হাসমত আলী, গাজীপুর
দশ বছরের গবেষণায় গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় উদ্ভাবন করেছে একটি নতুন আউশ ধানের জাত, যা স্বল্প সময়ে উচ্চ ফলন দেওয়ার পাশাপাশি চিকন চালের ক্রমবর্ধমান বাজার চাহিদাও পূরণ করতে সক্ষম বলে গবেষকেরা জানাচ্ছেন। ‘জিএইউ ধান ৪’ নামের এই জাতটি গত পাঁচ ফেব্রুয়ারি জাতীয় বীজ বোর্ডের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন পেয়েছে।
বাংলাদেশে আউশ মৌসুমে ধানের ফলন সাধারণত আমন বা বোরোর তুলনায় কম হয়। জিএইউ ধান ৪ সেই চিত্র বদলে দেওয়ার সম্ভাবনা রাখে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ বিভাগের সেকশন অফিসার মো. রনি ইসলাম জানান, এই জাতটি বীজ বপনের মাত্র তিন মাস থেকে তিন মাস দশ দিনের মধ্যে পরিপক্ব হয়। ফলে কৃষকেরা একই জমিতে বছরে তিন থেকে চারটি ফসল উৎপাদনের সুযোগ পান।
অনুকূল পরিবেশে হেক্টর প্রতি পাঁচ থেকে সাড়ে পাঁচ টন ফলন পাওয়া সম্ভব, যা প্রচলিত আউশ জাতের তুলনায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বেশি। এ ছাড়া জাতটি বিভিন্ন রোগবালাই প্রতিরোধে সক্ষম এবং তুলনামূলক কম পানিতে চাষযোগ্য।
জাতটি উদ্ভাবনে নেতৃত্ব দিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষিতত্ত্ব বিভাগের দুজন গবেষক — অধ্যাপক ড. এম. ময়নুল হক এবং অধ্যাপক ড. মো. মসিউল ইসলাম।
গবেষকেরা প্রচলিত আউশ জাত ‘পারিজা’-এর সঙ্গে উচ্চ ফলনশীল চিকন জাত ‘বিইউ ধান ২’-এর সংকরায়ন ঘটান। সেই সংকরায়ন থেকে পাওয়া জিএইউ-৯৯৭৪-৫২-৭-২ লাইনটি কাঙ্ক্ষিত বৈশিষ্ট্য দেখালে তা নিয়ে পরবর্তী গবেষণা শুরু হয়। এরপর ২০২২ সালে আঞ্চলিক অভিযোজন পরীক্ষা, ২০২৩ সালে আঞ্চলিক উপযোগিতা যাচাই এবং ২০২৪ সালে বাংলাদেশ বীজ প্রত্যয়ন সংস্থার তত্ত্বাবধানে দেশের ১০টি অঞ্চলে মাঠ পর্যায়ে মূল্যায়ন সম্পন্ন হয়। সব পরীক্ষায় সন্তোষজনক ফলাফল পাওয়ার পর জাতীয় বীজ বোর্ডের ১১৫তম সভায় এটি অনুমোদন পায়।
শুধু উৎপাদনশীলতায় নয়, পুষ্টিমানেও এই জাতটি উল্লেখযোগ্য বলে দাবি গবেষকদের।

জাতটির চালে অ্যামাইলেজ এনজাইমের পরিমাণ প্রায় ২৪ দশমিক ৫৮ শতাংশ, যা শর্করাজাতীয় খাবার হজমে সহায়তা করে। পাশাপাশি প্রোটিনের পরিমাণ প্রায় ৮ দশমিক ৩৮ শতাংশ, যা মানবদেহের গঠন ও কোষ মেরামতে কার্যকর ভূমিকা রাখে।
রনি ইসলাম বলেন, জাতটি দ্রুত পরিপক্ব হওয়ায় দেশের উত্তরাঞ্চলের মঙ্গাপীড়িত এলাকায় কৃষকদের জন্য এটি বিশেষভাবে উপকারী হতে পারে। দ্রুত ফসল ঘরে তুলে কৃষকেরা পরবর্তী ফসলের চাষ শুরু করতে পারবেন, যা বছরজুড়ে আয়ের সুযোগ তৈরি করবে।
জলবায়ু সহনশীল হওয়ায় দেশের প্রায় সব অঞ্চলে আউশ মৌসুমে এই জাত চাষযোগ্য বলেও জানান তিনি। বেলে দো-আঁশ ও এটেল দো-আঁশ মাটি এই জাত চাষের জন্য বিশেষ উপযুক্ত।
বীজতলায় বীজ ফেলার উপযুক্ত সময় এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহ। কাদা জমিতে ২০ থেকে ২২ দিনের মধ্যে চারা রোপণ করতে হয়। সারি থেকে সারির দূরত্ব ২০ সেন্টিমিটার এবং গুছি থেকে গুছির দূরত্ব ১৫ সেন্টিমিটার রাখা উচিত। প্রতি হেক্টরে ২৫ থেকে ৩০ কেজি বীজ প্রয়োজন হয়।
জাতটির অন্যতম উদ্ভাবক অধ্যাপক ড. মো. মসিউল ইসলাম বলেন, “জিএইউ ধান ৪ উদ্ভাবনের মূল লক্ষ্য ছিল কৃষকদের জন্য এমন একটি আউশ ধানের জাত তৈরি করা, যা স্বল্প সময়ে বেশি ফলন দেবে এবং একই সঙ্গে হবে চিকন ও বাজারযোগ্য।”
তিনি আরও বলেন, এই জাত কৃষকের আয় বাড়ানোর পাশাপাশি দেশের খাদ্যনিরাপত্তা জোরদার করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে তাঁরা আশাবাদী।
এই জাত উদ্ভাবনের মধ্য দিয়ে গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভাবিত মোট ফসলের জাতের সংখ্যা দাঁড়াল ৯৫টিতে।