ্তার

কালীগঞ্জে ‘অ্যানেস্থেসিয়া’ চিকিৎসক দিয়ে সিজারিয়ান, প্রসূতির মৃত্যু: ছাড়পত্রে জালিয়াতি!