জীবনের গল্প খাঁচার গল্প

কিযী তাহিনন : এ জমিতে কেউ হয় জমিদার, কেউ বাউল। তলস্তয় কি বাউল ছিলেন? সেই বাউল, যে খুঁজত ফিরে আসার উঠোন? তিনি যে জমিদার ছিলেন না, আমি নিশ্চিত। অনেক অনেক জমি ছিল তার জানি, তবু তো তিনি জমিদার হলেন না। জমিদার হলে কি কেউ মরে যাওয়ার আগে হারিয়ে যায় সবার থেকে, অভিমানে? জমিদার হলে কেউ এমন গল্প লেখে, এমন প্রশ্ন কেউ করে, ‘একজন মানুষের কতটুকু জমি দরকার?’

আমাদের সব চাওয়া-পাওয়ার গল্প শুরু হয় জমিতে, শেষও তো ওই জমিতে। এই যে মধ্যদিনে যতটুকু জমে—পুঁজি, লোভ, শ্বাস, সাধ সবটুকু তো ওই অতটুকু জমির আকাঙ্ক্ষায়। যতটুকু জমি দেখা যায়, যতটুকু পাওয়া যায়। সে তো আমাদের মতো সাধারণ জনের গল্প, জমিদার হব বলে বড় হব একদিন, এমন চকচকে মানুষের গল্প। কিন্তু এই যে তলস্তয়, তিনিও কি জমি খোঁজেননি? এই যে বাউল মন, গেরুয়া তার রঙ, সে কি খোঁজেনি কিছু? মনজমিন? শত শত বছর ধরে এই যে বলে যাচ্ছে যুদ্ধ আর শান্তির গল্প, এমন গল্প যা আর কেউ বলেনি, সে কি এমনি এমনি? তার বদলে কিনে নিয়েছে ঠিকই আমাদের মনভূমি। সেখানে ঘর বানিয়ে সব জানালা খুলে আসনপিঁড়ি হয়ে বসে থাকেন তিনি। আমাদের মনজমিতে খুঁজে নিয়েছেন সেই উঠোন, যেখানে ফিরে আসা যায়। তিনি, যাকে আমরা বলি তলস্তয়।

তলস্তয় জমির গল্প লিখলেন। সেই যে কী সহজে সরলে বললেন পাহোম নামের সেই কৃষকের গল্প। যাকে বলা হলো, ‘যতদূর দৌড়ে যেতে পারবে তত জমি তোমার। শর্ত, দিন শেষের আগে ফিরে আসতে হবে।’ অনেক অনেক পথ দৌড়েছিল পাহোম, ফেরার কথা ভুলেই গিয়েছিল। যখন মনে পড়ল, বড্ড দেরি হলো। ততক্ষণে শেষ হয়ে গেল দিন, জীবনের কাছে পাহোমের সব ঋণ। পাহোম মরে গেল।

আহা, পাহোম, ফিরে আসতে ভুলে গিয়েছিল। যেমন করে আমরা ফিরে আসতে ভুলে যাই। মরে যাই। এ গল্প কি শুধু জমিলোভী এক কৃষকের গল্প? আমাদের গল্প না? আমার তো নিজেকে একদম পাহোম মনে হয়, বড্ড বেচারা, বন্দি। ছুটছি ছুটছি, ভাবছি ওই যে সোনা আলো, এখনো কতদিন বাকি। ফিরে আসতে ভুলে যাই। যখন ফিরছি তখন সময়টা ভুল, তখন আর সময় আমার নেই।

গল্পটা পড়লে আমার শওকত আপার কথা মনে পড়ে। স্কুলে ব্যাকরণ শেখাতেন। বলতেন, ‘আমাদের অভাব কিন্তু কম, অভাববোধ বড্ড বেশি।’ সে সময়ে এ কথার অর্থ কী বুঝলাম কে জানে? কিন্তু মনে থেকে গেল। আর বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে অর্থনীতি পড়তে গিয়ে দেখি সেই একই কথা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আকাশ-বাতাস ক্লাসরুমে যা শিখলাম, তা ওই একই—‘অভাব আর অভাববোধের মিলমিশ’—সে মেলাতে গিয়ে হিমশিম সবকিছু। কত তত্ত্ব, নীতি, কত চাহিদা জোগানের আঁকাবাঁকা রেখা আঁকা শিখলাম। কিন্তু অভাববোধের লেজ টেনে ধরতে পারলাম কই, সে ছুটছে। আর সেই লেজ ধরে আমি আর আমরা। নিজেকে কেমন পাহোম মনে হতে থাকে।

বাউল তলস্তয় কেমন করে আমাদের গল্প লিখে গেলেন। যারা ফিরে আসতে জানে না তাদের গল্প লিখলেন। যারা থামতে জানে না তাদের গল্প লিখলেন। সেই চিনিমাখা জীবনকে আঙুল তুলে দেখালেন, যেখানে পাহোমের মতো করে আমরা বাঁচি, অনেক অনেক দৌড়াব বলে। যত দৌড় তত লাভ। যত লাভ তত ক্ষমতা। ফিসফিস করে আর চিত্কার করে আমাদের সারাক্ষণ তারা বলে, ‘দৌড়াও দৌড়াও, যতদূর পারো তত। তার চেয়েও বেশি। অনেক জমি দরকার আমাদের, অনেক জমি। বাঁচতে হলে জমি চাই, মরতে গেলে জমি চাই, ভালোবাসতেও। থেমো না।’ আমাদের আর ফিরে আসা হয় না, আমাদের থামা হয় না।

