বিবিসি
অস্ত্র হাতে ‘মাদকবিরোধী অভিযান’ পরিচালনার ভিডিও নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনার মধ্যেই মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন ইশরাক হোসেন।
তিনি জানিয়েছেন, প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে তিনি নিজেই স্বেচ্ছায় অব্যাহতি চেয়েছেন, এবং প্রধানমন্ত্রী তাকে সেই সুযোগ দিয়েছেন।
কিন্তু, রবিরার (১৮ অক্টোবর) গণমাধ্যমে খবর প্রকাশ হয় যে, অস্ত্রকাণ্ডে ইশরাক হোসেনকে পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। ফলে তিনি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছেন নাকি প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে- সোমবারের সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের এই প্রশ্নেরও মুখোমুখি হয়েছিলেন ইশরাক হোসেন।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) দুপুরে ঢাকার জাতীয় প্রেসক্লাবে ওই সংবাদ সম্মেলনে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিমন্ত্রীর পদ ছাড়ার ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেছেন, অস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযানে নেমে তিনি কোনো ভুল করেননি।
একইসঙ্গে ইশরাক হোসেন বলেছেন, “যদি আমার দ্বারা কোনো ভুল হয়ে থাকে, আমি যদি কাউকে আঘাতপ্রাপ্ত করে থাকি বাংলাদেশের যে পর্যায়ের মানুষ হোক এই অভিযানের মাধ্যমে, সেটার জন্যে আগেই আমি দুঃখপ্রকাশ করে নিচ্ছি”।
রবিবার রাতে ইশরাক হোসেনের পদত্যাগ নিয়ে গণমাধ্যমের খবর, সেই খবরকে গুজব দাবি করে ইশরাকের বিবৃতি।
সোমবার সকালেই আবার আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগের জন্য সংবাদ সম্মেলনের ঘোষণা, পুরো বিষয়টিই ছিল নানা নাটকীয়তায় ভরা।
দুপুর দুইটায় সংবাদ সম্মেলনের ঘোষণা দেওয়া হলেও দেড়টার দিকেই জাতীয় প্রেসক্লাবে আসেন ইশরাক হোসেন। এসময় তার সাথে দলীয় নেতাকর্মীরাও আসেন, মিছিল-স্লোগান দিতে থাকেন।
সংবাদ সম্মেলনের কিছু আগে গণমাধ্যমের সাথে সংক্ষিপ্ত একটি সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, দলের ইচ্ছার বিরুদ্ধেই তাকে পদত্যাগ করতে হচ্ছে।
গত শনিবার অস্ত্র হাতে অবৈধ মাদক ব্যবসায়ীদের ধাওয়া করার একটি ভিডিও নিজেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করেছিলেন। সেই পোস্টটি ছড়িয়ে পড়লে এটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানা আলোচনার জন্ম দেয়।
এর আগেও বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় ঢাকা দক্ষিণ সিটির নগর ভবন আটকে রেখে টানা আন্দোলনের ঘটনায় নানা সমালোচনার জন্ম দিয়েছিল।
প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর প্রধানমন্ত্রীর গাড়ির পেছনে দৌড়ানো, জিয়াউর রহমানের মাজারে গিয়ে ঠেলাঠেলি কিংবা জাতীয় স্মৃতি সৌধে তিন বাহিনীর প্রধানের সাথে স্যালুটে অংশগ্রহণের মতো বিষয়গুলো নিয়েও গত কয়েক মাসে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানা ট্রলের শিকার হন তিনি।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান সংবাদ মাধ্যমকে বলেছেন, “প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশকে নতুনভাবে গড়তে চান। সরকার ও দলের শৃঙ্খলাবোধের বিষয়গুলোকে মাথায় রেখেই প্রধানমন্ত্রী সিদ্ধান্তগুলো নেন। সুতারং প্রধানমন্ত্রী যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, দলের নিয়ম শৃঙ্খলা মেনেই তাকে চলতে হবে”।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মিরপুরের রাড্ডা হাসপাতাল গুড়িয়ে দেওয়া কিংবা প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শনের বিষয়গুলোতে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের মাধ্যমে তারেক রহমান দলের সবাইকে এক ধরনের বার্তা দিতে চাচ্ছেন।
অস্ত্র হাতে অভিযান নিয়ে ব্যাখ্যা
গত শনিবার মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের অস্ত্র হাতে অবৈধ মাদক ব্যবসায়ীদের ধাওয়া করার একটি ভিডিও নিজের ভেরিফাইড ফেসবুকে প্রকাশ করেছিলেন।
