গাজীপুর কণ্ঠ, প্রযুক্তি ডেস্ক
ওয়েবসাইট বানানোর বহুল ব্যবহৃত প্রোগ্রামিং ভাষা পিএইচপিতে দুটি গুরুতর নিরাপত্তা ত্রুটি ধরা পড়েছে। হামলার ঝুঁকি এড়াতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সরকারি ও বেসরকারি অনেক প্রতিষ্ঠান নিজেদের ওয়েবসাইট সাময়িকভাবে বন্ধ রেখেছে।
বুধবার (২১ অক্টোবর) ত্রুটি দুটি সারিয়ে নতুন সংস্করণ প্রকাশ করা হয়েছে। তবে সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, ইতিমধ্যে কিছু ওয়েবসাইটে হামলার চেষ্টা শুরু হয়ে গেছে।
ত্রুটি ধরা পড়ল কীভাবে
পিএইচপির নির্মাতারা মঙ্গলবার দুটি গুরুতর ত্রুটির কথা জানান। সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান ক্যালিফ ও উইজের গবেষকেরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সাহায্যে এগুলো খুঁজে বের করেছেন। প্রতিষ্ঠান দুটির দাবি, এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ত্রুটিগুলো কারও চোখে পড়েনি।
উইজ জানিয়েছে, অত্যাধুনিক এআই মডেল কাজে লাগিয়ে তারা কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই একাধিক অ্যাপ্লিকেশনের জন্য কার্যকর হামলার কৌশল বানাতে ও তা প্রয়োজনমতো বদলে নিতে পেরেছে। প্রতিষ্ঠানটির অনুমান, ইন্টারনেটের প্রায় ৭০ শতাংশ এই ত্রুটির কারণে ঝুঁকিতে পড়তে পারে। বিবিসি বলছে, এ সংখ্যা তারা স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি।
ওপেনএআই তাদের এক ব্লগ পোস্টে একে সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা সমস্যা বলে বর্ণনা করেছে।
কোথায় কোথায় ওয়েবসাইট বন্ধ
রয়টার্স, এএফপি ও বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, সতর্কতার অংশ হিসেবে নেদারল্যান্ডস, ফিনল্যান্ড ও ফ্রান্সের বিভিন্ন সরকারি সংস্থা ওয়েবসাইট বন্ধ করেছে।
- – নেদারল্যান্ডস: জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা কেন্দ্র, সরকারি পোর্টাল ওভারহেইড.এনএল, রটারডাম বন্দর, জাতীয় ফুটবল সংস্থা কেএনভিবি, পাঁচটি বৃহত্তম রাজনৈতিক দলের ওয়েবসাইট এবং কয়েকটি হাসপাতালের ওয়েবসাইট।
- – ফিনল্যান্ড: সরকারি তথ্যপ্রযুক্তি সেবা দেওয়া প্রতিষ্ঠান ভালতোরি সরকারি নেটওয়ার্কের ওয়েব সেবা বন্ধ করেছে।
- – ফ্রান্স: স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিরাপত্তা আপডেট প্রকাশের অপেক্ষায় স্থানীয় প্রশাসনের ওয়েবসাইটগুলো সাময়িকভাবে বন্ধ রেখেছে।
- – ডেনমার্ক: পৌরসভাগুলোর তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান কমবিট কয়েকটি সেবা বন্ধ করেছে। এর মধ্যে আছে দেশটির জাতীয় স্কুল যোগাযোগ প্ল্যাটফর্ম।
যুক্তরাজ্যে এডিনবরা কাউন্সিলের ওয়েবসাইট এবং বিবিসির ‘ডক্টর হু’ ও ‘দ্য ট্রেইটরস’-এর মতো কয়েকটি অনুষ্ঠানের ওয়েবপেজে ঢোকা যায়নি। তবে এর সঙ্গে পিএইচপির ত্রুটির সরাসরি সম্পর্ক আছে কি না, তা নিশ্চিত নয়।
ইন্টারনেটের কতটা অংশ ঝুঁকিতে
ওয়েব প্রযুক্তি পর্যবেক্ষক প্রতিষ্ঠান ডব্লিউথ্রিটেকস-এর তথ্য বলছে, যেসব ওয়েবসাইটের প্রোগ্রামিং ভাষা শনাক্ত করা যায়, তার প্রায় ৭৫ শতাংশ পিএইচপিতে চলে। পিএইচপির ওপর নির্ভর করে চলা ওয়ার্ডপ্রেস একাই বিশ্বের প্রায় ৪৩ শতাংশ ওয়েবসাইট পরিচালনা করে। এ ছাড়া ড্রুপাল, জুমলা ও ম্যাজেন্টোর মতো প্ল্যাটফর্মেও পিএইচপি ব্যবহার হয়।
