গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় আশুলিয়ায় ছয়জনের মরদেহ পোড়ানোর মামলায় রাজসাক্ষী হওয়া পুলিশের সাবেক উপপরিদর্শক শেখ আবজালুল হক কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন। ট্রাইব্যুনালের রায়ের প্রায় আট মাস পর তিনি ছাড়া পেলেন।
কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-২-এর ডেপুটি জেলার মো. আফতাবুজ্জামান সংবাদ মাধ্যমকে জানিয়েছেন, ১৩ অক্টোবর সকালে আবজালুল হক কারাগার থেকে বের হন।
তিনি বলেন, জামিনের আদেশ কারাগারে পৌঁছানোর পর গোয়েন্দা পুলিশ, ঢাকার প্রসিকিউশন, ঢাকার পুলিশ সুপারের কার্যালয়, গাজীপুরের ডিসি প্রসিকিউশন, ইউএসবি ও সিটিএসবিসহ সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরে বার্তা পাঠানো হয়। সবখান থেকে ছাড়পত্র পাওয়ার পর তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
ডেপুটি জেলার বলেন, ট্রাইব্যুনালের মামলায় আবজালুল হক আগেই অব্যাহতি পেয়েছিলেন। কিন্তু আশুলিয়া থানার আরেকটি মামলা বিচারাধীন থাকায় তখন তিনি মুক্তি পাননি। সেই মামলায় জামিন পাওয়ার পরই তার মুক্তির পথ খোলে।
গত ৫ ফেব্রুয়ারি বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এই মামলার রায় দেয়। রায়ে সাবেক সংসদ সদস্য মুহাম্মদ সাইফুল ইসলামসহ ছয়জনের মৃত্যুদণ্ড হয়। সাতজন পুলিশ কর্মকর্তা পান যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অন্যরা হলেন আশুলিয়া থানার তৎকালীন ওসি এএফএম সায়েদ রনি, এসআই আবদুল মালেক, সাবেক এএসআই বিশ্বজিৎ সাহা, কনস্টেবল মুকুল চোকদার ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা রনি ভূঁইয়া।
যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পেয়েছেন ঢাকা রেঞ্জের সাবেক ডিআইজি সৈয়দ নুরুল ইসলাম, সাবেক পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান রিপন, সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহিল কাফী ও শাহিদুল ইসলাম, সাবেক পরিদর্শক মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান ও নির্মল কুমার দাস এবং ডিবির তৎকালীন পরিদর্শক আরাফাত হোসেন।
এসআই আরাফাত উদ্দিন ও এএসআই কামরুল হাসানের সাত বছর করে কারাদণ্ড হয়। রাজসাক্ষী হওয়ায় আবজালুল হককে ক্ষমা করে খালাস দেওয়া হয়।
রায়ে ট্রাইব্যুনাল বলেছে, এসব অপরাধের লক্ষ্য শুধু প্রাণ কেড়ে নেওয়া ছিল না, বরং আতঙ্ক ছড়িয়ে ভিন্নমত দমন করা এবং ভয়ের মাধ্যমে ক্ষমতা ধরে রাখাও ছিল উদ্দেশ্য।
আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন, ১৯৭৩-এর ১৫ ধারায় অপরাধে জড়িত কেউ সব ঘটনা পূর্ণাঙ্গ ও সত্যভাবে প্রকাশ করলে ক্ষমা পেতে পারেন। এই বিধানেই আবজালুল হক রাজসাক্ষী হন। বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত রাজসাক্ষীকে হেফাজতে রাখার নিয়ম রয়েছে।
২০২৫ সালের ২১ আগস্ট তিনি দোষ স্বীকার করে ক্ষমা চেয়ে আবেদন করেন। ট্রাইব্যুনাল তা মঞ্জুর করে তার পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেয়। ওই বছরের ১৭ নভেম্বর তিনি মামলার ২৩তম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন।
সাক্ষ্য দেওয়ার সময় তিনি শহীদ পরিবারগুলোর কাছে ক্ষমা চান। তবে বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশের মুখে তার ‘কিছু করার ছিল না’।
তিনি আদালতকে জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর ছাত্র-জনতা বিজয় মিছিল নিয়ে থানার দিকে এলে তৎকালীন ওসি সায়েদের নির্দেশে বিশ্বজিৎ সাহাসহ আরেকজন গুলি চালান।
জেরায় আবজালুল হক বলেন, ১৫ আগস্ট তিনি থানার অস্ত্রাগারের দায়িত্বে থাকা এসআই আউয়ালের কাছে অস্ত্র ও গুলি জমা দেন। ৫ আগস্ট তার নামে ইস্যু করা ১০টি গুলিও তিনি জমা দেন। ৫ থেকে ১৪ আগস্ট পর্যন্ত তিনি ‘ট্রমায়’ ছিলেন বলেও জানান।
পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের পর তিনিই মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় রাজসাক্ষী হওয়া দ্বিতীয় পুলিশ সদস্য।
জেরা চলাকালে রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের আইনজীবীদের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হয়। আসামি আব্দুল্লাহিল কাফীর আইনজীবী সৈয়দ মিজানুর রহমান জানতে চান, এএসআই রাজু আহমেদের মৃত্যুর কথা আবজালুল হক থানায় এসে শুনেছিলেন কি না। প্রসিকিউটর মো. মিজানুল ইসলাম আপত্তি জানিয়ে বলেন, রাজসাক্ষীর বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন করা গেলেও এ ধরনের প্রশ্ন করা যায় না।
জবাবে মিজানুর রহমান বলেন, একজন পুলিশ সদস্যকে মেরে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে, সে প্রশ্ন কেন করা যাবে না। তিনি যুক্তি দেন, প্রসিকিউশন যেমন একজন মায়ের আবেদনের বিচার চাইতে এসেছে, এটিও নিহত রাজুর স্ত্রীর আবেদন।
প্রসিকিউটর তখন জানতে চান, আসামিপক্ষের আনা নথি দেখানোর অনুমতি আছে কি না এবং সাফাই সাক্ষীর তালিকা দেওয়া হয়েছে কি না। মিজানুর রহমান বলেন, সাফাই সাক্ষীর নাম দিলে হুমকি দেওয়া শুরু হয়। এ প্রসঙ্গে তিনি মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাক্ষ্য দিতে এসে ‘গুম’ হওয়া সুখরঞ্জন বালির কথা উল্লেখ করেন।
ট্রাইব্যুনাল অসন্তোষ প্রকাশ করে বলে, সাক্ষ্য নিতে গেলেই এত কাহিনি শুরু হয়। বিচারকেরা দুই পক্ষকেই আদালতের পরিবেশ বজায় রাখতে বলেন।
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আশুলিয়া থানার সামনে আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে পুলিশ গুলি চালায়। এতে সাজ্জাদ হোসেন ওরফে সজল, আস সাবুর, তানজীল মাহমুদ সুজয়, বায়েজিদ বুসতামি, আবুল হোসেন, ওমর ফারুক ও মোহাম্মদ শাহাবুল ইসলাম গুলিবিদ্ধ হন।
অভিযোগে বলা হয়, পরে একজন জীবিত ব্যক্তি ও ছয়জনের মরদেহ একটি ভ্যানে স্তূপ করে পেট্রল ঢেলে পুড়িয়ে দেওয়া হয়।
২০২৫ সালের ২ জুলাই ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল হয়। ২১ আগস্ট অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ আসে। ২০২৬ সালের ২০ জানুয়ারি যুক্তিতর্ক শেষ হয় এবং ৫ ফেব্রুয়ারি রায় ঘোষণা করা হয়।