ওই ঘটনার পরই এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানা প্রশ্ন ওঠে। অনেকে সমালোচনা করেন, একজন জনপ্রতিনিধি এভাবে অস্ত্র হাতে অভিযান পরিচালনা করতে পারেন কি না।
সোমবারের সংবাদ সম্মেলনে বিষয়গুলোর ব্যাখ্যাও দেন ইশরাক হোসেন। তিনি এসময় বলেন, “আমি জমি দখল বা চাঁদা তুলতে যাই নাই, মাদক নির্মূলের জন্য গিয়েছিলাম। আন্তর্জাতিক সিন্ডিকেটের সঙ্গে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রকদের যোগসাজশ আছে”।
মাদক নির্মূলে পুলিশের ভূমিকার প্রসঙ্গও টানেন তিনি। বলেন, “পুলিশ বাহিনী যেহেতু ইকুইপ্ট নয়; সুতরাং পুলিশ ও এলাকাবাসীদের সঙ্গে নিয়ে মাদক নির্মূলে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। থানাকে জানিয়ে ঘুণ্টিঘর এলাকায় মাদক নির্মূলের অভিযানে গিয়েছিলাম। ব্যক্তিগত নিরাপত্তার স্বার্থে আমি ব্যক্তিগত লাইসেন্স করা অস্ত্র হাতে রেখেছিলাম।’
তিনি এসময় বলেন, “পুলিশ বাহিনী ঘুণ্টিঘর এলাকায় যেতে সাহস পান না, কারণ ওরা উপর থেকে গুলি করে। গেন্ডারিয়ার ঘুণ্টিঘর এলাকায় স্কুল- কলেজে শিক্ষার্থীদের মাঝে মাদক ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছিল। এলাকাবাসীর অভিযোগের ভিত্তিতে মাদকের হাব ধ্বংস করতে গিয়েছিলাম”।
ইশরাক হোসেন বলেন, “মাদক ব্যবসায়ীদের হাতে অর্থ ও অস্ত্র থাকায় স্থানীয় বাসিন্দারা মুখ খোলে না। মাদকের কুখ্যাত আখরা ঘুণ্টিঘর মুন্সিরটেক এলাকা মাদকের আখরা। মাদক নির্মূলের লক্ষ্যে করা অভিযানের দৃষ্টি নানা ধরনের ন্যারেটিভ তৈরি করে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছে”।
এই বিএনপি নেতা বলেন, “কাউকে নিজের হাতে শাস্তি দেওয়া তাদের উদ্দেশ্য ছিল না।”
ইশরাক হোসেনের অভিযোগ তার অস্ত্র হাতে থাকার দৃশ্যটি সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমনভাবে তুলে ধরা হয়েছে, যাতে মাদকবিরোধী অভিযানের মূল উদ্দেশ্য ‘আড়ালে’ চলে যায়”।
পরে তিনি মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়ে বলেছেন, প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে সরে গেলেও মাদকের বিরুদ্ধে তার নির্বাচনী এলাকায় লড়াই তিনি অব্যাহত রাখবেন।
স্বেচ্ছায় পদত্যাগ, নাকি নির্দেশ?
আধাঘণ্টার এই সংবাদ সম্মেলনে ইশরাক হোসেন ওই অভিযানের ঘটনাটি প্রকাশে গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
ওইদিন অভিযানের ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “সেদিন রাতে জানতে পারি বিভিন্ন গণমাধ্যম বিষয়টিকে বিভিন্নভাবে উপস্থাপন করছে। একটা ছবি দিয়েই কতিপয় মহল ও সোশ্যাল মিডিয়া নানা ধরনের ন্যারেটিভ তৈরি করেছে। গণমাধ্যমের কর্তাব্যক্তিদের কাছ থেকে আশা ছিল হয়তো বা তারা কিছুটা সাহস যোগাবে”।
ইশরাক হোসেন এসময় জানান, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব থেকে স্বেচ্ছায় অব্যাহতি চেয়েছেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে প্রাথমিক বক্তব্য শেষে সাংবাদিকদের পাঁচটি প্রশ্ন করার সুযোগ দেন ইশরাক হোসেন। সাংবাদিকদের প্রশ্ন ছিল তিনি কী স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করছেন নাকি পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
রবিবার রাতে বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয় প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে ইশরাক হোসেনকে পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। পরে সেই খবরকে গুজব ও অসত্য হিসেবে আখ্যা দিয়ে নিজের ভেরিফাইড ফেসবুক পোস্টে লিখেন- “ইশরাক হোসেনের “পদত্যাগ” বা “তাঁকে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে” মর্মে যে সংবাদটি প্রচারিত হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ অসত্য, ভিত্তিহীন, বানোয়াট ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত”।
