গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : রাজনৈতিক সম্পর্কের শীতলতা সত্ত্বেও পাকিস্তানের সঙ্গে নজিরবিহীনভাবে বেড়েছে ব্যবসা-বাণিজ্য। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৩ মাসে বাংলাদেশ-পাকিস্তান বাণিজ্য রীতিমতো রেকর্ড ছুঁয়েছে! ঐতিহাসিকভাবে যে দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সম্পর্কের টানাপড়েন বিদ্যমান সেই পাকিস্তানের বৈদেশিক বাণিজ্য তালিকার শীর্ষে এখন বাংলাদেশের নাম। স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তানের পাবলিক ডাটায় বাংলাদেশ-পাকিস্তান বাণিজ্যের বিম্ময়কর ঊর্ধ্বগতি প্রত্যক্ষ করা গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের ওপর চীনের প্রভাব বৃদ্ধির ফসল ঘরে তুলতে শুরু করেছে বৈরী পাকিস্তান। যে সুযোগটি এসেছে ২০১৬ সালে, চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ঢাকা সফরের মধ্যে দিয়ে। বলাবলি আছে-অনেকটা বেইজিংয়ের মধ্যস্থতাতেই বাংলাদেশ-পাকিস্তান রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক ছন্দে ফিরছে। যদিও এটা কতটা পরিণত পর্যায়ে পৌঁছাবে বা টেকসই রূপ পাবে তা নিয়ে আগাগোড়ায় শঙ্কা রয়েছে। ঢাকার তরফে সাফ জানিয়ে দেয়া হয়েছে, একাত্তরে সংঘটিত যুদ্ধাপরাধের জন্য পাকিস্তানের আনুষ্ঠানিক ক্ষমা প্রার্থনা এবং যুদ্ধপূর্ব ট্রেজারির ভাগাভাগি ছাড়া দ্বিপক্ষীয় রাজনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক হবে না।
এটাই বাংলাদেশ-পাকিস্তান সম্পর্ক উন্নয়নের একমাত্র বিকল্প। যেকোনো ফোরামের আলোচনায় নিয়মিত বিরতিতে ইসলামাবাদকে ঢাকা সেই অবস্থানের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পাবলিক ডাটা পর্যালোচনায় দেখা গেছে, গত বছরের তুলনায় পণ্য এবং সেবা খাতে ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রথম ৩ মাসে বাংলাদেশ-পাকিস্তান প্রায় ৩৭ শতাংশ (৩৬ দশমিক ৯০ শতাংশ) বাণিজ্য বেড়েছে। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর ওই ৩ মাসে বাংলাদেশে ১৭৫ মিলিয়নের বেশি অর্থমূল্যের পণ্য রপ্তানির রেকর্ড করেছে পাকিস্তান। আগের অর্থবছরের ঠিক ওই সময়ে (জুলাই-সেপ্টেম্বর ২০২০) যা ছিল ১২৭ মিলিয়ন ডলারের কিছু বেশি। ডাটা বলছে, শীত মৌসুম শুরুর ঠিক আগ মুহূর্তের ওই ৩ মাসের দুই বছরের তথ্যের তুলনায় এটা অনুমেয় যে, ২০২০-২১ অর্থবছরের চেয়ে ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রথম কোয়ার্টারে বাংলাদেশে পাকিস্তানের পণ্য রপ্তানি বেড়েছে ৩৭ দশমিক ৫৭ ভাগ। অর্থবছরের তুলনা ছাড়াও ক্যালান্ডার ইয়ারের একটি হিসাবে দেখানো হয়েছে, গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে বাংলাদেশে পাকিস্তানের রপ্তানি প্রতিনিয়ত বাড়ছে। একটি হিসাবে দেখা গেছে তা ৬৫ শতাংশ বেড়েছে। অর্থাৎ অর্থমূল্য হিসাবে আগের বছরের এই সময়ে যা ছিল ৪১ মিলিয়ন ডলারের কিছু বেশি, এখন তা ৬৮ মিলিয়নের ওপরে। মাসের হিসাবে আগস্টের তুলনায় সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশে পাকিস্তানের রপ্তানি বেড়েছে ২৪ শতাংশের বেশি। আগস্ট-২০২১ এ পাকিস্তান ৫৫ মিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে বাংলাদেশে। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডাটায় দেখানো হয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে পাকিস্তানের চলতি অর্থবছরের প্রথম কোয়ার্টারে বাণিজ্য (মোট বৈদেশিক বাণিজ্য) বেড়েছে ৩৫ দশমিক ২৪ ভাগ। ওই চার্টের টপে অবস্থান করা বাংলাদেশের সঙ্গে পাকিস্তানের বাণিজ্য হয়েছে ৩৬ দশমিক ৯০ শতাংশ, যা ওভার-অল গ্লোবাল রেকর্ডকে ছাড়িয়েছে। হিসাব বলছে, ওই সময়ে পাকিস্তানের বৈদেশিক বাণিজ্য ৫.৩৫৩ থেকে ৭.২৪১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
বাংলাদেশ থেকে আমদানিও বাড়িয়েছে পাকিস্তান:
এদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডাটায় দেখা গেছে-বাংলাদেশ থেকে আমদানিও বাড়িয়েছে পাকিস্তান। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ সংক্রান্ত তথ্য নিয়ে একটি রিপোর্ট প্রচার করেছে দেশটির প্রধান সংবাদ সংস্থা অ্যাসোসিয়েট প্রেস অব পাকিস্তান। যাতে দেখানো হয়েছে- গত অর্থবছরের প্রথম ৩ মাসের তুলনায় চলতি বছরে বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তানের আমদানি বেড়েছে প্রায় ৪৪ ভাগ (৪৩ দশমিক ৯৬ শতাংশ)। অর্থমূল্যের হিসাবটি এমন ২০২০-২১ অর্থবছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পাকিস্তান পণ্য আমদানি করেছিল ১২ মিলিয়ন ডলারের কিছু বেশি অর্থের। যা ২০২১-২২ অর্থবছরের ওই সময়ে এসে দাঁড়িয়েছে ১৭ মিলিয়ন ডলারে। বাৎসরিক হিসাবে গত বছরের সেপ্টেম্বরের তুলনায় এ বছরের একই মাসে বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তানে আমদানি বৃদ্ধি পেয়েছে ৭৯.৩০ শতাংশ। গত বছরের এ সময়ে বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তান মোট ৪.৩০৫ মিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করে, যা এ বছর বেড়ে দাঁড়ায় ৭.৭১৯ মিলিয়ন ডলারে। মাসিক হিসাবে এ বছরের আগস্টের তুলনায় সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ থেকে আমদানি বেড়েছে ২৪.৩১ শতাংশ। আগস্টে বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তানের আমদানির পরিমাণ ছিল ৬.২০৯ মিলিয়ন ডলার। রিপোর্ট বলছে, সব মিলিয়ে বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তানের আমদানি ১০.৬৩৭ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে এখন ১৭.৪৭৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। অর্থাৎ ৬৪ দশমিক ২৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় সর্বমোট বাণিজ্য বেড়ে ১১৫ দশমিক ৩৬৯ মিলিয়ন ডলার থেকে ১৫৭ দশমিক ৯৪৩ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।