গাজীপুর কণ্ঠ, আন্তর্জাতিক ডেস্ক
হোয়াইট হাউসে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারির পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দেশটির তিন শীর্ষ সংবাদমাধ্যম সিএনএন, পলিটিকো ও এমএস নাও। তাদের সাংবাদিকদের প্রবেশে বাধা দেওয়ার সিদ্ধান্তকে মার্কিন সংবিধানের প্রথম সংশোধনীতে দেওয়া সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার অধিকারের ‘লঙ্ঘন’ বলে দাবি করেছে প্রতিষ্ঠানগুলো।
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) ওয়াশিংটনের একটি ফেডারেল আদালতে মামলাটি করা হয়। নিষেধাজ্ঞাকে ‘অসাংবিধানিক’ ঘোষণা করে দ্রুত তা স্থগিত এবং ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তাদের এটি কার্যকর করা থেকে বিরত রাখার নির্দেশ চেয়েছে গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলো। এ বিষয়ে বুধবার শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে।
সোমবার দেওয়া এক যৌথ বিবৃতিতে তিন গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান জানায়, ‘গণমাধ্যম কী বিষয়ে সংবাদ প্রকাশ করবে, তা সরকার নির্ধারণ করতে পারে না—এই নীতি রক্ষার জন্য আমরা আইনি পদক্ষেপ নিচ্ছি।’
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘কোনো ধরনের নোটিশ বা আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই আমাদের সাংবাদিকদের পরিচয়পত্র বাতিল করা হয়েছে, কারণ হোয়াইট হাউজ আমাদের প্রকাশিত প্রতিবেদনে আপত্তি জানিয়েছে। এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং সরকারি হস্তক্ষেপমুক্ত স্বাধীন সাংবাদিকতার অধিকার হুমকির মুখে পড়বে।’
মার্কিন সংবিধানের প্রথম সংশোধনী সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতায় সরকারের হস্তক্ষেপ নিষিদ্ধ করেছে। আদালতের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনের বিষয়বস্তুর ভিত্তিতে সরকার কোনো গণমাধ্যমের সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ করতে পারে না।
গত শুক্রবার ট্রাম্প সিএনএন, পলিটিকো ও এমএস নাওকে হোয়াইট হাউজে নিষিদ্ধ করার ঘোষণা দেন। এসব প্রতিষ্ঠান তার প্রশাসন নিয়ে ‘ভুয়া খবর’ প্রকাশ করছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। শনিবার তিন প্রতিষ্ঠানের সাংবাদিকদের হোয়াইট হাউজে প্রবেশে বাধা দেওয়া হয় এবং তাদের প্রেস পরিচয়পত্রও নিয়ে নেওয়া হয়।
এদিকে, মামলার খবর প্রকাশের পর ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিন গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানকে ‘তৃতীয় সারির ভাঁড়’ এবং ‘বিকৃত ও দুর্নীতিগ্রস্ত সংবাদমাধ্যম’ বলে আখ্যা দেন। তার অভিযোগ, এসব গণমাধ্যম তার অর্জনকে ‘তুচ্ছ ও হেয়’ করে দেখায়।
ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প লেখেন, ‘যেসব সংবাদমাধ্যম শুধু নেতিবাচক খবর প্রকাশ করে এবং অজ্ঞাতনামা “সূত্রের” বরাত দিয়ে মিথ্যা ও মানহানিকর প্রতিবেদন প্রকাশ করে, তাদের বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই দপ্তরে প্রবেশের সুযোগ দেওয়া উচিত নয়।’
মামলার বিষয়ে হোয়াইট হাউজের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সেখানে সংবাদমাধ্যমের প্রবেশাধিকার কোনো অধিকার নয়, বরং বিশেষ সুযোগ।
হোয়াইট হাউজের নিয়মিত সংবাদ কাভারেজেও এর প্রভাব পড়েছে। প্রেসিডেন্টের অনুষ্ঠান ও সফর কাভার করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের পাঁচটি বড় টেলিভিশন নেটওয়ার্ক এবিসি, সিবিএস, সিএনএন, ফক্স নিউজ ও এনবিসি মিলে ‘টিভি পুল’ পরিচালনা করে। সোমবার এই পাঁচ নেটওয়ার্ক পুলের কার্যক্রম স্থগিত করে।
