ট্রাম্প দেখছে চুক্তির সুযোগ, পুতিন দেখছে রাশিয়ার জয়

যুদ্ধের সম্মুখসারিতে প্রতি মাসে হাজার হাজার “তরুণ ও সুন্দর শিশু” প্রাণ হারাচ্ছে।

ট্রাম্প দেখছে চুক্তির সুযোগ, পুতিন দেখছে রাশিয়ার জয়

গাজীপুর কণ্ঠ, আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগ বারবার ব্যর্থ হচ্ছে। সেন্ট পিটার্সবার্গে ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সর্বশেষ বৈঠকেও দেখা গেছে, দুই পক্ষ পরিস্থিতিকে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে দেখছে। ওয়াশিংটন চুক্তির সম্ভাবনা দেখছে, আর মস্কো দেখছে নিজেদের কৌশলের সাফল্য।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলে আসছেন, যুদ্ধের সম্মুখসারিতে প্রতি মাসে হাজার হাজার “তরুণ ও সুন্দর শিশু” প্রাণ হারাচ্ছে। ইঙ্গিতে তিনি এমনও বলেছেন, তিনি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট হলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই চুক্তি হয়ে যেত।

তাঁর হিসাবে যুদ্ধ থামলে প্রাণহানি বন্ধ হবে, মস্কোর ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল হবে এবং লাভজনক বাণিজ্যচুক্তির পথ খুলবে। কিন্তু রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন, ট্রাম্প নন। ইউক্রেনে ঘোষিত যুদ্ধলক্ষ্য থেকে সরে আসার আগ্রহ পুতিনের তেমন দেখা যাচ্ছে না। প্রাণহানি কিংবা বিপুল অর্থনৈতিক সুবিধা, কোনোটিই এতে প্রভাব ফেলছে না। যুদ্ধ এখন পঞ্চম বছরে।

উইটকফ ট্রাম্পের ব্যবসায়িক সহযোগী ছিলেন, এখন তিনি যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ আলোচক। বৈঠকে পুতিন তাঁকে বলেন, এক দিন আগে নরওয়েতে অনুষ্ঠিত আলোচনার ফলাফল নিয়ে তিনি “কৌতূহলী”। ওই আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও ন্যাটোর কর্মকর্তারা ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে নতুন শান্তি প্রস্তাব নিয়ে বসেছিলেন। প্রস্তাবে মস্কোর জন্য অর্থনৈতিক প্রণোদনাও ছিল।

ক্রেমলিনের এক শীর্ষ সহযোগী পরে নিশ্চিত করেন, ট্রাম্পের দূত রুশ নেতাকে ওই আলোচনার বিষয়ে অবহিত করেছেন। একই সঙ্গে তিনি বলেন, “প্রকৃতপক্ষে ইউক্রেন সংকট সমাধানের জন্য মূল্যবান কিছু এতে ছিল না।”

এই প্রতিক্রিয়া অপ্রত্যাশিত নয়। ক্রেমলিন তার কঠোর অবস্থান থেকে সরেনি। তাদের দাবির মধ্যে আছে ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলীয় দনবাস অঞ্চলের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ এবং কিয়েভের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা-ব্যবস্থায় মস্কোর মতামতের সুযোগ।

গত সপ্তাহে ট্রাম্প রুশ ডিজেল রপ্তানির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেন। যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে জ্বালানির দাম কমানোই ছিল এর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য। তবে এতে রাশিয়াও বড় অর্থনৈতিক সুবিধা পেয়েছে। এর পরও হোয়াইট হাউস হয়তো আশা করেছিল, মস্কো আরও নমনীয় হবে।

পরে ট্রাম্প একটি “জ্বালানি যুদ্ধবিরতি” ঘোষণা করেন। এর আওতায় ইউক্রেনকে রুশ তেল শোধনাগারে ড্রোন হামলা বন্ধ করতে হতো। উদ্যোগটি সফল হয়নি। পারস্পরিক দোষারোপের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ও ব্যাহত হয়। এর মধ্যেই ট্রাম্প ইউক্রেনের নেতৃত্ব বদলের আহ্বান জানান। ক্রেমলিনের কাছে এই অবস্থান অনুকূল।

মস্কো এসব প্রস্তাব, প্রণোদনা ও কিয়েভের প্রতি ওয়াশিংটনের অবজ্ঞাকে ছাড় দেওয়ার সংকেত হিসেবে নিচ্ছে না। বরং তারা মনে করছে, যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপারে তাদের কৌশল কাজ করছে। এই বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পুতিন বোঝেন কী ট্রাম্পকে আকৃষ্ট করে। বড় অর্থনৈতিক চুক্তির প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি মেজাজি ট্রাম্পের মনোযোগ অনায়াসে অন্যদিকে ঘুরিয়ে রাখছেন।

সেন্ট পিটার্সবার্গের বৈঠকেও ক্রেমলিন আরও প্রস্তাব তুলেছে। পুতিন ডিজেল-সংক্রান্ত বিতর্কিত সিদ্ধান্তের প্রশংসা করেন এবং বলেন, রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্রে গুরুত্বপূর্ণ সারের রপ্তানিও বাড়াতে পারে। রুশ সার্বভৌম সম্পদ তহবিলের প্রধান কিরিল দিমিত্রিয়েভ ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে ক্রেমলিনের গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগকারী। তিন ঘণ্টার আলোচনা শেষে তিনি বলেন, “আমরা ডেটা সেন্টার, জ্বালানি খাত ও জ্বালানি সহযোগিতাসহ বিভিন্ন প্রকল্প নিয়ে আলোচনা করছি।”

অর্থনৈতিক প্রস্তাবের বাইরেও ক্রেমলিন সুসম্পর্ক ধরে রাখার চেষ্টা করছে। বৈঠকের আগে পুতিন ৭৪ বছর বয়সী মার্কিন নাগরিক স্টিফেন হাবার্ডকে মুক্তি দেন। মিশিগানের এই বাসিন্দাকে ২০২২ সালে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের শুরুতে ইউক্রেনে আটক করা হয়েছিল। চার বছর তিনি রাশিয়ার এক প্রত্যন্ত কারাগারে বন্দী ছিলেন। খবরে বলা হয়েছে, এ সময় তিনি গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগেছেন।

উইটকফ এই মুক্তিকে “একজন মানবতাবাদীর কাজ” বলে বর্ণনা করেন। হোয়াইট হাউস একে ট্রাম্পের চুক্তি সম্পাদনের দক্ষতা ও পুতিনের শ্রদ্ধার প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেছে। ট্রাম্পের নিজস্ব প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া বিবৃতিতে বলা হয়, “প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রতি সম্মানের কারণে যুক্তরাষ্ট্রকে বিনিময়ে কিছু দিতে হয়নি। রাশিয়ার জন্য এটি নজিরবিহীন পরিস্থিতি।”

তবে কেজিবির সাবেক কর্মকর্তা পুতিন বিষয়টিকে একইভাবে দেখছেন, এমনটা মনে হয় না।