তেল, এলপিজির মূল্যবৃদ্ধি, আরো ভোগান্তিতে মানুষ
গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : দাম বাড়ার পাগলা ঘোড়ায় পিষ্ট হচ্ছেন সাধারণ মানুষ৷ আয় বাড়ছে না। আয়ের সাথে সঙ্গতি রেখে ব্যয় করতে গিয়ে প্রয়োজনীয় পণ্যও কেনা বাদ দিতে হচ্ছে অনেককে৷ মাথাপিছু আয় বাড়ার বিপরীতে বাড়ছে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা।
শিলু হোসেন একজন একজন বেসরকারি চাকরিজীবী৷ বেতন পান ২০ হাজার টাকা। তিন বছর আগে এই কাজে ১২ হাজার টাকা বেতনে যোগ দিয়েছিলেন। বিয়ে করেননি, ঢাকায় একটি মেসে থাকেন। বাড়িতে বাবা-মা, ভাই-বোন থাকেন তাদের দেখতে হয়, টাকা পাঠাতে হয়। এই তিন বছরে তার বেতন আট হাজার টাকা বাড়লেও তিনি ভালো নেই। তার কথা, ‘‘যা বেতন বেড়েছে জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে তারা চেয়ে অনেক বেশি।” এএখন তার বেশ কিছু খরচ কমিয়ে দিয়েছেন। তারপরও প্রতি মাসে বন্ধু-বান্ধবের কাছ থেকে ধার করতে হয় জানিয়ে তিনি বলেন, “এখন আমি ঋণের বোঝায় ডুবে যাচ্ছি। বিয়ের কথাও চিন্তা করতে পারছি না।”
নাজমুল হক তপনও চাকরি করেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। বেতন পান ৫০ হাজার টাকা৷ এক মেয়ে ও স্ত্রীকে নিয়ে তিন সদস্যের পরিবার তার। তিনি মাসে বাসা ভাড়া দেন ১৬ হাজার টাকা। খাবার খরচ ২০ হাজার টাকা৷ মেয়ের স্কুলের বেতন দুই হাজার টাকা। ইন্টারনেট, ডিস বিল ও বিদ্যুৎ বিল চার হাজার টাকা। তারপর অফিসে যাওয়া-আসার খরচ। পোশাক, ওষুধ, আত্মীয়-স্বজন এলে তো আরো খরচ। তিনি হিসাব মেলাতে পারছেন না। তিনি বলেন, “দুই বছর আগে এই টাকায় আমার দিব্যি চলে যেতো। এখন খরচ বেড়েছে, কিন্তু বেতন বাড়েনি। তাই নানাভাবে ওই টাকায় চলার চেষ্টা করছি। আগে গরুর মাংস কিনতাম মাসে পাঁচ কেজি, এখন কিনি দুই কেজি৷ গরুর মাংস কম কিনে মুরগির মাংস বেশি কিনতাম ৷ এখন মুরগির মাংসের দামও বেড়ে গেছে। দুধ কিনতাম ১০ লিটার, এখন কিনি তিন লিটার। শাক-সবজি যে খাবো তার দামও অনেক৷ চাহিদা আর কত কমানো যায়!”
নাজমুল হক তপন পরিবার নিয়ে বছরে দুইবার গ্রামের বাড়ি যেতেন। করোনার কারণে গত দুই বছর যাননি। এবার যাওয়ার ইচ্ছা থাকলেও তা বাদ দিয়েছেন। কারণ, হাতে টাকা নেই। বাড়তি খরচ মেটাতে পারবেন না। তিনি বলেন,” আমার মেয়েটা দশম শ্রেণিতে পড়ে। আমি নিজেই ওকে গণিত, ইংরেজি ও বিজ্ঞান পড়াই। যদি প্রাইভেট টিউটর দিতে হতো তাহলে যে কী হতো ভাবতেই পারছি না।”
এই গল্প এখন বাংলাদেশের প্রতিটি মধ্যবিত্ত , নিম্ন মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত পরিবারের। সবাইকেই এখন ‘বাজেট কাট’ করতে হচ্ছে। অনেক জিনিস কমিয়ে কিনতে হচ্ছে, অথবা কেনা বাদ দিতে হচ্ছে।
সরকারি বিপণন সংস্থা টিসিবির হিসেবে এক বছরের ব্যবধানে চালের দাম বেড়েছে ১০ শতাংশ, আটা-ময়দা ২৯ শতাংশ, সয়াবিন-পাম অয়লের দাম ৫৪ শতাংশ, মসুর ডাল ১৭ শতাাংশ, মুরগির দাম ২৪ শতাংশ, চিনির দাম ২৬ শতাংশ বেড়েছে। এভাবে ভোগ্যপণ্যসহ প্রতিটি পণ্যের দামই কম-বেশি বেড়েছে। শিশুখাদ্যের দামও বেড়েছে অস্বাভাবিক হারে।
সর্বশেষ ডিজেল- কেরোসিনের দাম বাড়ানোর পর বৃহস্পতিবার বেড়েছে এলপিজির দাম। গৃহস্থালিতে ব্যবহৃত এলপিজির দাম সিলিন্ডার এক হাজার ২৫৯ টাকা থেকে বাড়িয়ে এক হাজার ৩১৩ টাকা আর গাড়িতে ব্যবহার করার গ্যাস প্রতি লিটারের দাম ৫৮ টাকা ৬৮ পয়সা থেকে বাড়িয়ে করা হয়েছে ৬১ টাকা ১৮ পয়সা করা হয়েছে।
ডিজেল ও কোরোসিনের দাম এক লাফে প্রতি লিটারে ১৫ টাকা বাড়িয়ে ৬৫ টাকা থেকে ৮০ টাকা করা হয়েছে এবং বুধবার রাত থেকে কার্যকর হয়েছে। চট্টগ্রাম ওয়াসা পানির দাম বাড়িয়েছে শতকরা পাঁচ ভাগ৷ ঢাকা ওয়াসাও বাড়াবে।
