গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : দেশে করোনার সময় মাঠের রাজনীতি তেমন না থাকলেও বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক সংঘাতের ঘটনা ঘটছে। আর এই সংঘাত সবচেয়ে বেশি আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী সংগঠনগুলোর মধ্যে।
গত মাসে দেশের বিভিন্ন জেলায় অনুষ্ঠিত ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে বিএনপি অংশ না নিলেও আওয়ামী লীগ ও তাদের বিদ্রোহী প্রার্থীদের মধ্যে নির্বাচনের দিন সংঘাতে তিনজন নিহত হয়েছেন। আর আসছে ইউপি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এরই মধ্যে মাগুরায় চারজন নিহত হয়েছেন।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসেবে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর এই ৯ মাসে সারাদেশে রাজনৈতিক সংঘাতে নিহত হয়েছেন ৬৪ জন। নিহতের এ সংখ্যা গত বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। গত বছর সারাদেশে রাজনৈতিক সংঘাতে ৩১ জন নিহত হয়েছেন। তার আগের বছর অর্থাৎ ২০১৯ সালে নিহত হয়েছেন পাঁচজন।
চলতি বছরের ৯ মাসে সারাদেশে ৩২১টি রাজনৈতিক সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় আহত হয়েছেন চার হাজার ৪০৫ জন। এসময়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে ৬টি। তাতে ৭২ জন আহত হয়েছেন। আর মারা গেছেন তিনজন।
সংস্থাটির হিসেব অনুযায়ী, উল্লেখিত সময়ে আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী সংগঠনগুলোর ভেতরে সংঘাত-সংঘর্ষের ঘটনা বেশি। মোট সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে ৮৩টি। তাতে নিহত হয়েছেন ১২ জন, আর আহত হয়েছেন ৯৬৯ জন।
বিএনপি ও তার সহযোগী সংগঠনগুলোর মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে চারটি। আহত হয়েছেন ১০ জন৷ নিহত হয়েছেন এক জন৷ তবে পুলিশের সাথে তাদের সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে ১৮টি৷ আহত হয়েছেন ৫৫০ জন। আওয়ামী লীগের সাথেও পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। মোট তিনটি ঘটনায় আহত হয়েছেন ৯৬ জন।
এদিকে, হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়েছে ৯টি৷ নিহত হয়েছেন পাঁচজন। আহত ৮৭ জন।
চলতি বছরে দেশের বিভিন্ন স্থানে নির্বাচনি সহিংসতার ঘটনাও ঘটেছে। কয়েক ধাপের ইউপি নির্বাচনে ১৬৭টি সংঘাতের ঘটনায় ৩০ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন এক হাজার ৯৪২ জন। পৌর নির্বাচনে ১০টি সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে। তাতে নিহত হয়েছেন একজন। আহত হয়েছেন ১১৮ জন। সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ৬টি ঘটনায় নিহত হয়েছেন তিন জন। আহত ১৬২ জন।
এছাড়া জাতীয় পার্টি, জাসদসহ আরো অনেক ছোট ছোট রাজনৈতিক দলও সংঘাত-সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েছে।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী সংগঠনগুলোর মধ্যে সংঘাতের মূল কারণ এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণ, বহিরাগতদের আধিপত্য, ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ, অভ্যন্তরীণ গ্রুপিং, দলীয় পদ নিয়ে সমস্যা প্রভৃতি। আর বিএনপি ও তার সহযোগী সংগঠনগুলোর মধ্যে সংঘাতের কারণ অভ্যন্তরীণ কোন্দল, দলের পদ-পদবী, দলে আধিপত্য প্রভৃতি। স্থানীয় সরকার বিশেষ করে ইউপি নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও বিদ্রোহী প্রার্থীদের সমর্থকদের মধ্যেই সংঘাত বেশি হয়েছে।
অর্থাৎ করোনার সময় দেশে মাঠের রাজনীতি খুব একটা দেখা না গেলেও, রাজনৈতিক সংঘাত বেড়েছে। করোনার আগের বছর যেখানে সংঘাতে মারা গেছে পাঁচজন সেখানে করোনার বছর ২০২০ সালে ৩১ জন আর চলতি বছরের অর্থাৎ ২০২১ সালের প্রথম নয় মাসেই ৬৪ জন নিহত হয়েছেন।
আসকের সাধারণ সম্পাদক এবং মানবাধিকার কর্মী নূর খান বলেন, ‘‘দিন দিন আদর্শিক রাজনীতি দূরে চলে যাওয়ায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। দলগুলোর ভেতরে আরেকটি দল, নানা উপদল সৃষ্টি হয়েছে স্বার্থের কারণে। আর সেই স্বার্থ নিয়েই দলের নানা উপদল অভ্যন্তরীন সংঘাতে জড়িয়ে পড়ছে।’’
তার মতে, কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থার কারণে সরকার সমর্থক দলে এটা বেশি। বিরোধী দলগুলোও রাজনীতি না থাকায় অভ্যন্তরীণ সংঘাতে জড়িয়ে পড়ছে। আর সব দলেই এখন কম বেশি ব্যক্তি পূজা চলছে। ফলে দলগুলোর মধ্যে গণতান্ত্রিক চর্চা নাই৷ আছে সংঘাত-সংঘর্ষ।
তিনি বলেন, ‘‘সরকার সমর্থকরা আবার বিরোধী দলকে কোনঠাসা করতে সংঘাতের আশ্রয় নেয়। ফলে রাজনীতি না থাকলেও মারামারি-সংঘাত আছে৷ দিন দিন এটা বাড়ছে।’’
আর সুশাসনের জন্য নাগরিকের(সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুদারের বলছেন, ‘‘রাজনীতি এখন জনকল্যাণের জন্য নেই। এটা ব্যক্তিস্বার্থের জন্য হচ্ছে৷ তাই প্রকৃত রাজনীতি না থাকলেও সংঘাত-মারামরি আছে। এই সংঘাত ব্যক্তিগত সুবিধা আদায়ের জন্য৷ ক্ষমতাসীনরা সংঘাত-সঘর্ষ করছে এখন সুবিধা পাওয়ার জন্য। কেউ পাচ্ছে আবার কেউ কম পাচ্ছে বা পাচ্ছে না। সেটা নিয়ে সংঘাত হচ্ছে৷ আর বিএনপিতে সংঘাত হচ্ছে ভবিষ্যতে পাওয়ার আশায়। তারা ক্ষতায় গেলে কার আধিপত্য থাকবে, কে বেশি পাবে তার লড়াই চলছে এখন।’’
তিনি বলেন, ‘‘রাজনীতি মানে হচ্ছে দেওয়া। দেশের মানুষকে, জনগণকে দেয়া। কিন্তু এখন হচ্ছে নিজের পাওয়ার রাজনীতি। নিজের স্বার্থের রাজনীতি।’’
এর পরিণতি খুব খারাপ হবে বলেও সতর্ক করেন তিনি।
সূত্র: ডয়চে ভেলে