গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের পর করোনাভাইরাসের সংক্রমণ দ্রুত ছড়াচ্ছে গাজীপুরে। সংক্রমণের নতুন উপকেন্দ্র হতে যাচ্ছে রাজধানীর পার্শ্ববর্তী এই জেলা। দেশে শনাক্ত হওয়া রোগীর ৫ দশমিক ২১ শতাংশ (৮২ জন) গাজীপুরের বাসিন্দা।
বৃহস্পতিবার পর্যন্ত দেশে মোট ১ হাজার ৫৭২ জন আক্রান্ত ব্যক্তি চিহ্নিত হয়েছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৬০৮ জন বা মোট আক্রান্তের ৩৮ দশমিক ৬৭ শতাংশ রাজধানীর বাসিন্দা। আক্রান্তের দিক থেকে এর পরের অবস্থানে আছে নারায়ণগঞ্জ। এই জেলায় শনাক্ত হয়েছে ২৫৫ জন রোগী, যা দেশের মোট শনাক্ত হওয়া রোগীর ১৬ দশমিক ২২ শতাংশ। তৃতীয় সর্বোচ্চ রোগী গাজীপুরে। এক সপ্তাহের মধ্যে এ জেলায় শনাক্ত রোগী বেড়েছে প্রায় ১৪ গুণ।
সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) বলছে, গাজীপুরে আক্রান্তদের বড় অংশ নারায়ণগঞ্জের সঙ্গে সম্পর্কিত।
নারায়ণগঞ্জের মতো গাজীপুরও ভারী শিল্প ও পোশাকশিল্প-অধ্যুষিত এলাকা। ঘনবসতিপূর্ণ এই জেলায় ৩৫ থেকে ৪০ লাখ মানুষের বাস বলে ধারণা করা হয়। এর মধ্যে দেশের বিভিন্ন জেলার মানুষ রয়েছে। নারায়ণগঞ্জ ও রাজধানী ঢাকার সঙ্গে গাজীপুরের সীমানা। সংক্রমণ ঠেকাতে ১১ এপ্রিল গাজীপুর জেলা পুরোপুরি লকডাউন (অবরুদ্ধ) ঘোষণা করা হয়। কিন্তু লকডাউন পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। লকডাউন ঘোষণার পর থেকে বরং সংক্রমণের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। ১১ এপ্রিল পর্যন্ত গাজীপুরে করোনায় আক্রান্ত ১২ জন শনাক্ত হয়েছিলেন। লকডাউন করার পরের পাঁচ দিনে সেখানে শনাক্ত হয়েছেন আরও ৭০ জন।
গাজীপুরে ১৬ মার্চ প্রথম ইতালিফেরত এক ব্যক্তির মধ্যে সংক্রমণ ধরা পড়ে। তিনি মূলত নরসিংদীর বাসিন্দা। এরপর ২৯ মার্চ গাজীপুরের বারবৈকা এলাকায় আরেকজন শনাক্ত হন। তিনি ইতালিফেরত এক আত্মীয়ের সংস্পর্শে এসেছিলেন। এরপর থেকে ৯ এপ্রিল পর্যন্ত ওই জেলায় নতুন সংক্রমণ পাওয়া যায়নি। ১০ এপ্রিল আক্রান্ত রোগী বেড়ে হয় ৬। এরপর থেকে রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকে।
আইইডিসিআরের তথ্য অনুসারে বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত এই জেলায় মোট ৮২ জনের মধ্যে সংক্রমণ নিশ্চিত করা গেছে। তবে গাজীপুরের সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী বৃহস্পতিবার পর্যন্ত সেখানে ১১০ জনের মধ্যে সংক্রমণ পাওয়া গেছে। নতুন ২৮ জনের হিসাব শুক্রবার আইইডিসিআরের হিসাবে যুক্ত হবে। এই জেলায় এখন পর্যন্ত করোনায় একজনের মৃত্যু হয়েছে।
গাজীপুর জেলার মধ্যে কাপাসিয়া উপজেলায় সংক্রমণের হার বেশি। এই জেলায় আক্রান্তদের মধ্যে ১৩ জন কাপাসিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্যকর্মী। ওই উপজেলায় অবস্থিত একটি কৃষিপণ্যভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের ১৭ জন শ্রমিকের মধ্যেও সংক্রমণ পাওয়া গেছে। এ ছাড়া তেঁতুইবাড়ি এলাকায় অবস্থিত শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিব মেমোরিয়াল কেপিজে স্পেশালাইজড হাসপাতালে তিনজন চিকিৎসক, জিএমপি’র একজন সহকারী কমিশনার (এসি) ও একজন পুলিশ সদস্য, এক সাংবাদিক এবং পোশাক কারখানার শ্রমিকের মধ্যেও সংক্রমণ ধরা পড়েছে। এর মধ্যে বিদেশফেরতও আছেন আটজন। আক্রান্তদের বয়স ২৫ থেকে ৬৫ বছরের মধ্যে।
