অবৈধ ইটভাটার যত কৌশল: অভিযানে ফল হয় কম

গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : অভিযান চালিয়ে বন্ধ করা অনুমোদনহীন ইটভাঁটা পুনরায় চালুর আশঙ্কা থাকে বলে মনে করেন অভিযান পরিচালনাকারীরা। তারা বলছেন, একবার বন্ধ করে দিলেই এসব ভাঁটা বন্ধ হয়ে যায় না। নানা কৌশলে কয়েক মাসের মধ্যে আবারও চালু করেন মালিকেরা। অভিযানের খবর পেয়ে আগে থেকেই তারা চিমনির আগুন নিভিয়ে দেন। পরে আবার চালু করেন। ভাঁটা চালু রাখার জন্য নানাভাবে অভিযান পরিচলনাকারীদের বিভ্রান্ত করারও চেষ্টা করেন তারা। ঢাকা ও এর পাশের কয়েকটি জেলার ভাঁটাগুলোতে এমন ঘটনা ঘটছে বলে জানা গেছে।

গত ২৬ নভেম্বর রাজধানীর বায়ুদূষণ কমাতে ঢাকা ও এর পাশের চারটি জেলায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার মাধ্যমে অবৈধ সব ইটভাটা বন্ধের নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, মুন্সীগঞ্জ ও মানিকগঞ্জ জেলার অবৈধ ইটভাটা ১৫ দিনের মধ্যে বন্ধের নির্দেশের পরিপ্রেক্ষিতে আপিল করা হয়। ৫টি আপিলের দুটি খারিজ হলেও এখনও তিনটি আপিল শুনানির অপেক্ষায় আছে।

নির্দেশ পরবর্তীকালে এই পাঁচ জেলায় চলছে নিয়মিত অভিযান। তবে সেটিকে আশানুরূপ বলছেন না পরিবেশবিদরা। ইট প্রস্তুত ও ভাঁটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইনের (সংশোধিত) বরাতে তারা বলছেন, আবাসিক, সংরক্ষিত ও বাণিজ্যিক এলাকা, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা বা উপজেলা সদর ও কৃষি জমিতে ইটভাঁটা স্থাপন করা যাবে না। এসব বিবেচনায় নিয়ে যদি অভিযান চালানো যায়, তবে বেশিরভাগ ভাটাই বন্ধ করতে হবে। কেননা পর্যবেক্ষণ বলে, বেশিরভাগ ইটভাটার এক কিলোমিটারের মধ্যে বসতি আছে।

বায়ুদূষণের উৎস বিষয়ে পরিবেশ অধিদফতরের গত মার্চের প্রতিবেদন বলছে, ঢাকার বায়ুদূষণের ৫৮ শতাংশের উৎস ইটভাটা। বিপদের কথা হলো, সারা দেশে গত পাঁচ বছরে ইটভাটার সংখ্যা প্রায় ৫৯ শতাংশ বেড়েছে। ঠিক কী পরিমাণ অবৈধ ইটভাটা রয়েছে তার সঠিক কোনও হিসাব না থাকলেও প্রতিবেদন বলছে, ঢাকা ও এর পাশের গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, মানিকগঞ্জ ও মুন্সীগঞ্জ জেলায় মোট ১ হাজার ৩০২টি ইটভাঁটা আছে। শুধু ঢাকা জেলাতেই ভাঁটা আছে ৪৮৭টি।

মানিকগঞ্জে ইটভাটার সংখ্যা ১৫০টি, যার সবগুলো এই মৌসুমে চালু হয়নি। এর মধ্যে পরিবেশ অধিদফতরের অনুমোদন ছাড়া কিংবা আবেদন নাকচ হয়েছে এমন ভাঁটা ২৬টি।

গত কয়েকদিনের অভিযানের অভিজ্ঞতা বলতে গিয়ে পরিবেশ অধিদফতরের উপপরিচালক খালিদ হাসান বলেন, ‘এই এলাকায় হাইকোর্টের নির্দেশের পর অভিযান চালিয়ে ১৩টি ভাঁটা বন্ধ করা হয়েছে এবং ১৩ লাখ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে। এছাড়া জেলা প্রশাসক এসএম ফেরদৌসের নির্দেশে মালিকরাই ১০টি ভাটা বন্ধ করে দিয়েছে। কিন্তু বন্ধ করা ভাটাগুলো বন্ধই থাকবে এর কোনও নিশ্চয়তা নেই। এ কারণে অভিযান অব্যাহত রাখা জরুরি। নানা কৌশলে ভাটা ফের চালু করে মালিকেরা। আমরা নজর রাখছি, আবারও ওইসব ভাটায় অভিযান চালাবো।’

