রয়টার্স
যুদ্ধবিরতির মধ্যেও হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা কমছে না। একদিকে ইরান প্রণালিতে তার নিয়ন্ত্রণ প্রদর্শন করছে, অন্যদিকে ইসরায়েল নতুন হামলার হুমকি দিচ্ছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন বুধবার রাতে একটি ভিডিও প্রচার করে, যেখানে দেখা যায় মুখোশ পরা কমান্ডোরা ধূসর রঙের স্পিডবোটে চড়ে বিশাল মালবাহী জাহাজ ‘এমএসসি ফ্রান্সেসকা’র পাশে এসে দড়ির মই বেয়ে উঠে পড়ছেন এবং রাইফেল হাতে ভেতরে প্রবেশ করছেন। একই সঙ্গে ‘এপামিনোন্দাস’ নামের আরও একটি জাহাজের দৃশ্যও ভিডিওতে রয়েছে। ইরান দাবি করেছে, অনুমতি ছাড়া প্রণালি পার হওয়ার চেষ্টা করায় বুধবার দুটি জাহাজই জব্দ করা হয়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ অভিযান শুরুর পর ৮ এপ্রিল যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। তবে যুদ্ধবিরতির আনুষ্ঠানিক কোনো মেয়াদ বাড়ানো হয়নি এবং নতুন আলোচনারও কোনো সময়সূচি নেই।

ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ বৃহস্পতিবার হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যুদ্ধ পুনরায় শুরু করতে তাঁরা যুক্তরাষ্ট্রের ‘সবুজ সংকেত’-এর অপেক্ষায় আছেন। হামলা শুরু হলে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতাবা খামেনিকে লক্ষ্য করা হবে বলেও তিনি জানান। তাঁর দপ্তর থেকে প্রকাশিত বিবৃতিতে বলা হয়, ‘এবারের হামলা হবে ভিন্ন ও মারাত্মক — সবচেয়ে স্পর্শকাতর স্থানগুলোয় বিধ্বংসী আঘাত হানা হবে।’
বিশ্বের মোট তেল ও তরল প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহনের পাঁচ ভাগের এক ভাগ যায় হরমুজ প্রণালি দিয়ে। যুদ্ধবিরতির পর যুক্তরাষ্ট্র ইরানের জাহাজ চলাচলে অবরোধ আরোপ করে, যাকে তেহরান যুদ্ধবিরতির লঙ্ঘন বলে অভিহিত করছে। ইরান জানিয়েছে, অবরোধ না উঠলে প্রণালি খুলে দেওয়ার প্রশ্নই আসে না।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট দিয়ে দাবি করেছেন, প্রণালিতে ‘পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’ যুক্তরাষ্ট্রের হাতে এবং ইরান ‘চুক্তি’ না করা পর্যন্ত তা ‘শক্তভাবে বন্ধ’ থাকবে। তবে ইরানের স্পিডবোট ও সামুদ্রিক ড্রোনগুলো দ্বীপের সমুদ্রগুহায় লুকিয়ে থেকে মার্কিন নৌবাহিনীকে কাছে ঘেঁষতে দিচ্ছে না।
বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, ভারত মহাসাগরে ‘ম্যাজেস্টিক’ নামের আরও একটি ট্যাংকারে তারা উঠে পড়েছে। অবরোধ শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত ৩৩টি জাহাজকে তারা গতিপথ পরিবর্তন করিয়েছে বলে মার্কিন সেনাবাহিনী জানিয়েছে।

ইরানের বিচারবিভাগীয় প্রধান গোলামহোসেইন মোহসেনি-এজেই বলেন, জব্দ করা জাহাজগুলো ‘আইনের মুখোমুখি হয়েছে’। অন্যদিকে সংসদের উপমুখপাত্র হামিদ রেজা হাজিবাবাই জানান, প্রণালি ব্যবহারের জন্য ইরান যে টোল আদায় শুরু করেছে, তার প্রথম রাজস্ব কেন্দ্রীয় ব্যাংকে স্থানান্তর করা হয়েছে। তবে কে দিয়েছে বা কত দিয়েছে — কিছুই জানানো হয়নি।
ছয় সপ্তাহের বোমাবর্ষণের পর যুদ্ধবিরতি পেলেও ইরানের সাধারণ মানুষ আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। তেহরানের সরকারি কর্মচারী আরাশ (৩৫) রয়টার্সকে ফোনে বলেন, ‘যে পরিস্থিতি চলছে তাতে ভয় লাগছে। প্রতিটি মুহূর্তে মনে হচ্ছে, এখনই বুঝি ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্র হামলা করে বসবে।’
আলোচনার মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তান জানিয়েছে, দ্বিতীয় দফা আলোচনার প্রস্তুতি নেওয়া হলেও মঙ্গলবার তা বাতিল হয়ে যায়। ইরানি কর্মকর্তারা মার্কিন অবরোধের কারণে এখনও আলোচনায় অংশ নিতে রাজি হচ্ছেন না।
জ্বালানি সংকটের কারণে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চাপ ক্রমেই বাড়ছে। কলকারখানায় উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় এবং সেবা খাতেও কার্যক্রম কমে আসায় উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। বৃহস্পতিবার ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি দেড় শতাংশ বেড়ে ১০৩ দশমিক ৫ ডলারে উঠেছে।
যুদ্ধের শুরুতে ইরানের আক্রমণক্ষমতা ধ্বংস করা, পারমাণবিক কর্মসূচির অবসান এবং সরকার পরিবর্তন সহজ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল ওয়াশিংটন। কিন্তু এর কোনোটিই এখনও পূরণ হয়নি। ইরানের হাতে এখনও ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত রয়েছে।
সূত্র: রয়টার্স