গত ২৪ ঘণ্টায় আক্রান্ত ৩১ জনের মধ্যে সর্বোচ্চ কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কর্মরত পাঁচজন চিকিৎসকসহ ১১ জন ও কালীগঞ্জ থানা এলাকায় কর্মরত ডিএসবি’র ১ জনসহ উপজেলায় মোট ২৩ জন ও জিএমপি’র একজন সহকারী কমিশনার (এসি) ও গাছা থানার তিন সদস্য এবং কাশিমপুর থানার তেঁতুইবাড়ি এলাকায় অবস্থিত শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিব মেমোরিয়াল কেপিজে স্পেশালাইজড হাসপাতালে দুই নার্স এবং গাজীপুর সদরে ২ জন। এ নিয়ে গাজীপুর জেলায় মঙ্গলবার পর্যন্ত মোট আক্রান্তের দাড়াঁলো ১১০ জন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন।
আইইডিসিআরের পরিচালক মীরজাদী সেব্রিনা বলেন, গাজীপুরে আক্রান্ত বাড়ছে। তবে তাঁরা এখনো গাজীপুরকে ‘এপিসেন্টার’ (সংক্রমণের কেন্দ্রস্থল) মনে করছেন না। এই জেলার সঙ্গে নারায়ণগঞ্জের সরাসরি ভালো যোগাযোগ রয়েছে। অনেকে নারায়ণগঞ্জের মাধ্যমে আক্রান্ত হয়েছেন। গাজীপুর থেকে রোগ ছড়াবে, সেটা তাঁরা এখনো মনে করছেন না। তবে গাজীপুরকে নিয়মিত পর্যবেক্ষণে রেখেছেন তাঁরা।
এর আগে গত বুধবার স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেছিলেন, গাজীপুরে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু সংক্রমণ ঠেকাতে গাজীপুর জেলা পুরোপুরি লকডাউন করা হলেও তা কার্যকর হচ্ছে না। চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য সুরক্ষাসামগ্রী (পিপিই) তৈরির জন্য এখনো অনেকগুলো পোশাক কারখানা চালু আছে। বেতন-ভাতার দাবিতে পোশাকশ্রমিকদের বিক্ষোভ হচ্ছে।
বৃহস্পতিবারও গাজীপুরের বোর্ডবাজার ও চৌরাস্তা এলাকায় তিনটি পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা বেতন-ভাতার দাবিতে বিক্ষোভ করেছেন। স্থানীয় কাঁচাবাজারগুলোতে প্রতিদিন সকাল থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত প্রচুর লোকসমাগম দেখা যায়।
গাজীপুরের সিভিল সার্জন মো. খাইরুজ্জামান বলেন, মানুষ এখন লকডাউন মানছে না। সামাজিক দূরত্বও বজায় রাখছে না। পার্শ্ববর্তী জেলার লোকজন গাজীপুরে যাতায়াত করতে পারছে। পুলিশ শত চেষ্টা করে মানুষকে ঘরে রাখতে পারছে না। ফলে দিন দিন আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। এ ছাড়া শুরুতে পরীক্ষা কম হয়েছে, এখন পরীক্ষা বেশি হচ্ছে, শনাক্তও বেশি হচ্ছে।
পোশাকশিল্প কারখানার বড় অংশ গাজীপুরে, যার অনেকগুলো এখনো চালু আছে। ইতিমধ্যে এখানকার পোশাকশ্রমিকও আক্রান্ত হয়েছেন। একজন পোশাকশ্রমিক গাজীপুর থেকে নেত্রকোনায় গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার পর সংক্রমণ ধরা পড়ে। ইতিমধ্যে এমন কতজন কত জায়গায় ছড়িয়ে গেছেন, তার কোনো আন্দাজ করতে পারছেন না স্থানীয় প্রশাসন।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ভাইরোলজিস্ট নজরুল ইসলাম বলেন, সংক্রমণের দিক থেকে দেশকে চার ভাগে ভাগ করা যায়। তা হলো রাজধানী ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও বাকি বাংলাদেশ। এর মধ্যে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরের ঘটনাগুলো ভালোভাবে বিশ্লেষণ করতে হবে। সংক্রমণের কেন্দ্রস্থল কোনটা, তা বের করতে হবে। তিনি বলেন, নারায়ণগঞ্জ থেকে অনেকে বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে পড়েছেন। যদিও প্রশাসন বলছে, তাঁদের কোয়ারেন্টিনে নেওয়া হয়েছে। প্রকৃত পরিস্থিতি অজানা। নারায়ণগঞ্জ থেকে গাজীপুরের পার্থক্য, এখন পর্যন্ত গাজীপুর থেকে অন্য জেলায় সেভাবে সংক্রমণ ছড়ানোর প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এখান থেকে লোকজন যাতে বাইরে যেতে না পারেন, সেটা নিশ্চিত করতে হবে।
সূত্র: প্রথম আলো