সড়ক নিরাপত্তা আইন, শুরুতেই জটিলতা
গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : সড়ক নিরাপত্তার নতুন আইন কার্যকরে জটিলতা দেখা দিয়েছে। ট্রাফিক পুলিশের সফটওয়্যার আপডেট না করায় নতুন হারে জরিমানা আদায় করা যাচ্ছে না। তৈরি হয়নি আইনের প্রয়োজনীয় বিধিমালাও ৷
এমন অবস্থায় আগামী সাত দিন নতুন আইনে জরিমানা আদায় হবে না বলে জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেছেন আগামী সাত দিন এই আইনটি নিয়ে ব্যাপক প্রচার চালানো হবে। তারপর জরিমানা আদায়সহ অন্যান্য বিধান কার্যকর হবে। তাঁর দাবি এই আইনটি পুরোপুরি কার্যকর হলে সড়ক দুর্ঘটনা কমে যাবে।
১ নভেম্বর থেকে কার্যকর হওয়া নতুন আইনে বিভিন্ন অনিয়মের জন্য জরিমানার পরিমান পাঁচ থেকে ৫০ গুণ বাড়ানো হয়েছে৷ উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আগের আইনে যত্রতত্র হাইড্রোলিক হর্ন বাজালে ২০০ থেকে ৫০০ টাকা জরিমানার বিধান ছিলো। এখন তা করা হয়েছে ১০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা তিন মাসের কারাদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড।
এই আইনে শুধু চালক ও পরিবহন মালিক নয়, এবার পথচারীদেরও শাস্তির আওতায় আনা হয়েছে। চালককে সংকেত মানতে হবে। পথচারীকেও সড়ক, মহাসড়কে জেব্রা ক্রসিং, ওভার ব্রিজ, আন্ডার পাস ব্যবহার করতে হবে। যত্রতত্র রাস্তা পার হলে পথচারীকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা গুনতে হবে।
ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো চালক যদি দুর্ঘটনার মাধ্যমে কোনো ব্যক্তির প্রাণহানি ঘটান তাহলে তার বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায়ই মামলা হবে। এর সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড৷ তবে দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর জন্য চালকদের সর্বোচ্চ শাস্তি পাঁচ বছর এবং এই অপরাধ জামিন অযোগ্য৷ আগে এই অপরাধে সর্বোচ্চ শাস্তি ছিলো তিন বছরের কারাদণ্ড এবং জামিনযোগ্য।
আইনের নতুন কিছু দিক
ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া কেউ যানবাহন চালালে তার শাস্তি ছয় মাসের কারাদণ্ড বা ২৫ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড। নিবন্ধনহীন যানবাহনের জন্য শাস্তি ছয় মাসের কারাদণ্ড এবং ৫০ হাজার টাকা জরিমানা। যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং এর জন্য পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা। উল্টো পথে গাড়ি চালালেও জরিমানা গুনতে হবে। এছাড়া ফিটনেস, রেজিস্ট্রেশন এসব বিষয়েও জরিমানা অনেক বাড়ানো হয়েছে।
গাড়ি চালানো অবস্থায় মোবাইল ফোনে কথা বললে ২৫ হাজার টাকা জরিমানা। অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করলে এক মাসের জেল ও ১০ হাজার টাকা জরিমানা আদায়ের বিধান রয়েছে।
আর দুর্ঘটনায় আহতদের ক্ষতিপূরণ দিতে আদেশ দিতে পারবে কর্তৃপক্ষ। চালকদের সর্বনিম্ন বয়স হতে হবে ১৮ বছর। আইনটি মোটরবাইক থেকে শুরু করে সব ধরনের যান্ত্রিক যানবাহনের জন্য প্রযোজ্য হবে।
বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ
ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সভাপতি খন্দকার এনায়েতউল্লাহ বলেন, ‘‘এই আইন ঠিক মত কার্যকর হলে সড়ক দুর্ঘটনা কমে আসবে বলে আশা করি। কিন্তু এরজন্য ব্যাপক প্রচার দরকার। আর আইনের বিধিমালা করাও প্রয়োজন। বিধিমালা না করে আইনের প্রয়োগে নানা সমস্যা হতে পারে।”
তিনি আরো বলেন, ‘‘চালকদের শাস্তি বাড়ানো ও কিছু নিয়ম কঠিন করায় সংকট হতে পারে। কারণ দেশে প্রয়োজনের তুলনায় লাইসেন্সধারী চালক অনেক কম। এতে চালক সংকট দেখা দিতে পারে।”
আর সড়ক পরিহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ওসমান আলী বলেন, ‘‘এই আইনের অনেক ভাল দিক আছে। তবে ১২৫টি ধারার ৫২টিই চালক-শ্রমিকের শাস্তি নিয়ে। খারাপ রাস্তাঘাট, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন আর প্রশিক্ষণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না করে চালক-শ্রমিকদের শাস্তির এই বিধান ন্যায্য নয়।”
তিনি আরো বলেন, ‘‘একই সড়কে দ্রুতগামী যানবাহন আর নসিমন করিমন রেখে সড়ক দুর্ঘটনা কমানো কতটা সম্ভব?”
এই আইনটি বাস্তবায়ন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে বলে মনে করেন যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘‘ফিটনেস না থাকলে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা, না দিতে পারলে জেল। এখন পকেটে ২৫ হাজার টাকাতো থাকতে হবে। ১৪ মাস আগে করা এই আইন নিয়ে ব্যাপক প্রচারের দরকার ছিল৷ যা করা হয়নি। ফলে বাস্তবায়নে জটিলতা সৃষ্টি হবে।”
তিনি আরো বলেন, ‘‘আগের আইনটিই ঠিকমত বাস্তবায়ন হয়নি। তাই নতুন আইনটি বাস্তবায়নের আগে অবকাঠামোগত উন্নয়ন, ড্রাইভারদের প্রশিক্ষণ এবং ফিটনেসবিহীন যানবাহন সরিয়ে দেয়া দরকার ছিলো। আর যারা এই আইন প্রয়োগ করবেন তাদেরও প্রস্তুত করা দরকার ছিলো।”
সূত্র: ডয়চে ভেলে



