কওমি আলেমরা চান না ভাস্কর্য হোক, চাঙ্গা হচ্ছে হেফাজতের মামলা

গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : ভাস্কর্যের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন দেশের একদল আলেম।

শনিবার (৫ ডিসেম্বর) কওমি মাদ্রাসাপন্থি আলেমরা ঢাকায় বৈঠক শেষে এ বিবৃতি দেন। পাশাপাশি সরকারের সঙ্গে সমন্বয়ের জন্য ১১ সদস্যের একটি কমিটি করা হয়েছে।

ভাস্কর্য ইস্যুতে দেশের চলমান অস্থিরতা ও সংকট নিরসনে শনিবার দেশের ৯০ জন আলেম ঢাকার যাত্রাবাড়ি মাদ্রাসায় করণীয় ঠিক করতে বৈঠকে বসেছিলেন। এতে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ কওমি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড- বেফাকের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আল্লামা মাহমূদুল হাসান। সেখানে সর্বসম্মত ৫ দফা সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। সিদ্ধান্তগুলোর মধ্যে প্রধান হল, মানবমূর্তি বা ভাস্কর্য নির্মাণ ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। তারা বলেন, এটা শরীয়া সম্মত নয়।

এছাড়া ইসলামের নবীর বিরুদ্ধে অবমাননা, ব্যাঙ্গাত্মক ও বিষদগারের তীব্র নিন্দা জানিয়ে তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে দোষীদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানানো হয়। এখন পর্যন্ত ইসলামপন্থি নানা আন্দোলনে যাদের গ্রেফতার করা হয়েছে তাদের নিঃশর্ত মুক্তি ও মামলা প্রত্যাহারের আবেদন করা হয়েছে। আলেমগণ ওয়াজ মাহফিলে লাউড স্পিকার ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞার সমালোচনা করেন। এছাড়া আলেমদের বিরুদ্ধে বিনা কারণে বিষোদগার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করা হয়।

সরকারকেই ভাঙতে হবে!

বৈঠকের উদ্ধৃতি দিয়ে হেফাজতে ইসলামের প্রচার সম্পাদক মাওলানা জাকারিয়া নোমান ফয়েজী বলেন, ‘‘এই বৈঠকে দেশের শীর্ষ ১০০ জন আলেমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। ৯০ জন উপস্থিত ছিলেন৷ চলমান অস্থিরতা ও সংকট নিরসনে এই বৈঠক ডাকা হয়েছিল।”

ভাস্কর্য ইস্যুতে হেফাজতের নতুন কোন কর্মসূচি আছে কি-না বা সরকার তাদের কথা না শুনলে হেফাজত কী করবে? জানতে চাইলে মাওলানা ফয়েজী বলেন, ‘‘শীর্ষ নেতারা এগুলো নিয়ে চিন্তাভাবনা করছেন। তবে আমরা ভাস্কর্য ভাঙব না। সরকার নির্মাণ করলে সেটা সরকারকেই ভাঙতে হবে।”

তবে ভাস্কর্য নিয়ে হেফাজতের এই অবস্থানের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছে সরকারী দল আওয়ামী লীগের বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন। তারা হেফাজত নেতাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলাসহ বিভিন্ন ধরনের দাবি করেছে। এই আন্দোলন ও পাল্টা আন্দোলনের মধ্যে কুষ্টিয়া শহরের পাঁচ রাস্তার মোড়ে রাতের আঁধারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্মাণাধীন ভাস্কর্যের কিছু অংশ ভেঙে দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। শুক্রবার রাতের কোন এক সময় নির্মাণাধীন এ ভাস্কর্যের মুখ ও হাতের অংশে ভাঙচুর করা হয়।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের শনিবার এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, ‘‘বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী দেখভাল করছেন।”

