মার্কিন-ইরান কূটনীতিতে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে হঠাৎ পাকিস্তান আলোচনার কেন্দ্রে?

পরিস্থিতি অনুকূল হলে ইসলামাবাদে সংলাপ আয়োজনের প্রস্তুতিও জানিয়েছে দেশটি।

মার্কিন-ইরান কূটনীতিতে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে হঠাৎ পাকিস্তান আলোচনার কেন্দ্রে?

গাজীপুর কণ্ঠ, আন্তর্জাতিক ডেস্ক

মার্কিন-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধ চতুর্থ সপ্তাহে পড়েছে। রণক্ষেত্র এখন আর একমাত্র নির্ধারক নয়। পর্দার আড়ালে কূটনৈতিক তৎপরতা দ্রুততর হচ্ছে। আর এই প্রেক্ষাপটেই আন্তর্জাতিক আলোচনায় বারবার উঠে আসছে পাকিস্তানের নাম।

বিষয়টি কেবল তাত্ত্বিক পর্যায়ে নেই। গত সপ্তাহে একাধিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসলামাবাদ সক্রিয়ভাবে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। পাকিস্তানের সামরিক ও বেসামরিক নেতৃত্ব মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ ওয়াশিংটনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করেছে বলে জানা গেছে। কিছু প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে, পরিস্থিতি অনুকূল হলে ইসলামাবাদে সংলাপ আয়োজনের প্রস্তুতিও জানিয়েছে দেশটি।

ওয়াশিংটনভিত্তিক বিশিষ্ট বিশ্লেষক ভালি নাসর মনে করেন, পাকিস্তানের যেকোনো কূটনৈতিক উদ্যোগ সৌদি আরবকে বাদ দিয়ে সম্ভব নয়। তিনি এক্সে লিখেছেন, “সৌদি সমর্থন ও উৎসাহ ছাড়া পাকিস্তান এগিয়ে আসবে না। রিয়াদ নিশ্চিতভাবেই এই সমীকরণে রয়েছে।” পাকিস্তানের সঙ্গে সৌদি আরবের গভীর সামরিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের কথা মাথায় রাখলে, যেকোনো মধ্যস্থতা প্রচেষ্টায় রিয়াদের নীরব সম্মতি থাকবে বলেই ধরে নেওয়া যায়।

বর্তমান ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র— উভয়ের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক বজায় রাখা বিরল। পাকিস্তান সেই বিরল অবস্থানে রয়েছে। বিশ্লেষক মাইকেল কুগেলম্যান এ বিষয়ে স্পষ্ট বলেছেন, “পাকিস্তানকে অসম্ভাব্য মধ্যস্থতাকারী বলার কোনো কারণ নেই। গত এক বছরে ইরানের সঙ্গে পাকিস্তানের উচ্চপর্যায়ের অনেক বৈঠক হয়েছে। মার্কিন প্রশাসন পাকিস্তানের প্রতি ইতিবাচক। ট্রাম্প নিজেই বলেছেন, ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির ইরানকে বেশিরভাগের চেয়ে ভালো চেনেন। উপরন্তু, যুক্তরাষ্ট্রে ইরানের কূটনৈতিক স্বার্থ প্রতিনিধিত্ব করে পাকিস্তানই।”

সংঘাত তীব্র হওয়ার পর থেকে পাকিস্তান, তুরস্ক ও মিশর ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদানে সহায়তা করছে বলে জানা গেছে। তুরস্ক ও পাকিস্তান— উভয়ই ইরানের সীমান্তবর্তী দেশ। যেকোনো সংঘাতের বিস্তার তাদের জন্য কেবল কৌশলগত উদ্বেগ নয়, সরাসরি নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও শরণার্থী সংকটের কারণ হয়ে উঠতে পারে। ওয়াশিংটনে কর্মরত মুসলিম কূটনীতিকরা এই বাস্তবতাকেই তাদের সক্রিয়তার মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

মিশরের ভূমিকা ভিন্ন ধরনের কিন্তু সমান তাৎপর্যপূর্ণ। আরব বিশ্বের বৃহত্তম দেশ হিসেবে কায়রো ইসরায়েল ও আরব রাষ্ট্র উভয়ের সঙ্গে সরাসরি সংলাপের সুযোগ রাখে, যা অন্যদের পক্ষে সম্ভব নয়।

কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা মূলত তিনটি কারণ চিহ্নিত করছেন। প্রথমত, যুদ্ধ এখন একটি দীর্ঘস্থায়ী ও বিপজ্জনক পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। প্রাথমিক হামলার পর উভয় পক্ষের পাল্টাপাল্টি আক্রমণ আঞ্চলিক ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়িয়েছে। দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরাসরি কূটনৈতিক যোগাযোগ রাজনৈতিক ও কৌশলগত কারণেই সীমিত। ওয়াশিংটন ও তেহরান উভয়ের জন্যই প্রকাশ্য আলোচনা রাজনৈতিক ব্যয়বহুল। এ অবস্থায় তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতাকারী অপরিহার্য হয়ে পড়ে। তৃতীয়ত, পাকিস্তানের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক তৎপরতা দৃশ্যমান হয়েছে। ওয়াশিংটন, তেহরান ও উপসাগরীয় অংশীদারদের সঙ্গে একের পর এক উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ এই ধারণাকে পাকা করেছে যে ইসলামাবাদ কেবল দর্শকের ভূমিকায় নেই— ঘটনার গতিপথ প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে।

সংকট যতই গভীর হচ্ছে, সামরিক উত্তেজনার মূল্য বাড়ছে এবং সরাসরি কূটনৈতিক পথ সংকুচিত হচ্ছে। ঠিক এই মুহূর্তে, উভয় পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের সুবিধা রাখা দেশগুলো প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। ইসলামাবাদ এই সুযোগ চিনতে পেরেছে বলেই মনে হচ্ছে।