যুদ্ধবিরতির পথ খুঁজতে তুরস্কের কূটনৈতিক তৎপরতা: ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতার প্রচেষ্টা

যুদ্ধবিরতির পথ খুঁজতে তুরস্কের কূটনৈতিক তৎপরতা: ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতার প্রচেষ্টা

গাজীপুর কণ্ঠ, আন্তর্জাতিক ডেস্ক : মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত অবসানে তুরস্ক সক্রিয় কূটনৈতিক ভূমিকায় নেমেছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র উভয় পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে একটি সম্ভাব্য শান্তি কাঠামো গড়ে তোলার চেষ্টা করছে আঙ্কারা।

বিষয়টির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আইকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

রোববার তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান একদিনেই একাধিক দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। তুরস্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানায়, ইরান, মিসর ও ইউরোপীয় দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে সংঘাত অবসানের পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা হয়।

একই দিনে ফিদান যুক্তরাষ্ট্রের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গেও কথা বলেন। ধারণা করা হচ্ছে, এর মধ্যে মার্কিন দূত স্টিভেন উইটকফ ও জেরেড কুশনারও ছিলেন। পরে সৌদি আরব, কাতার, ইরাক ও পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গেও যুদ্ধ থামানোর উদ্যোগগুলো মূল্যায়ন করেন তিনি।

আঙ্কারার নীতিনির্ধারণী চিন্তার সঙ্গে পরিচিত সূত্রগুলো বলছে, তুরস্ক একটি সংক্ষিপ্ত যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে আলোচনার পরিবেশ তৈরি করতে চাইছে।

ফিদান সাংবাদিকদের জানান, আলোচনা ব্যর্থ হলে যেকোনো পক্ষ পুনরায় যুদ্ধে ফেরার সুযোগ রেখেই একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা বিবেচনা করছে আঙ্কারা।

একটি তুর্কি সূত্র জানায়, ইসরায়েলের প্রভাব প্রতিরোধে ইউরোপীয়, উপসাগরীয় ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোকে একত্রিত করে একটি সম্মিলিত অবস্থান গড়ে তোলার চেষ্টা করছে তুরস্ক।

তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফিদান সরাসরি ইসরায়েলকে শান্তিপ্রক্রিয়ার সম্ভাব্য বাধা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

তিনি বলেন, ইসরায়েল তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও শিল্প লক্ষ্যমাত্রাগুলো ধ্বংস না করা পর্যন্ত থামবে না বলে ধারণা দিচ্ছে। তাঁর মতে, মূল সমস্যা হলো ইসরায়েল শান্তি চায় না।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, ইসরায়েল “লন মোয়িং” কৌশলে বিশ্বাস করে — অর্থাৎ ইরানের সামরিক সক্ষমতা সীমিত রাখতে পর্যায়ক্রমে হামলা চালিয়ে যাওয়া। এই কৌশলের কারণে দীর্ঘমেয়াদি কোনো চুক্তিতে ইসরায়েলের সম্মতি পাওয়া কঠিন হবে বলে আঙ্কারার কূটনীতিক মহল মনে করছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এর আগে ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো লক্ষ্যবস্তু করার হুমকি দিয়েছিলেন। তবে সোমবার তিনি জানান, মধ্যপ্রাচ্যে শত্রুতা অবসানে যুক্তরাষ্ট্র “ফলপ্রসূ আলোচনায়” রয়েছে এবং ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোয় সামরিক হামলা পাঁচ দিনের জন্য স্থগিত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন।

তবে ট্রাম্পের শূন্য পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণের দাবি আলোচনার পথে একটি বড় বাধা হিসেবেই রয়ে গেছে।

আঙ্কারাভিত্তিক ইরান গবেষণা কেন্দ্রের (আইআরএএম) চেয়ারম্যান সেরহান আফাকান বলছেন, যেকোনো বিশ্বাসযোগ্য আলোচনার পথকেই ইরান স্বাগত জানাবে। কারণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে তেহরান এই যুদ্ধে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

তুর্কি সূত্রের তথ্যমতে, ইরানের প্রধান দুটি দাবি হলো — ভবিষ্যৎ হামলার বিরুদ্ধে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা এবং ক্ষয়ক্ষতির ক্ষতিপূরণ। আফাকান বলছেন, আর্থিক বিষয়ের চেয়ে ভবিষ্যতে হামলা না করার মার্কিন প্রতিশ্রুতিটাই ইরানের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

ট্রাম্প প্রশাসন ইতিমধ্যে ১৪০ কোটি ব্যারেল ইরানি তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে, যার মাধ্যমে আনুমানিক ১ হাজার ৪০০ কোটি ডলারের বাণিজ্য সম্ভব হবে।

হর্মুজ প্রণালি অবরোধ এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি অবকাঠামো ও বিশুদ্ধকরণ কেন্দ্রে ইরানের হুমকি আঞ্চলিক দেশগুলোকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবসহ কিছু উপসাগরীয় রাষ্ট্র চাইছে, ভবিষ্যতে ইরান যেন আর প্রণালি অবরোধের সুযোগ না পায়।

ফিদান অবশ্য আশাবাদী সুরে বলেছেন, যুদ্ধ শেষ হলে উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানের কাছে তাদের প্রত্যাশা স্পষ্ট করতে পারবে এবং কিছু শর্ত পূরণ হলে অর্থনৈতিক সহযোগিতার দিকে মনোযোগ দেওয়া সম্ভব হবে।

ওমানকে আর আলোচনার উপযুক্ত ক্ষেত্র মনে না করায় ট্রাম্প ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রম সংক্রান্ত আলোচনায় রাশিয়াকে নিশ্চয়তাদাতা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছেন। ইরান ও ইসরায়েল — উভয়ের সঙ্গেই রাশিয়ার সম্পর্ক রয়েছে, পাশাপাশি সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের সঙ্গেও মস্কোর যোগাযোগ আছে। এই বহুমুখী সম্পর্ক রাশিয়াকে একটি গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।

আঙ্কারার কূটনীতিক মহল স্থায়ী চুক্তির ব্যাপারে সংশয়ী। ইসরায়েল ভবিষ্যতে ইরানে আর হামলা চালাবে না — এমন দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতি দেবে কি না, সে বিষয়ে গভীর সন্দেহ রয়েছে তুর্কি কূটনীতিকদের মধ্যে।

একটি সূত্র জানিয়েছে, ট্রাম্প যেকোনো সময় বিজয় ঘোষণা করতে পারেন। কিন্তু ইসরায়েল হামলা অব্যাহত রাখতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বলেই মনে হচ্ছে।