বিচার শেষের আগেই দুই আসামির ফাঁসি কার্যকর!
গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : বিচার শেষ হওয়ার আগেই যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে হত্যা মামলার দুই আসামির ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে। ২০১৭ সালের ১৬ নভেম্বর চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার কুমারী ইউনিয়নের দুর্লভপুর গ্রামের মৃত মুরাদ আলীর ছেলে আবদুল মোকিম (৬০) ও মৃত আকছেদ সর্দারের ছেলে গোলাম রসুল ঝড়ু (৬২) ফাঁসি কার্যকর করে কারা কর্তৃপক্ষ। বিচারাধীন আপিল নিষ্পত্তির আগে আসামিদের এভাবে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদ- কার্যকরের ঘটনাকে নজিরবিহীন হিসেবে উল্লেখ
করেছেন সাবেক এক প্রধান বিচারপতি। এমনকি নিহত মনোয়ার হোসেনের ছেলেও এমন ঘটনায় বিস্ময় প্রকাশ করে বলেছেন- আপিল বিচারাধীন এভাবে ফাঁসি কার্যকর করা সঠিক হয়নি। বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে ওই সময়ে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের দায়িত্বরত জেলার তুহিন কান্তি খানের সঙ্গে নানাভাবে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ১৯৯৪ সালের ২৮ জুন চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার কুমারী ইউনিয়নের দুর্লভপুর গ্রামে চরমপন্থি ক্যাডারদের হাতে খুন হন মুক্তিযোদ্ধা ও তৎকালীন ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য মনোয়ার হোসেন। তিনি স্থানীয় কুমারী ইউনিয়ন পরিষদের দুই মেয়াদে সদস্য ও কৃতী খেলোয়াড় ছিলেন। খুনের ঘটনায় তার ভাই মুক্তিযোদ্ধা অহিম উদ্দীন বাদী হয়ে আলমডাঙ্গা থানায় ২১ জনকে আসামি করে হত্যা মামলা করেন। মামলা দায়েরের এক যুগের বেশি সময় পর ২০০৮ সালের ১৭ এপ্রিল তিনজনের মৃত্যুদ-, দুজনকে যাবজ্জীবন ও অপর আসামিদের খালাস দেন চুয়াডাঙ্গার অতিরিক্ত দায়রা জজ আদালত।
মৃত্যুদ-াদেশপ্রাপ্তরা হলেন- একই ইউনিয়নের তৎকালীন ইউপি চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ, আবদুল মোকিম ও গোলাম রসুল ঝড়ু। বিচারিক আদালতের রায়ের পর নিয়ম অনুসারে আসামিদের মৃত্যুদ-াদেশ অনুমোদনের জন্য মামলাটি ‘ডেথরেফারেন্স’ (মৃত্যুদ- অনুমোদনের মামলা) হিসেবে হাইকোর্টে আসে। শুনানি নিয়ে হাইকোর্ট মোকিম ও ঝড়ুর মৃত্যুদণ্ড দেশ বহাল রেখে ২০১৩ সালের ৭ জুলাই ও ৮ জুলাই রায় ঘোষণা করেন। বাকি আসামিদের খালাস দেন। পরে মোকিম (আপিল নং-১১১/২০১৩) ও ঝড়ু (আপিল নং-১০৭//২০১৩) সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগে আপিল করেন। আপিল শুনানি নিষ্পত্তি হওয়ার আগেই ২০১৭ সালের ১৬ নভেম্বর রাতে এ দুই আসামির ফাঁসি কার্যকর করা হয়।
বিচারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিচারিক আদালতে কোনো আসামিকে মৃত্যুদ- দেওয়া হলে তা কার্যকরে হাইকোর্টের অনুমতির প্রয়োজন হয়। এ দুই আসামির ক্ষেত্রে হাইকোর্ট মৃত্যুদ- কার্যকরের অনুমোদন দেওয়ার পর ওই রায়ের বিরুদ্ধে আসামিপক্ষ আপিল করায় স্বাভাবিক নিয়মেই তাদের ফাঁসি কার্যকরের আদেশ স্থগিত হয়ে যাবে। আপিল নিষ্পত্তির পরও সাজা বহাল থাকলে আসামিরা রিভিউ আবেদন করতে পারবেন একই আদালতের কাছে। এমনকি রিভিউ আবেদন খারিজ হওয়ার পর রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদনও করতে পারবেন- এটিই হলো আইন ও সাংবিধানিক বিধান। কিন্তু বিচারের দুটি ধাপ ও একটি প্রশাসনিক ধাপ বাকি থাকার পরও দুই আসামির ফাঁসি কার্যকর করা আইনের শাসনের ব্যর্থতা, মানবাধিকারের লঙ্ঘন ও ন্যায়বিচারের পরিপন্থী। এ ঘটনাকে বাংলাদেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন, অবিশ্বাস্য ও হৃদয়বিদারক বলে দাবি করছেন বিচারসংশ্লিষ্টরা।
