ভাড়া বৃদ্ধি: সিএনজিতে এখন আর বাস চলে না, দাবি মালিকপক্ষের!
গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : দেশে ভাড়া বৃদ্ধির আওতায় সিএনজিচালিত বাস পড়বে না, সড়ক পরিবহণ কর্তৃপক্ষের এমন নির্দেশনার পর মালিকরা বলছেন গ্যাসচালিত বাস এখন নেই। অথচ বিআরটিএ’র হিসাব অনুযায়ী, ঢাকায় ৯৫ শতাংশ বাসই সিএনজিচালিত।
রোববার বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ কর্তৃপক্ষ-বিআরটিএ’র সঙ্গে পরিবহণ মালিকদের বৈঠকে ডিজেলচালিত বাসের ভাড়া ২৭ ভাগ বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত হয়৷ আর লঞ্চের ভাড়া বেড়েছে ৩৫ ভাগ। ১০০ কিলোমিটার পর্যন্ত প্রতি কিলোমিটার লঞ্চের ভাড়া এক টাকা ৭০ পয়সা থেকে বাড়িয়ে দুই টাকা ৩০ পয়সা এবং ১০০ কিলোমিটারের ঊর্ধ্বে এক টাকা ৪০ পয়সা থেকে বাড়িয়ে দুই টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। জনপ্রতি সর্বনিম্ন ভাড়া ১৮ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০ টাকা করা হয়েছে।
ডিজেলচালিত দূরপাল্লার বাসে প্রতি কিলোমিটারে ভাড়া এক টাকা ৪২ পয়সা থেকে বাড়িয়ে এক টাকা ৮০ পয়সা হবে। ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরীর জন্যে কিলোমিটার প্রতি মিনিবাসের ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে দুই টাকা ১৫ পয়সা। যা আগে ছিলো এক টাকা ৬০ পয়সা। বড় বাসের ভাড়া এক টাকা ৭০ পয়সা থেকে বাড়িয়ে দুই টাকা ১৫ পয়সা করা হয়েছে। তবে মহানগরীতে বাস ও মিনিবাসের সর্বনিম্ন ভাড়া আট ও ১০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। নগরীতে বাসের ভাড়া বেড়েছে ২৬ দশমিক পাঁচ ভাগ।
সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে রোববার রাত থেকেই বাস ও লঞ্চ ধর্মঘট প্রত্যাহার করা হয়েছে। তবে ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান মালিকরা এখনো ধর্মঘটে আছেন। তারা ডিজেলের দাম কমানোর দাবিতে অনড় রয়েছেন।
ঢাকায় ৯৫ শতাংশ বাস গ্যাসে চলে
বিআরটিএ বলছে, ভাড়া বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত শুধু ডিজেলচালিত যানের ক্ষেত্রেই কার্যকর হবে। গ্যাসচালিত (সিএনজি) বাসের ক্ষেত্রে আগের ভাড়াই বহাল থাকবে। বিআরটিএ’র চেয়ারম্যান নূর মোহাম্মদ বলেন, ‘‘সিএনজিচালিত বাসের ভাড়া বাড়বে না৷ কারন সিএসজির দাম বাড়েনি।’’ তবে এটা নিশ্চিত করার কোনো পদ্ধতি বা কৌশল নেয়া হয়নি।
পরিবহণ বিশ্লেষকরা বলছেন, মালিকরা সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে সরকারকে চাপে ফেলে বাস ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্ত আদায় করে নিয়েছে। এখন তারা ডিজেল আর গ্যাসচালিত দেখবে না। বরং সব বাসেই ভাড়া বাড়িয়ে দিবে৷ এ কারণেই তারা ডিজেল ও গ্যাসচালিত বাসে আলাদা স্টিকার লাগাতে রাজি না।
বিআরটিএ’র হিসাব অনুযায়ী, ঢাকার ভেতরে মোট বাস ১২ হাজার ৫২৬টি৷ তার মধ্যে গ্যাসে চলে ১১ হজার ৯০০টি৷ ডিজেলে চলে ৬২৬টি। ঢাকা থেকে দূরপাল্লার বাস মোট ১৬ হাজার। তার মধ্যে গ্যাসে চলে ১১ হাজার ২০০। ডিজেলে চলে চার হাজার ৮০০। সারাদেশে মোট বাস ৭৮ হাজার। তার মধ্যে গ্যাসে চলে ৪৬ হাজার ৮০০টি। ডিজেলে চলে ৩১ হাজার ২০০টি। পণ্যবাহী ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান সারাদেশে তিন লাখ ৫১ হাজার ৭৩টি৷ প্রায় সবই ডিজেলে চলে।
এই হিসাব অনুযায়ী, ঢাকা শহরে ৯৫ শতাংশ বাসই গ্যাসে বা সিএনজিতে চলে। আর দূরপাল্লার বাসও গড়ে ৭০ ভাগের বেশি গ্যাসে চলে। তাই ভাড়া বাড়ানোর ঘোষণায় ঢাকা শহরে বাসের ভাড়া বাড়ার কথা না। আর দূরপাল্লায়ও অর্ধেকের বেশি বাসের ভাড়া বাড়ার কথা না। বাস্তবে কি সেটা ঘটবে?