এ সম্পর্ক সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে একটু কৌশলে ইশরাক হোসেন বলেন, “আমি যদি প্রধানমন্ত্রীকে গিয়ে বলি আমি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করতে চাচ্ছি, অফিসিয়ালি কিন্তু তার নির্দেশই আসবে। এতটুকু বোঝার সক্ষমতা আপনাদের রয়েছে। উনি (প্রধানমন্ত্রী) ক্যাবিনেটের প্রধান, উনি নির্দেশই দিবেন। উনি আমাকে অনুরোধ করবেন না যে, ঠিকাছে তুমি চাচ্ছো আমি তোমার অনুরোধ রক্ষা করলাম”।
“আমি গিয়ে ওনার সাথে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে আমার অভিব্যক্তি প্রকাশ করেছি এবং আমি বলেছি যে আমি এটা চাই, উনি তাৎক্ষনিক নির্দেশ দিয়েছেন, ঠিকাছে এটাই বাস্তবায়ন হবে। যেহেতু তুমি চাচ্ছো”, যোগ করেন তিনি।
আগের দিন রাতে গণমাধ্যমের খবর প্রকাশকে অসত্য দাবি করার পরদিনই আবার পদত্যাগের ঘোষণার বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন করা হয় সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে।
জবাবে তিনি দাবি করেন, তার পদত্যাগের এই অফিসিয়াল সিদ্ধান্ত সোমবার সকালেই এসেছে। কিন্তু এটি নিয়ে গণমাধ্যম একটি কনফিউশন তৈরি করেছে।
পদত্যাগ নিয়ে নাটকীয়তা-গুঞ্জন
শনিবারের ওই ঘটনাটি নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। সেখানে অনেকেই একজন প্রতিমন্ত্রীর অস্ত্র হাতে এই অভিযান নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
এই ঘটনা নিয়ে এমন আলোচনার মধ্যেই তাকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হতে পারে এমন গুঞ্জনও উঠেছিল রবিবার।
প্রথমে একের পর এক বিভিন্ন গণমাধ্যমে এই খবর প্রচার শুরু হলে প্রথমে তা কার্যত প্রত্যাখ্যান করেছিলেন ইশরাক হোসেন।
এ নিয়ে সংবাদ মাধ্যমকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তা, বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন নেতার সাথে কথা বলে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের একজন কর্মকর্তা সংবাদ মাধ্যমকে জানান, রবিবার দুপুরে ইশরাক হোসেনকে তলব করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রী তাকে পদত্যাগের জন্যও বলেন। এ সময় তিনি একটি খসড়া পদত্যাগপত্রের খসড়াও তৈরি করেছিলেন।
পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রী বিকেল থেকে কয়েকটি অনুষ্ঠানে ব্যস্ত সময় পার করেন। রাত এগারোটার দিকে এই অনুষ্ঠান শেষ হয়।
ওই অনুষ্ঠান শেষে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের একজন কর্মকর্তা সংবাদ মাধ্যমকে জানান, প্রধানমন্ত্রী ইশরাক হোসেনকে পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছেন সেটি সত্য বলেই তিনি জানেন”।
তবে এই সিদ্ধান্তটি নিয়ে দলের ভেতরও নানা আলোচনা হয়েছে বলেও বিএনপির একাধিক সূত্র জানিয়েছে। তবে দলের একটি পক্ষ তাকে পদে বহাল রাখার পক্ষেও ছিলেন বলেও দলটির একাধিক নেতা জানিয়েছেন।
সোমবার সকাল সাড়ে আটটার দিকে ইশরাক হোসেন দুপুরে সংবাদ সম্মেলনে প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করবেন বলেও ঘোষণা দেন। এই ঘোষণার পরই রোববার রাত থেকে ওঠা গুঞ্জন ও আলোচনার অবসান ঘটে।
সোমবার জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে যোগ দেওয়ার আগে এই বিষয়টি নিয়ে একটি ইঙ্গিতও দিয়েছেন তিনি। সেখানে তিনি বলেছেন, মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে গিয়েই আজকে এই পরিস্থিতি। যেখানে আমাকে মন্ত্রিসভা থেকে দলের ইচ্ছার বিরুদ্ধে, মানে দল চায় নি কিন্তু যে কোন কারণে পদত্যাগ করতে হচ্ছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, “এটা প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত। তিনি যে সিদ্ধান্ত নেবেন সেই সিদ্ধান্ত তো মানতে হবে। সবাইকে দলের শৃঙ্খলা মেনেই চলতে হবে”।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এই ঘটনাটিকে ইতিবাচক হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।
বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ সংবাদ মাধ্যমকে বলেছেন, “প্রধানমন্ত্রী যদি তার অবস্থানে দৃঢ় থাকেন তাহলে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা হয়। নাহলে নেতাকর্মীরা অনেকটাই লাগামহীন হয়ে পড়ে”।