ডিজেলের দাম বাড়ানোর প্রতিবাদে শুক্রবার থেকে বাংলাদশে সব ধরনের পরিবহনে ধর্মঘট শুরু হয়েছে। তারা দাম কমানো অথবা ভাড়া বৃদ্ধির দাবি জানিয়েছেন। নিত্যপণ্যের বাজারে শুক্রবার এর তেমন কোনো নতুন প্রভাব দেখা যায়নি। তবে বিক্রেতা ও ব্যবসায়ীরা বলছেন দুই-একদিনের মধ্যেই এর প্রভাব শুরু হবে। পণ্য পরিবহণ বন্ধ থাকায় কাঁচাবাজারে সবার আগে প্রভাব পড়বে।
সিপিডির গবেষণা পরিচালক অর্থনীতিবিদ ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, এর চেইন রিআ্যাকশন আছে। ডিজেল ও কেরোসিনের দাম বাড়ায় কৃষি উৎপাদন ও সব ধরনের পণ্য পরিবহণ ব্যয় বেড়ে যাবে। যার প্রভাব ভোগ্যণ্যসহ সব ধরনের পণ্যে পড়বে।
তিনি বলেন, “সরকার বলছে, আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে সমন্বয় রেখে এই জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু এর মধ্যে ফাঁকি আছে। যখন আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমে, তখন কিন্তু বিপিসি কমায় না। ভারতে ডিজেলের দাম কম, কারণ. তারা যখন বাড়ে তখন বাড়ায়। আবার যখন কমে তখন কমায়। গত অর্থ বছরে বিপিসি পাঁচ হাজার কোটি টাকা লাভ করেছে। তখন কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কম ছিল। কিন্তু দাম না কমিয়ে তারা লাভ করেছে।”
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় এবং পিপিআরসি বৃহস্পতিবার তাদের এক গবেষণায় বলেছে, তিন কোটি ২৪ লাখ মানুষ নতুন করে দরিদ্র হয়েছেন। গত মার্চে সংখ্যাটা ছিল দুই কোটি ৪৫ লাখ। গত ছয় মাসে ৭৯ লাখ মানুষ দরিদ্র হয়েছেন।
খন্দকার গোলাম মেয়াজ্জেম বলেন, “জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে এবং তেলের দাম বাড়ানোর কারণে আরো বাড়বে। সাধারণ মানুষ এখন এটা আর নিতে পারছে না। তাদের আয় বাড়ছে না। আর কিছু বাড়লেও তার চেয়ে মূল্যস্ফীতি অনেক বেশি। এখন ছয় ভাগের মতো। ফলে মানুষ অসহনীয় অবস্থার মধ্যে আছে।”
কনজিউমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর হিসেবে গত বছর, মানে ২০২০ সালে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে ৬.৮৮ শতাংশ, ২০১৯ সালে বেড়েছে ৬.৫০ শতাংশ আর ২০১৮ সালে বেড়েছে ৬ শতাংশ। ঢাকায় জীবনযাত্রার ব্যয় সবচেয়ে বেশি বেড়েছে এই সময়ে।
ক্যাবের ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসেন বলেন, “সেতুর টোলও বাড়িয়ে দিয়েছে সরকার। সব কিছুর দামই বাড়ছে। কিন্তু কিছু লোক ছাড়া সাধারণ মানুষের আয় বাড়ছে না। সরকারি কর্মকর্তাদের আয় বেড়েছে। কিন্তু তারা তো ২০ লাখ। দেশের মানুষ আরো গরিব হচ্ছে। এই বছর জীবনযাত্রার ব্যয় আরো অনেক বেড়ে যাবে। ফলে মানুষ চরম সংকটে পড়ছে। জিসিপত্রের দাম ছাড়াও পরিবহন খরচ বেড়েছে। মানুষের এখন জীবনযাপনই কষ্টকর হয়ে দাঁড়াচ্ছে।”
বাংলাদেশের মানুষের মাথা পিছু আয় বেড়ে এখন দুই হাজার ৫৫৪ ডলার হয়েছে। আয় বাড়ার পরও মানুষ কেন অসহনীয় অবস্থায় আছে জানতে চাইলে খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, “এটা গড় হিসাব। কিছু মানুষের, যারা ধনী তাদের আয় হয়ত অনেক বেড়েছে, কিন্তু সাধারণ মানুষের বাড়েনি। অনেকের কমেছে৷ অনেকে এই করোনায় কাজ হারিয়েছেন।”
তার মতে, সাধারণ মানুষকে এখন ভোগ্যপণ্যসহ আরো অনেক পণ্যের ব্যবহার কমিয়ে দিতে হচ্ছে। যারা প্রতিদিন দুধ-ডিম খেতেন তারা এখন প্রদিদিন খেতে পারেন না। অনেকে ভাড়া বাঁচাতে ছোট বাসা খুঁজছেন। যে যেভাবে পারছেন টিকে থাকতে প্রয়োজনীয় খরচও কমিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন।
সূত্র: ডয়চে ভেলে



