হাসমত আলী
জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবিলায় টেকসই কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আধুনিক ‘জিনোম এডিটিং’ প্রযুক্তি সময়োপযোগী ও কার্যকর সমাধান হতে পারে। বিশেষ করে লবণাক্ততা, খরা, অতিবৃষ্টি ও রোগবালাই সহনশীল ধানের জাত উদ্ভাবনে এ প্রযুক্তি বাংলাদেশের কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
গাজীপুরের ব্র্যাক এগ্রিকালচারাল রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট সেন্টারে শনিবার (৯ মে) দিনব্যাপী এক পরামর্শমূলক কর্মশালায় বক্তারা এসব কথা বলেন। বাংলাদেশে খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জলবায়ু সহিষ্ণু ধানের নতুন জাত উদ্ভাবনে জিনোম এডিটিং প্রযুক্তির সম্ভাবনা ছিল কর্মশালার মূল আলোচ্য বিষয়।
জিনোম এডিটিং হলো জীবের ডিএনএ বা জিনের নির্দিষ্ট অংশ পরিবর্তন করার আধুনিক জৈব প্রযুক্তি। এর মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা কোনো জিন কেটে ফেলা, বদলে দেওয়া বা নতুন জিন যোগ করতে পারেন। অর্থাৎ এটি হলো জীবের ‘জেনেটিক কোড’ সম্পাদন করার পদ্ধতি।

কর্মশালায় বক্তারা জানান, দেশে জিনোম এডিটিংয়ের মাধ্যমে উচ্চ ফলনশীল, লবণাক্ততা ও উচ্চতাপ সহিষ্ণু, ঢলে পড়ারোধী, সার-সাশ্রয়ী এবং ব্লাস্ট ও ব্যাকটেরিয়াল ব্লাইট রোগ প্রতিরোধী ক্লাইমেট-স্মার্ট ধানের জাত উদ্ভাবনের কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে। আগামী তিন বছরের মধ্যে জিনোম-এডিটেড জলবায়ু সহনশীল ধানের নতুন জাত উদ্ভাবন ও বাণিজ্যিকীকরণের লক্ষ্যে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা ও কৌশলগত সুপারিশও তুলে ধরা হয় কর্মশালায়। পাশাপাশি স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক শিল্প অংশীদারদের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগ সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমির অধীনে বিএএস-ইউএসডিএ-পিএএল অর্থায়িত একটি বিশেষ গবেষণা প্রকল্পের সমন্বয়ক এবং গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (গাকৃবি) গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজ অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. তোফাজ্জল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত কর্মশালায় প্রধান অতিথি ছিলেন গাকৃবির উপাচার্য অধ্যাপক ড. জিকেএম মোস্তাফিজুর রহমান। বক্তব্য রাখেন জীবপ্রযুক্তিবিদ অধ্যাপক হাসিনা খান।
কর্মশালায় ব্র্যাক সিডের ড. আকিদুল আজিজ ও ড. আরিফ, লাল তীর সিড লিমিটেডের ড. আফরোজা, ট্রপিক বায়োসায়েন্সের (যুক্তরাজ্য) ড. জিয়াউর রহমান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. তাহমিদা, বাংলাদেশ ধান গবেষণা প্রতিষ্ঠানের ড. শাহানা, সিমিটের ওয়াশিক ফয়সাল এবং ন্যাশনাল বায়োটেকনোলজি ইনস্টিটিউটের ড. মুসলিমাসহ দেশি-বিদেশি প্রায় ৪০ জন বিশেষজ্ঞ, গবেষক, শিল্প প্রতিনিধি, পিএইচডি শিক্ষার্থী ও প্রকল্প সদস্য অংশ নেন।

কর্মশালার প্রথম কারিগরি অধিবেশনে প্রকল্পের সাতজন প্রধান গবেষক তাঁদের চলমান গবেষণার অগ্রগতি উপস্থাপন করেন। এতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ এবং সুপ্রিম সিড কোম্পানি লিমিটেডের গবেষকেরা অংশ নেন। দ্বিতীয় কারিগরি অধিবেশনে অধ্যাপক মাহমুদুল হাসান ও অধ্যাপক তোফাজ্জল ইসলাম গাইড-আরএনএ ডিজাইন, ধানের জাত উন্নয়নে জিনোম এডিটিং প্রযুক্তির ব্যবহার এবং জাত উন্মুক্তকরণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জীবনিরাপত্তাবিষয়ক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।
পরে গবেষক ও বিশেষজ্ঞরা প্রকল্পের লক্ষ্যমাত্রাভুক্ত ধানের কাঙ্ক্ষিত বৈশিষ্ট্য অর্জনে বিদ্যমান প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ এবং সম্ভাব্য সমাধান নিয়ে উন্মুক্ত আলোচনা করেন।
আয়োজকেরা আশাবাদ ব্যক্ত করেন, শিক্ষা ও শিল্প খাতের সমন্বিত এই উদ্যোগ ভবিষ্যতে কৃষকদের জন্য অধিক সহনশীল ও উচ্চ ফলনশীল ধানের জাত উদ্ভাবনের পথ সুগম করবে এবং দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।