ঘটনাটিকে অত্যন্ত হৃদয়বিদারক উল্লেখ করে সাবেক প্রধান বিচারপতি ও বর্তমানে আইন কমিশনের চেয়ারম্যান এবিএম খায়রুল হক বলেন, ‘ঘটনা যদি সত্য হয় তা হলে এটি তো একেবারেই আইনের শাসনের পরিপন্থী হয়ে গেল। এটি তো হয় না, হতে পারে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘কোনো ফাঁসির আসামি আপিল বিভাগে আপিল দায়ের করলে তার ফাঁসি কার্যকরের ওপর স্থগিতাদেশ দেওয়া লাগে না। অটোমেটিক্যালি (স্বাভাবিকভাবেই) ফাঁসির আদেশ স্থগিত হয়ে যায়। কিন্তু আপিল বিচারাধীন থাকাবস্থায় ফাঁসি কার্যকর এটি খুবই দুর্ভাগ্যজনক। আইনের শাসন ও প্রশাসনিক ব্যর্থতা।’
নিহত মনোয়ার হোসেনের ছেলে কুমারী ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য জাহাঙ্গীর আলম বলেন, কীভাবে আপিল বিচারাধীন থাকাবস্থায় দুই আসামির ফাঁসি কার্যকর করা হলো তা আমরা জানতাম না। এটি বিচার কর্তৃপক্ষ ও কারাকর্তৃপক্ষ ভালো জানে। তবে এটি জানি, ২০১৭ সালে তাদের ফাঁসি কার্যকর হয়েছে। আপিল বিচারাধীন অবস্থায় ফাঁসি কার্যকর হওয়া নিয়ে এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িতরা আরও বিস্তারিত বলতে পারবেন- কেন তারা ফাঁসি কার্যকর করলেন? আমি মনে করি এভাবে আপিলের নিষ্পত্তির আগেই ফাঁসি কার্যকর সঠিক হয়নি।
ঘটনাটি খুবই শঙ্কার ও উদ্বেগের উল্লেখ করে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের সাবেক ডিন অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান বলেন, একটি দেশে ন্যায়বিচার, প্রশাসন থাকলে এ ধরনের ঘটনা ঘটে কী করে? এ ঘটনার মাধ্যমে আাইনের শাসনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে জনগণের মাঝে একটি ভিন্ন ধরনের বার্তা দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, আপিল নিষ্পত্তির আগে বিচার সম্পন্ন হয়েছে বলে ধরা যাবে না। সর্বোচ্চ আদালতে বিচারাধীন থাকলে তো ফাঁসির রায় কার্যকর করা যায় না। পুরো বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়াটা বিচারপ্রার্থীর শুধু নাগরিক অধিকারই নয়, এটি মৌলিক মানবাধিকার বলেও উল্লেখ করেন তিনি। হয় বিচার প্রশাসনের অথবা কারাকর্তৃপক্ষের চরম অবহেলায় এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে উল্লেখ করে অধ্যাপক মিজানুর রহমান আরও বলেন, সুপ্রিমকোর্টের উচিত দ্রুততার সঙ্গে এ ঘটনায় ব্যবস্থা নেওয়া। যারা যারা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত, যেভাবে এ ঘটনা ঘটেছে তা খুঁজে বের করা উচিত, তা না হলে বিচার বিভাগ সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণার সৃষ্টি হবে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, সম্প্রতি ওই দুই আসামির করা আপিল আবেদন সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগের কার্যতালিকায় শুনানির জন্য ওঠে। মামলাটি শুনানির জন্য তালিকায় ওঠার পর দরিদ্র ঝড়’র পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন আইনজীবী হুমায়ুন কবির। তিনি জানতে পারেন, ২০১৭ সালে মোকিম ও ঝড়ু’র ফাঁসি কার্যকর করেছে কারাকর্তৃপক্ষ। এর পর তিনি বিষয়টি মোকিমের আইনজীবী মো. আসিফ হাসানকেও জানান।
আলমডাঙ্গার কুমারী ইউনিয়নের বাসিন্দা মোকিম ও ঝড়ু’র বিষয় নিয়ে কথা বলতে যোগাযোগ করা হলে এলাকাবাসী জানান, দুটি পরিবারই অত্যন্ত গরিব ও অসহায়। তারা মামলার ব্যাপারে কোনো খোঁজখবর রাখতে পারতেন না। প্রশাসনের কাছে দৌড়ঝাঁপ করার মতো কোনো লোক তাদের ছিল না। এ কারণে আপিল বিচারাধীন থাকাবস্থায় ফাঁসি কার্যকর হলেও তা ঠেকাতে কোনো উদ্যোগ তারা নিতে পারেননি। ওই দুই পরিবারের সবাই এখন গ্রাম ছেড়ে দিয়েছেন। তারা কোথায় আছেন কেউ বলতে পারছেন না।