ফলে ঝুঁকির আওতায় পড়তে পারে সরকারি পোর্টাল, সংবাদমাধ্যম, ই-কমার্স ব্যবস্থা, এমনকি ছোট প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটও।
হামলার আশঙ্কা নিয়ে সতর্কতা
যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা (এনএসএ) বুধবার সতর্ক করেছে, এই ত্রুটি কাজে লাগিয়ে হ্যাকাররা সরাসরি সার্ভারের ফাইল সিস্টেম বা ডেটাবেসে ঢুকে পড়তে পারে। সংস্থাটির মতে, তাৎক্ষণিক সংশোধন সম্ভব না হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর ওয়েবসাইট বন্ধ রাখা উচিত।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের কম্পিউটার ইমার্জেন্সি রেসপন্স টিম (সিইআরটি-ইইউ) জানিয়েছে, ব্যবহারকারীর অনুমতি ছাড়াই দূর থেকে কোড চালানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। এতে হ্যাকাররা ক্ষতিকর সফটওয়্যার বসিয়ে দিতে বা ওয়েবসাইট অচল করে দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, হ্যাকাররা একেকটি ওয়েবসাইটকে আলাদা করে লক্ষ্য না বানিয়ে পুরো ইন্টারনেট ঘেঁটে পিএইচপির দুর্বল সংস্করণ চালানো সার্ভার খুঁজে নিতে পারে এবং একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক সার্ভারে ঢোকার চেষ্টা চালাতে পারে।
সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান সোফোসের কাউন্টার থ্রেট ইউনিটের বিশেষজ্ঞ ডন স্মিথ বিবিসিকে বলেছেন, হ্যাকারদের কাছে এই দুর্বলতা সম্ভবত অগ্রাধিকারের লক্ষ্য হয়ে উঠবে। তাঁর মতে, সমস্যা শুধু আপডেট বসানো নয়; কোনো প্রতিষ্ঠানের ঠিক কোথায় কোথায় পিএইচপি চলছে, সেটা খুঁজে বের করাই বড় চ্যালেঞ্জ।
ক্লাউডফ্লেয়ারের প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা ডেন কেইনেখট এক্সে লিখেছেন, ত্রুটি কাজে লাগিয়ে প্রাথমিক পর্যায়ের হামলা শুরু হয়েছে। হামলার নতুন কৌশল সামনে আসায় তাঁদের প্রতিষ্ঠান ফায়ারওয়ালের সুরক্ষা হালনাগাদ করছে। তবে এটি সাময়িক প্রতিরোধ বলে তিনি উল্লেখ করেছেন এবং দ্রুত নিরাপত্তা আপডেট বসানোর পরামর্শ দিয়েছেন।
কী করণীয়
ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া, জাপান ও যুক্তরাজ্যের সাইবার নিরাপত্তা সংস্থাগুলো পিএইচপি ব্যবহারকারীদের দ্রুত আপডেট বসাতে বলেছে। যুক্তরাজ্যের জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা কেন্দ্র বলেছে, তাৎক্ষণিক সংশোধন সম্ভব না হলে ঝুঁকিপূর্ণ সিস্টেম পুরোপুরি সুরক্ষিত না হওয়া পর্যন্ত বন্ধ রাখার কথা ভাবা উচিত।
কোন কোন সংস্করণ আক্রান্ত, তা এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। সিইআরটি-ইইউর সতর্কতা অনুযায়ী, ২০০৪ সালে প্রকাশিত পিএইচপি ৫ এবং তার পরের সংস্করণগুলোও ঝুঁকিতে থাকতে পারে। পিএইচপি ফাউন্ডেশন আপাতত সাম্প্রতিক সংস্করণগুলোর জন্য সংশোধনী দিয়েছে। যাঁরা পিএইচপি ৮.১ বা তার আগের সংস্করণ চালাচ্ছেন, তাঁদের নতুন সংস্করণে আপগ্রেড করতে বলা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংশোধনী বসানোর পাশাপাশি কোনো সিস্টেমে আগেই অনুপ্রবেশ ঘটেছে কি না, তা-ও পরীক্ষা করে দেখা জরুরি। তৃতীয় পক্ষের সফটওয়্যার, হোস্টিং সেবা এবং পিএইচপি যুক্ত অন্য ব্যবস্থার নিরাপত্তা আপডেটও নিয়মিত নজরে রাখতে হবে।