একই দিন জামালপুরে এক অনুষ্ঠানে ধর্ম প্রতিমন্ত্রী ফরিদুল হক খান বলেছেন, ‘‘এক সপ্তাহের মধ্যে বিষয়টির সুরাহা হয়ে যাবে।”

তবে বিষয়টি সাধারণভাবে না দেখতে বলেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক। তিনি বলেন, ‘‘এরা ভয়ঙ্কর। এরা নারী শিক্ষার বিরোধী। এদের চরিত্র সবাই জানে। এদের কোনভাবে ছাড় দেওয়া ঠিক হবে না। প্রশাসনের উচিৎ সর্বোচ্চ শক্তি ব্যবহার করে এদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা। ভাস্কর্য ইতিহাসের অংশ। এরা ইতিহাস মুছে ফেলতে চায়। এরা পারলে মুক্তিযুদ্ধকেও মুছে ফেলতে চায়।”

অন্যদিকে শক্তি ব্যবহার নয়, আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের কথা বলেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক আবুল কাশেম ফজলুল হক। তিনি বলেন, ‘‘আমি ভাস্কর্যের পক্ষে। তবে সরকারি শক্তি ব্যবহার করে তাদের দমন করার চেয়ে, আলোচনার মাধ্যমে সমাধান হলেই ভালো। আসলে সবকিছুর জন্য গণতন্ত্র দরকার। আমাদের এখানে তো গণতন্ত্র নেই। ফলে এসব কথা বলে লাভ কি? কে শুনবে আমাদের কথা?”

সচল হচ্ছে ২০১৩ সালের মামলা

এদিকে হেফাজতের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থানেই যাচ্ছে সরকার। নতুন করে সচল হচ্ছে হেফাজতে ইসলামের বিরুদ্ধে করা ১২টি মামলা। দীর্ঘ সাত বছর ঐ মামলাগুলো ঘুমিয়ে ছিল। হেফাজতের বর্তমান আমীর জুনায়েদ বাবুনগরীসহ অনেক হেফাজত নেতা এই মামলার আসামী। ২০১৩ সালের ৫ ও ৬ মে ঢাকা শহরের বিভিন্ন স্থানে তাণ্ডব চালায় হেফাজত। তারা দোকানপাটে আগুন লাগিয়ে দেয়, ভাঙচুর করে সরকারি বেসরকারি গণপরিবহন, বহু মানুষকে নির্মমভাবে পেটায়। হেফাজতের তাণ্ডবে ১৪ জন মারা যায়। নারকীয় এই তাণ্ডবের পর হেফাজতের কেন্দ্রীয় নেতাদের বিরুদ্ধে এক ডজন মামলা হয়। এর মধ্যে পুলিশের করা ৫ মামলা ছাড়াও আক্রান্ত এবং ক্ষতিগ্রস্থরা করেন বাকী ৭ মামলা। সরকারকে উৎখাতের হুমকি দেওয়ায় বাবুনগরীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলাও হয়। ওই মামলায় তিনি গ্রেপ্তারও হন। কিন্তু আল্লামা শফীসহ হেফাজতের সঙ্গে সরকারের সুসম্পর্ক হওয়ার পর মামলাগুলো ঘুমিয়ে পড়ে।

হেফাজতের মামলা সচল করার বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মেট্টোপলিটন পুলিশের উপ-কমিশনার ওয়ালিদ হোসেন বলেন, ‘‘মামলা কখনও ঘুমিয়ে পড়ে না। কোন মামলার তদন্ত করতে বেশি সময় লাগে, কোন মামলা তদন্ত দ্রুত শেষ হয়ে যায়। মামলা সবসময় চলমান। অনেক সময় আসামী গ্রেপ্তার বা সবকিছু গুছিয়ে চার্জশিট দিতে একটু বিলম্ব হয়। বিদ্যমান মামলাগুলোও তদন্ত চলছে। সময় হলেই চার্জশিট দেওয়া হবে।”

 

সূত্র: ডয়চে ভেলে