গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : বাংলাদেশে ৭১ জন চিকিৎসকসহ অন্তত পৌনে দুইশ স্বাস্থ্যকর্মী করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। ইতোমধ্যে একজন চিকিৎসক মারা গেছেন। এর বাইরে বিপুল সংখ্যক চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী কোয়ারান্টিনে আছেন।
শনিবার পর্যন্ত সারাদেশে করোনা আক্রান্ত সনাক্ত হয়েছেন ২ হাজার ১৪৪ জন। আর মারা গেছেন ৮৪ জন।
সারাদেশে করোনা রোগীদের চিকিৎসা দেয়া হাসপাতাল ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালের ৭১ চিকিৎসক ও ৬২ জন নার্সসহ কমপক্ষে পৌনে দুইশ স্বাস্থ্যকর্মী এখন পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছেন। সে হিসেবে আক্রান্তদের শতকরা প্রায় ৮ ভাগ স্বাস্থ্যকর্মী। বিভিন্ন দেশের গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী অন্তত মার্চের তৃতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিনভাবে কোভিড-১৯ আক্রান্ত দেশগুলোর মধ্যে ইটালিতে প্রায় ৮.৫%, স্পেনে ১৫% এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও ও মিনেসোটা রাজ্যে আক্রান্তদের প্রায় ২০% স্বাস্থ্যকর্মী৷ সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, তুলনা করলে বাংলাদেশে আক্রান্তের হার নেহায়েত কম নয়। কারণ চীনে মার্চের তৃতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত আক্রান্তের মাত্র ৪% ছিলেন স্বাস্থ্যকর্মী৷ তাছাড়া এসব দেশে করোনার প্রকোপ বেড়েছে বাংলাদেশের আগে থেকে। পর্যাপ্ত পিপিইর অভাব, নিম্নমানের মাস্ক ও সার্বিক অব্যবস্থাপনার কারণে এ অবস্থা তৈরি হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
‘‘প্রথমত, যথাযথ নিরাপত্তা সামগ্রী ছাড়াই প্রথম দিকে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সেবা দিতে বাধ্য করা হয়েছে। তারপর তাদের কাছে যেসব সামগ্রী গেছে তা ছিল অত্যন্ত নিম্নমানের,’’ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম ডয়চে ভেলেকে বলেন।
তিনি যোগ করেন, ‘‘দ্বিতীয়ত, এন-৯৫ মাস্কের নামে তাদের যেটা দেওয়া হচ্ছে সেটা অত্যন্ত নিম্নমানের। তৃতীয়ত, কুর্মিটোলা বা কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে যারা এই চিকিৎসা দিচ্ছেন তাদের নানা ধরনের সংকট রয়েছে। এমনকি তারা ঠিকমতো খাবারও পাচ্ছেন না। ফলে তারা মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছেন। যখন কেউ মানসিকভাবে দুর্বল থাকেন তখন তিনি নিরাপত্তা সামগ্রী ব্যবহারে অত বেশি মনোযোগী থাকেন না। আর চতুর্থত, এদের কোন প্রশিক্ষণই নেই। মিডিয়ার মাধ্যমে দেখে যা শিখেছেন তাই প্রয়োগ করে রোগীদের চিকিৎসা দিচ্ছেন। ফলে তাদের জানায় ঘাটতি রয়েছে।’’
চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যকর্মীরা আক্রান্ত হওয়ার কারণে, অনেক হাসপাতাল ইতোমধ্যে লকডাউন করা হয়েছে। করোনা রোগীকে চিকিৎসা দিতে গিয়েই সিলেটের এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক ডা. মঈনউদ্দিন আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। উন্নত চিকিৎসা দিতে ঢাকায় আনতে তার জন্য এয়ার অ্যাম্বুলেন্স চেয়েও পাওয়া যায়নি। এমনকি সরকারী অ্যাম্বুলেন্সও পাননি তিনি। এখনও হাসপাতালগুলোতে যারা সরাসরি চিকিৎসা সেবা দিচ্ছেন তাদের কাছে উপযুক্ত নিরাপত্তা সরঞ্জাম পৌঁছানো হয়নি। হাসপাতালগুলোতে নেয়া হয়নি ‘ট্রায়জের’ (বিশেষ ব্যবস্থা যেখানে সব রোগীকে পৃথক করে চিকিৎসা দেয়া হয়) ব্যবস্থাও।
বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সভাপতি ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন বলেন, ‘‘(স্বাস্থ্যকর্মীরা) বাংলাদেশে বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন কারণ চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা ভালো সেবা দিচ্ছেন। তারা নিজেদের জীবন বাজি রেখে মানুষের চিকিৎসা দিচ্ছেন।’’
পর্যাপ্ত নিরাপত্তা সরঞ্জাম কি তারা পাচ্ছেন? জবাবে তিনি বলেন, ‘‘আগে পাইনি তবে এখন পাচ্ছি৷ এখন তো প্রধানমন্ত্রী নিজেই বিষয়টি দেখভাল করছেন। ফলে আর সমস্যা হবে না৷” এন-৯৫ মাস্কের নামে যা দেওয়া হচ্ছে তা নিম্নমানের স্বীকার করে ডা. মহিউদ্দিন বলেন, ‘‘ডাক্তাররাও এমন অভিযোগ করছেন। খাবার দাবার নিয়েও সমস্যা হচ্ছে। এগুলোর দিকে বিশেষ মনোযোগ দিতে বলেছি।’’
বেশ কয়েকজন চিকিৎসক বলছেন, অনেক রোগী তথ্য গোপন করে চিকিৎসা নিচ্ছেন। এ কারণেও ভয়াবহ রোগটি চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে। এভাবে চলতে থাকলে স্বল্প সময়ে দেশের স্বাস্থ্যকর্মীদের একটি বড় অংশ আক্রান্ত হয়ে পড়তে পারেন। সেটি হলে রোগীরা চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হবেন।
সরকারপন্থী চিকিৎসকদের সংগঠন স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বচিপ) সভাপতি অধ্যাপক ডা. ইকবাল আর্সেনাল বলেন, ‘‘আমাদের যারা এগুলো ম্যানেজমেন্টের দায়িত্বে আছেন তারা মনে করেছিলেন, ডেঙ্গুর মতো পরিস্থিতি সামাল দিয়ে ফেলব। ফলে যে দুই মাস তারা সুযোগ পেয়েছিলেন তখন কিছুই করা হয়নি। শুধু ফাঁকা বুলি দিয়ে গেছেন। যখন আক্রান্ত ধরা পড়ল তখনও শুধু মনোবল দিয়েই চিকিৎসকদের মাঠে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে তারা অনেক বেশি আক্রান্ত হয়েছেন। এখন কিছু কাজ শুরু হয়েছে, কিন্তু ব্যবস্থাপনায় অনেক ত্রুটি বিচ্যুতি রয়েছে।’’
বাংলাদেশ টেকনোলজিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক মহাসচিব সেলিম মোল্লা বলেন, ‘‘ইতোমধ্যে আমাদের অন্তত ২০ জন টেকনোলজিস্ট আক্রান্ত হয়েছেন। আমরা সিস্টেমটা পরিবর্তন করতে বলেছি। আমাদের সবাইকে আগে অফিসে হাজির করানো হচ্ছে। তারপর কাজ ভাগ করা হচ্ছে। আমরা বলেছি, আগে কাজ ভাগ করে দেন। যাদের প্রয়োজন নেই তারা কেন অফিসে আসবে? এতে আমাদের লোকজন বেশি করে আক্রান্ত শুরু হলে কিন্তু কাজ করার লোক থাকবে না।’’
সূত্র: ডয়চে ভেলে