আপিল নিষ্পত্তির আগেই ফাঁসি কার্যকরের বিষয়ে জানতে চাইলে মোকিমের আইনজীবী আসিফ হাসান বলেন, সপ্তাহখানেক আগে অ্যাডভোকেট হুমায়ুন কবির আমাকে জানান, ওই দুই আসামির ফাঁসি কার্যকর হয়ে গেছে। আপিল বিচারাধীন থাকাবস্থায় কীভাবে এটি হলো তা নিশ্চিত হতে বলি। পরে তিনি আবার খোঁজ নিয়ে জানান, দুই আসামিরই ফাঁসি কার্যকর হয়েছে। বিগত ১০০ বছরের ইতিহাসে এমন ঘটনা দ্বিতীয়বারের মতো ঘটেছে উল্লেখ করে আইনজীবী মো. আসিফ হাসান বলেন, ‘এ ধরনের নজির দেশে কখনই দেখা যায়নি। তবে বিগত ১০০ বছরের ইতিহাসে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসনামলে এমন একটি নজির পাওয়া যায়। ব্রিটিশ আমলে নন্দ কুমারের বেলায় এমন ঘটনা ঘটেছিল। ওয়ারেন হেস্টিংসের শাসনামলে প্রতারণার অপরাধে সর্বোচ্চ সাজা ছিল সাত বছরের কারাদ-। তবে সে সাজার বিধান থাকলেও ব্রিটেনের আইন প্রয়োগ করে প্রতারণার মামলায় নন্দ কুমারকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। তাকে আপিল আবেদন করার সুযোগ দেওয়ার আগেই ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছিল। তখন থেকেই ‘জুডিশিয়াল মার্ডার’ শব্দটির ব্যবহার শুরু হয়। তবে মোকিম ও ঝড়ু’র বিষয়টি জুডিশিয়াল মার্ডার না হলেও হেফাজতে মৃত্যুর মতো একটি বিষয়।’
আপিল নিষ্পত্তির আগেই আসামিদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে মামলার আইনজীবী মো. আসিফ হাসান বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে, এ ঘটনায় কারাকর্তৃপক্ষের দায় রয়েছে। তাই এ ঘটনায় আমরা আপিল বিভাগের কাছে বিচার বিভাগীয় তদন্ত চাইব। যাদের অবহেলার কারণে এ ঘটনা ঘটেছে, তাদের অবহেলার উপযুক্ত বিচার চাইব। এমন ঘটনা যেন ভবিষ্যতে না ঘটে সে জন্য সর্বোচ্চ আদালতের কাছে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা চাইব। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্তদের পরিবারের জন্য উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ চাইব।’ তিনি জানান, গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন দেখে আপিল বিভাগ কোনো পদক্ষেপ না নিলে স্বাভাবিকভাবে আগামী মঙ্গল অথবা বুধবার এই আপিল শুনানির জন্য আসবে। তখন আমরা বিষয়টি আপিল বিভাগে উত্থাপন করব।
এদিকে কারাগারসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, আইনগত সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর মোকিম ও ঝড়’র ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে। আপিল বিভাগে মৃত্যুদ- বহাল থাকার পর এ দুই আসামি রাষ্ট্রপতির কাছে ‘মৃত্যুদণ্ড মওকুফের আবেদন’ করেন। রাষ্ট্রপতি এই আবেদন নামঞ্জুর করেন। ২০১৭ সালের ২২ অক্টোবর রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে সহকারী সচিব মোহাম্মদ আলী স্বাক্ষরিত এক পত্রে আবেদন নামঞ্জুরের বিষয়টি কারাকর্তৃপক্ষকে জানানো হয়। এর পর আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ১৬ নভেম্বর ফাঁসি কার্যকর করা হয়।
তৎকালীন জেলার আবু তালেব বর্তমানে নাটোরে জেলার হিসেবে কর্মরত। এ ছাড়া তৎকালীন জেল সুপার কামাল হোসেন বর্তমানে সিলেট কারাকর্তৃপক্ষের ভারপ্রাপ্ত ডিআইজি। আমাদের সময়ের পক্ষ থেকে তার সঙ্গে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগ করা হয়। আবু তালেব সরকারি ও ব্যক্তিগত দুটি ফোন বন্ধ করে রাখেন।
অপরদিকে সিলেট রেঞ্জের ভারপ্রাপ্ত ডিআইজি (কারা) কামাল হোসেনের দুটি ফোনে একাধিকবার ফোন করলেও তিনি রিসিভ করেননি।
সূত্র: আমাদের সময়