‘সব গাড়ি আবার ডিজেলে ফেরত গিয়েছে’
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-ক্যাব এর ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসেন বলেন, ‘‘শুধু ডিজেলচালিত বাসের ব্যাপারে ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হলেও সব বাসেই এখন ভাড়া বাড়ানো হবে। কেউ থামাতে পারবে না।’’
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্যার কথায়ও সেই ইঙ্গিতই মিলল। তার দাবি, এখন আর কোনো গাড়ি গ্যাসে চলে না। যদি চলে তা শতকরা দুই ভাগের বেশি হবে না। তার মতে, ভাড়া বাড়ানো হয়েছে শুধু ডিজেল নয় আরো অনেক কিছু বিবেচনা করে।
তিনি বলেন, ‘‘আমাদের দেশে যতগুলো (বাস) গ্যাসে চলে সব কনভার্টেড। কনভার্শন এর পর যখন গ্যাসে চালানো হয়েছে তখন দেখা গেছে ছয় মাসের উপর ইঞ্চিন চলে না। পরে সব গাড়ি আবার ডিজেলে ফেরত গিয়েছে।’’
বড়জোর এক-দুই শতাংশ বাস গ্যাসচালিত থাকতে পারে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেগুলো এখন চিহ্নিত করা সম্ভব না।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোাজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ‘‘বাস মালিকরা ভাড়া বাড়ানোর একটি ইস্যু পেয়েছেন সেটা তারা ব্যবহার করেছেন। তারা গ্যাসের দাম বাড়লে বলেন অধিকাংশ গাড়ি গ্যাসে চলে। আর এখন বলছেন সব গাড়ি ডিজেলে চলে। বাস্তবতা হলো তারা এখন সব বাসের ভাড়াই বাড়িয়ে দিবেন। যাত্রীরা কয়েকদিন এটা নিয়ে প্রতিবাদ করবেন ৷ তারপর শেষ।’’
তিনি বলেন, ‘‘আমরা ২০১৫ সাল থেকে এই কারণে গ্যাস চালিত ও ডিজেল চালিত গাড়িতে আলাদা স্টিকার দাবি করছি৷ সেটা মানা হচ্ছে না।’’
তার মতে ভাড়া বাড়ানোর পুরো সিদ্ধান্তটিই অন্যায়ভাবে নেয়া হয়েছে। কারন করোনার সময় ৬০ ভাগ বাস ভাড়া বাড়ানো হয়েছে। সেই ভাড়া মাত্র ২৩ শতাংশ কমানো হয়েছে।
ক্যাবের এস এম নাজের হোসেন বলেন, ‘‘মাঝখানে সিটিং সার্ভিস করে ঢাকায় বাসে উঠলেই পাঁচ টাকা দেয়ার নিয়ম চালু করা হয়। এরপর সেটা করা হয় ১০ টাকা। এখন তো আর সিটিং সার্ভিস নাই৷ তার ওপর ওই ১০ টাকা এবার স্থায়ী করে দেয়া হয়েছে।’’ তিনি মনে করেন, ‘‘ডিজেলের দাম বাড়ানো ঠিক হয়নি। সরকারের ভর্তুকি দেয়া উচিত ছিলো। তাহলে বাস মালিকরা এই জিম্মি করার সুযোগ নিতে পারত না৷ পরিবহণ মালিকরা ডিজেলের দাম বাড়ানোর সুযোগ নিয়ে সরকারকে চাপে ফেলে তাদের ফায়দা লুটে নিয়েছে।’’
এদিকে ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান মালিকরা তাদের ধর্মঘট প্রত্যাহার করেননি। তাদের দাবি ডিজেলের দাম কমাতে হবে। বাংলাদেশ ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদের কার্যকরী সভাপতি রুস্তুম আলী খান বলেন, ‘‘বাসের তো কিলোমিটারের হিসাব আছে। আমাদের তো সেই হিসাব নাই। আমরা পণ্য পরিবহণ করি চুক্তিভিত্তিক। ফলে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হব। আমরা তাই চাই ডিজেলের দাম কমিয়ে আগের অবস্থায় নেয়া হোক।’’
সূত্র: ডয়চে ভেলে