সিএনএনের নিউইয়র্ক সফর কাভার করার কথা ছিল। কিন্তু হোয়াইট হাউজের নিষেধাজ্ঞার কারণে তারা সেই দায়িত্ব পালন করতে পারেনি। এর পর অন্য নেটওয়ার্কগুলোও পুলের কার্যক্রম থেকে সরে দাঁড়ায়।
পাঁচ নেটওয়ার্কের যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, ‘সরকারের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে সঠিক ও স্বাধীন তথ্য পাওয়ার অধিকার জনগণের রয়েছে। কোনো প্রশাসনই কোনো সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন পছন্দ না হওয়ার কারণে তাদের সংবাদ সংগ্রহের সুযোগ সীমিত করা উচিত নয়।’
সোমবার সকালে হোয়াইট হাউজের বাইরে থেকে সরাসরি সম্প্রচার করে সিএনএন। ভবনের ভেতরে তাদের জন্য নির্ধারিত বুথটি বন্ধ ছিল। সেখানে থাকা পর্দা ও মনিটরও বন্ধ রাখা হয়।
এদিকে কয়েকটি মার্কিন সংবাদমাধ্যম হোয়াইট হাউজের যৌথ কাভারেজে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত জানিয়েছে। নিউইয়র্ক টাইমস ও ওয়াশিংটন পোস্ট জানিয়েছে, সোমবার ট্রাম্পের বিভিন্ন অনুষ্ঠান থেকে তোলা স্থিরচিত্রও তারা অন্য সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে ভাগাভাগি করবে না।
গত সপ্তাহে সিএনএন, পলিটিকো ও এমএস নাওকে হোয়াইট হাউজে নিষিদ্ধ করার সময় ট্রাম্প কোনো নির্দিষ্ট প্রতিবেদন বা সংবাদকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করেননি। পরে তিনি বলেন, গত কয়েক বছরে এসব সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ‘সমষ্টিগত প্রতিবেদন’ই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কারণ।
ট্রাম্প আরও ইঙ্গিত দেন, ভবিষ্যতে আরও সংবাদমাধ্যমকে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা হতে পারে। পরে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি নিউইয়র্ক টাইমস ও ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনকে ‘ভুয়া খবর’ বলেও মন্তব্য করেন।
এর আগে ফেব্রুয়ারিতে হোয়াইট হাউজের প্রেস পুলের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেয় ট্রাম্প প্রশাসন। এর আগে এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে এই পুল পরিচালনা করে আসছিল হোয়াইট হাউজ করেসপন্ডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন।
একই মাসে ‘গালফ অভ মেক্সিকো’-এর বদলে ট্রাম্পের দেওয়া ‘গালফ অভ আমেরিকা’ নামটি ব্যবহার না করায় অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) সাংবাদিক ও আলোকচিত্রীদের ওভাল অফিস ও এয়ার ফোর্স ওয়ানের মতো সীমিত প্রবেশাধিকারের জায়গা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে মামলা করে এপি। মামলাটি এখনো চলমান।
তবে নির্দিষ্ট সংবাদমাধ্যমের প্রবেশাধিকার সীমিত করার ঘটনা শুধু ট্রাম্প প্রশাসনের সময়েই ঘটেনি। ২০০৯ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার প্রশাসন একটি প্রশাসনিক কর্মকর্তার সাক্ষাৎকারে ফক্স নিউজকে প্রেস পুলে রাখতে চায়নি। অন্য চারটি টেলিভিশন নেটওয়ার্ক এর প্রতিবাদ করলে পরে ফক্স নিউজকে সেখানে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়। তবে সে সময় পুরো প্রেস পুল থেকে ফক্স নিউজকে বাদ দেওয়া হয়নি; শুধু ওই নির্দিষ্ট সাক্ষাৎকারে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়নি।
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে ট্রাম্পের বিরোধ অবশ্য দীর্ঘদিনের। তার প্রশাসন নিউইয়র্ক টাইমস, ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল ও বিবিসিসহ একাধিক সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিয়েছে। এসব মামলার কয়েকটিতে সমঝোতা করতে সংবাদমাধ্যমগুলোকে কয়েক মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত অর্থ দিতে হয়েছে। বিবিসির বিরুদ্ধে করা ট্রাম্পের মামলাটি এখনো চলমান।