গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : মাঠ প্রশাসনে চলছে নির্বাচনী রদবদল। শনিবার দু’জন জেলা প্রশাসককে বদলি করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের (ইসি) চাওয়া অনুযায়ী এক বছরের বেশি একই স্থানে থাকা ইউএনওদের তালিকা করছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। ছয় মাসের বেশি একই থানায় থাকা ওসিদের তালিকা করতে পুলিশ সদরদপ্তরকে নির্দেশ দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ।
মাঠ প্রশাসনে হঠাৎ এই রদবদলের প্রক্রিয়ায় বিপাকে পড়েছেন অনেক কর্মকর্তা। অনেকের সন্তানের বিদ্যালয়ে বার্ষিক পরীক্ষা চলছে। কেউ কেউ সংবাদ মাধ্যমকে জানিয়েছেন, অনেক কষ্ট করে কাঠখড় পুড়িয়ে সরকারি কর্মকর্তা স্ত্রীকে নিজ কর্মস্থলের কাছে বদলি করিয়ে এনেছেন। এখন বদলি করা হলে পরিবার নিয়ে বিপদে পড়বেন। এদিকে ইউএনও, ওসিদের বদলি প্রক্রিয়ায় সন্তুষ্ট হতে পারছেন না অনেক এমপি ও মন্ত্রী। আস্থাভাজন কর্মকর্তাদের বদলিতে তারা বিপাকে পড়বেন বলে দলের নীতিনির্ধারক নেতাদের জানিয়ে দিয়েছেন।
জানা গেছে, নির্বাচনে ডিসি ও ইউএনওদের বিশেষ ক্ষমতা থাকলেও ২০১৪ সাল থেকে পুলিশ সুপার (এসপি) এবং ওসিরা বেশি ক্ষমতা প্রয়োগ করেছেন বলে মনে করছে ইসি। এ অবস্থায় ইসির চাওয়া অনুসারে দেশের ৪৯৫ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের মধ্যে এক স্থানে যাদের এক বছরের বেশি হয়েছে, তাদের এবং থানার ওসিদের পর্যায়ক্রমে বদলির কার্যক্রম আজ রোববার শুরু করতে যাচ্ছে জনপ্রশাসন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তবে বিএনপি নির্বাচনে এলে এমন পরিবর্তন করা হতো না বলে মনে করছেন অনেক কর্মকর্তা।
গতকাল সুনামগঞ্জ ও ময়মনসিংহের ডিসিদের বদলি করা হয়েছে। সুনামগঞ্জের ডিসি দিদারে আলম মোহাম্মদ মাকসুদ চৌধুরীকে ময়মনসিংহের ডিসি করা হয়েছে। জাতীয় সংসদ সচিবালয়ে সংযুক্ত উপসচিব মোহাম্মদ রাশেদ ইকবাল চৌধুরীকে সুনামগঞ্জের ডিসি এবং ময়মনসিংহের ডিসি মো. মোস্তাফিজার রহমানকে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের উপসচিব পদে নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। আরও কয়েকজন জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারকে বদলি করা হবে বলে জানা গেছে।
এর আগে সরকারদলীয় যে এমপি ও মন্ত্রীরা পছন্দ করে ডিসি, পুলিশ সুপার, ইউএনও এবং ওসিদের নিজ নির্বাচনী এলাকায় বদলি করে নিয়ে গেছেন, তাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে। এরই মধ্যে সরকারদলীয় এমপি ও মন্ত্রীদের কেউ কেউ পছন্দের ইউএনও এবং ওসিদের রাখতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে তদবির শুরু করেছেন। অনেকেই জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ও সিনিয়র সচিবকে ফোন দেওয়া শুরু করেছেন বলে একাধিক কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন।
জানা গেছে, প্রথম পর্যায়ে উপজেলায় এক বছরের বেশি সময় থাকা ইউএনওদের বদলির প্রস্তাব নির্বাচন কমিশনে পাঠাতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি একই থানায় ছয় মাসের বেশি থাকা ওসিদের তালিকাও পাঠাতে বলা হয়েছে। ৫ ডিসেম্বরের মধ্যে পৃথক তালিকা ইসিতে পাঠাতে হবে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মোহাম্মদ মেজবাহ্ উদ্দিন চৌধুরী সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, প্রশাসনের কর্মকর্তারা নির্বাচন কমিশনের অধীনে রয়েছেন। তারা যে নির্দেশনা দেবেন, তা বাস্তবায়ন করতে হবে। নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব অশোক কুমার দেবনাথ বলেছেন, দেশের সব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার বদলির বিষয়ে মাঠ পর্যায়ের তথ্যের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বদলির কারণে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে না। তিনি বলেন, নির্বাচনে সব প্রার্থীর জন্য সমান সুযোগ তৈরির লক্ষ্যেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিবের কাছে পাঠানো ইসির চিঠিতে বলা হয়েছে, নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠানের জন্য সব ইউএনওকে পর্যায়ক্রমে বদলি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইসি।
এতদিন ধরে ইসি বলে আসছিল, পুলিশ ও প্রশাসনের মাঠ পর্যায়ে বড় রদবদল আনা হবে না। গত ২২ নভেম্বর নির্বাচন কমিশনার মো. আলমগীর সাংবাদিকদের বলেছিলেন, মাঠ প্রশাসনে রদবদল করতে গিয়ে বিশৃঙ্খলা হলে তার দায় কে নেবে? প্রশাসনে রদবদল করা হবে কিনা– সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে গত রোববার প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়াল পাল্টা প্রশ্ন রেখেছিলেন, প্রশাসনে রদবদল কে কখন করেছিল? তিনি বলেন, তারা নির্বাচনের স্বার্থে যেটা ভালো মনে করবেন, সেটা করবেন। তবে এখতিয়ারের বাইরে যাবেন না।
সিইসির এ বক্তব্যের চার দিনের মাথায় পুলিশের মাঠ পর্যায়ে বড় রদবদল আনার সিদ্ধান্ত নেয় ইসি। গত বৃহস্পতিবার সকালে পুলিশের মহাপরিদর্শক ও জননিরাপত্তা বিভাগের সচিবের সঙ্গে বৈঠক করে ইসি। ওই দিন বিকেলে জনপ্রশাসন সচিবের সঙ্গেও বৈঠক হয়। এর পর পুলিশ ও প্রশাসনের মাঠ পর্যায়ে রদবদলের চিঠি দেওয়া হয়।
বিপাকে ইউএনও-ওসিরা
জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে নির্বাচন কমিশনের দেওয়া নির্দেশনা অনুযায়ী বগুড়ায় বদলি উপযোগী পাঁচজন ইউএনও-ওসি আছেন; যাদের বেশির ভাগই একই স্থানে আছেন এক বছরের বেশি সময় ধরে। তবে হঠাৎ বদলির আদেশে বিপাকে পড়েছেন তারা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ইউএনও সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ভোটের আগে নতুন কর্মস্থলে গিয়ে বুঝে উঠতেই সময় লাগবে। একবারে গণবদলি না করে অভিযোগসাপেক্ষ ব্যবস্থা নেওয়া যেত। এ নিয়ে বিব্রত হতে হচ্ছে।
সিলেটের বেশ কয়েকজন ইউএনও এবং ওসি রয়েছেন দুশ্চিন্তায়। সিলেটের ১৩ উপজেলার ইউএনও ও ওসিদের মধ্যে অধিকাংশ উপজেলা ও থানায় এক থেকে আড়াই বছর ধরে দায়িত্ব পালন করে আসছেন কর্মকর্তারা।
কোতোয়ালি থানার ওসি আলী মোহাম্মদ মাহমুদ সংবাদ মাধ্যমকে জানিয়েছেন, বদলির বিষয়ে শনিবার পর্যন্ত থানায় আদেশ আসেনি। ২০২০ সালের ডিসেম্বর থেকে গোয়াইনঘাট উপজেলায় দায়িত্বরত নির্বাহী কর্মকর্তা তাহমিলুর রহমান বলেন, সরকারি নির্দেশনা এলে মানতেই হবে।
‘এই বদলির কোনো প্রয়োজন ছিল না’
সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার সংবাদ মাধ্যমকে বলেছেন, এই নির্বাচন একতরফাভাবে হচ্ছে। একটি ভালো নির্বাচনের জন্য যে রকম পরিবেশ দরকার, সেটা আগেই নষ্ট হয়ে গেছে। কাজেই এখানে যে বদলি করা হচ্ছে, তা নেহাত অপ্রয়োজনীয়। এটা করে কোনো ফল আনবে না; বরং সরকারের ব্যয়ের ব্যাপার আছে। বদলি-ভাতা বাবদ সরকারের বিপুল অর্থ ব্যয় হবে। এই বদলির কারণে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা ও তাদের পরিবারের সদস্যদের ভোগান্তি বাড়বে। নির্বাচন কী রকম হতে যাচ্ছে, সেটা সবাই দেখছে। নির্বাচনী প্রক্রিয়াটাও সবাই দেখছে। নির্বাচনে কে জিতবে, কারা সরকার গঠন করবে, সেটাও সবার জানা। গত দুটি নির্বাচন যে রকম হয়েছে, এবারও সে রকমই একটা নির্বাচন হতে যাচ্ছে। কাজেই এই বদলির কোনো প্রয়োজন ছিল না।
সূত্র: সমকাল