এদিকে, গাজীপুরে ইটভাঁটা রয়েছে ৩৫২টি। এর মধ্যে ২৭৪টি অবৈধ। জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, সিটি করপোরেশন এলাকার ১৭৩টি ভাটাই অবৈধ। এ ছাড়া শ্রীপুর, কালিয়াকৈর, কাপাসিয়া, কালীগঞ্জ ও সদর উপজেলায় ১০১টি অবৈধ ইটভাটা আছে। সম্প্রতি ২৬টি ভাটা বন্ধ করে দেওয়ার পাশাপাশি ৮০ লক্ষাধিক টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে।

মুন্সীগঞ্জের নয়ন মিয়া বলেন, ‘আমাদের এলাকায় মোট ইটভাঁটা ছিল ৬৮টি; যার মধ্যে ৯টি অবৈধ ছিল। এগুলো ভেঙে গুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এখন আর কোনও অবৈধ ভাটা নেই।’

অবৈধ আরও ৬০টি ভাটা আছে উল্লেখ করে নারায়ণগঞ্জের পরিবেশ অধিদফতরের উপপরিচালক সাঈদ আনোয়ার বলেন, ‘নির্দেশের পরে এই এলাকার ৫৩টি ভাটা বন্ধ করা হয়েছে এবং ৯৩ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।’ একটি অভিযানে দেড় লাখ টাকা খরচ হয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘একদিনে তিনটির বেশি অভিযান চালানো সম্ভব না। আবার অনেক সুযোগ সুবিধা না থাকায় আমাদের পক্ষে এই অভিযান নিয়মিত চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না।’

বন্ধ হওয়া ভাটা আবারও চালু প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘মালিকরা মৌসুমের শুরুতে বড় বিনিয়োগ করে, বিধায় এ ধরনের অভিযানের পরও জীবন বাজি রেখে অবৈধপন্থায় কাজ শুরু করে। তবে আগামীতে সেটা করা খুব সহজ হবে না।’

মুন্সীগঞ্জে ইটভাটার সংখ্যা কম উল্লেখ করে পরিবেশ অধিদফতরের উপপরিচালক নয়ন মিয়া বলেন, ‘আমাদের এলাকায় মোট ইটভাটা ছিল ৬৮টি, যার মধ্যে ৯টি অবৈধ। সেগুলো ভেঙে গুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এখন আর কোনও অবৈধ ইটভাটা নেই।’

অবৈধ ইটভাটা অপসারণ নিয়ে আইনি প্রক্রিয়ায় যুক্ত আইনজীবী মনজিল মোরশেদ মনে করেন অভিযান অব্যাহত থাকলে সুফল পাওয়া যাবে। তিনি বলেন, ‘১৫ দিনের মধ্যে ইটভাঁটা বন্ধের বিষয়ে বিরোধীপক্ষ আপিল করেছিল। দুটি আপিল খারিজ হয়েছে পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে। ঢাকার বায়ুদূষণ কমাতে হলে বর্তমানে যে অভিযান চলছে তার মধ্য দিয়ে অবৈধ সবগুলো ভাটা সরাতেই হবে।’

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রেজওয়ানা হাসান বলেন, ‘যারা অবৈধ ব্যবসা করছেন, তারা নানা কৌশল নেবেন এটাই স্বাভাবিক। যতদিন থেকে অভিযান চলছে, তাতে অবৈধ ভাটা থাকার কথা না। চাহিদা বন্ধ না করে এসব ভাটা বন্ধ করতে চাইলে অভিযান খুব বেশি কাজে আসবে না।’

রেজওয়ানা হাসান বলেন, ‘সবার আগে পোড়ানো ইটের ব্যবহার থেকে সরে আসতে হবে। কেননা ইট বিক্রি করতে পারে বলেই তো অবৈধ ভাটা টিকে আছে। নিয়মিত মনিটরিংয়ের দায়িত্ব জেলা প্রশাসনকে নিতে হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘পরিবেশ অধিদফতরের পক্ষে এটি করা সম্ভব না।’ ২০১৫ সাল থেকে সরকারের কোনও বিল্ডিং পোড়ানো ইটে হবে না বলে যে সিদ্ধান্ত হয়েছে সেটিকে স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেন, ‘মানুষ বিকল্প পেলে পোড়ানো ইটের চাহিদা কমবে এবং তখন এই অবৈধ ভাটা এমনিতেই থাকবে না।’

 

 

আরো জানতে…….

ঢাকার আশপাশের ইটভাটা বন্ধের নির্দেশ

গাজীপুরের ৩৫২ ইটভাটার মধ্যে ২৭৪টিই অবৈধ

কাপাসিয়ায় অবৈধ ইটভাটায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান: ১০ লক্ষ টাকা জরিমানা

কালীগ‌ঞ্জে অ‌বৈধ ইটভাটায় অ‌ভিযান: ১০ লাখ টাকা জ‌রিমানা, কার্যক্রম বন্ধের নি‌র্দেশ

 

সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button