যিনি থামতে জানেন তিনিই তো শিল্পী। তিনি আমাদের মতো সাধারণ নন। তিনি তলস্তয়, শিল্পী। যিনি বছর বছর ধরে ‘যুদ্ধ আর শান্তি’র আখ্যান লেখেন। কোনো তাড়া নেই। ফিরে আসতে জানেন। মানবজমিনে বাগান করে বেঁচে থাকেন ফুলে ফলে পাতায় পাতায়। আর আমরা যারা থামি না, তারা দৌড়াতে দৌড়াতে ভাবি পেয়ে গেছি, ফিরে আসি ভুল সময়ে আর আমরা বারবার মরে যাই।

তাই কৃষক পাহোমের এ গল্প শুধু জমির গল্প নয় কিন্তু। শুধু লোভের গল্প নয়। এটি জীবনের গল্প, খাঁচার গল্প। ক্ষমতার গল্প। সে জীবনধারার গল্প, যেখানে ক্ষমতাই শক্তি। যতটুকু পেতে পারো ততটুকুই ক্ষমতা। এ গল্প আমাদের চারপাশে আরো অনেকের গল্প মনে করিয়ে দেয়। ওই যে আমাদের এলাকার নূরা পাগলা ছিল, তার কথা মনে করিয়ে দেয়। সব এলাকাতেই এক নূরা পাগলা থাকে। আমাদেরও ছিল। নেংটি পরে ঘুরে বেড়ায় নূরা পাগলা। আর এই গাছ ওই গাছে চড়ে, ফল পেড়ে খায়।

রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়া সুখী মানুষেরা বলে, ‘কী রে নূরা পাগলা কী করিস?’

নূরা পাগলা এক হাতে জাপটে গাছ ধরে থাকে, আর আরেক হাত দিয়ে দাঁতের ভেতরের গর্তে আটকে থাকা পেয়ারার বিচি বের করতে করতে বলে, ‘আমার জীবনে দুইটাই শখ, ভালো কাপড়-জামা পরব, আর ফলফ্রুট খাব।’

আর ঘন তাপের দিন শেষে যখন আকাশভাঙা বৃষ্টি নামে, নেংটি পরা নূরা পাগলার আনন্দ দেখে কে। সেদিন সে সব কাজ ফেলে থেমে যেত। জানালার ওপাশে তুমুল বৃষ্টি আর মাটির তৈরি এক ময়ূরের মতো কাদামাখা নূরা পাগলা নাচে। বৃষ্টির জলফোঁটায় ভেজে। তাকে তখন দেখলে মনে হয়, অসুখ কেমন নূরা পাগলা জানে না। তবু জানালার এপাশে যারা থাকে, বৃষ্টির দিনে ডালের বড়া খেতে খেতে তারা ভাবে, ‘নূরা পাগলার মতো অসুখে আর কে আছে?’

এই যেখানে কাঁটাতারের এপার আর ওপার—সুখ আর অসুখের বাস, আর না থামতে পারার অক্ষমতা নিঃশ্বাসে নিঃশ্বাসে, সেই করুণ পৃথিবীতেই বাস করে কৃষক পাহোমেরা, আমরা। তলস্তয় বলে গেলেন, ‘পৃথিবীর প্রতিটি সুখী পরিবার একই রকমভাবে সুখী, প্রতিটি অসুখী পরিবার নিজের নিজের ধরনে অসুখী।’ কিন্তু তলস্তয় কি জানতেন, তার ফেলে যাওয়া এ পৃথিবীতে আজও সুখের একটাই সূত্র—ক্ষমতা। যতটুকু পাওয়া যায় ততটুকু সুখ, তাতেই ক্ষমতা। কত শত বছর আগে বোকা পাহোমের গল্প বলে গেলেন। জেনে গেলেন না যে এই পুরো পৃথিবীতে বাস করে আজও সেই পাহোমেরা। তারা শুধু ছুটছে ছুটছে, কেউ বলছে না তাদের একটু থামো। আমরা জানি না কেমন করে থামতে হয়। কখন থামতে হয়। নূরা পাগলাকে অসুখী জানলে আমরা সুখী হই। আমাদের সুখে শর্ত অনেক, আছে জমির অনেক হিসাবনিকাশ। আমরা সুখের জন্য জমি খুঁজি, দৌড়াতে দৌড়াতে বাঁচি, মরব বলে।

তবু বাউল আসেন, আসেন শিল্পী, আমাদের পাহোমের গল্প বলে যান। লোভের গল্প বলে যান, লাভের গল্প বলে যান। এই যে জমির নকশা কাটা দাগ গুনে গুনে যে লেজওয়ালা অভাববোধের পিছে আমরা ছুটি, তার গল্প বলেন। তারা গুনগুন করে যান ‘এমন মানব-জমিন রইল পতিত আবাদ করলে ফলত সোনা।’ আমরা তাদের আবছা শুনতে পাই। স্পষ্ট শুনতে পাই না, চাইও না। আমাদের অনেক দৌড়াতে হবে, যতটুকু দেখা যায় ততটুকু আমাদের চাই, সব। সময় অল্প। কেমন করে থামতে হয় আমরা জানি না। তাই আমাদের শিল্পী হওয়া হয় না। এ জলহীন খরার পৃথিবীতে, আমাদের মনজমিনে ফুল ফোটে না। আমাদের ফিরে আসার কোনো উঠোন নেই। আমরা পাহোম হয়ে বাঁচি, পাহোম হয়ে মরি, না পাই জমি, না পাই জীবন।

যতদিন আমাদের এমন জমির জীবন, ততদিন তুমি বলে যেও পাহোমের গল্প। তোমাকে চাই বাউল, এই বিভ্রান্তিতে তোমাকে চাই। যতদিন আমরা থামতে না পারি, যতদিন আমরা স্পষ্ট শুনতে না পাই, তুমি প্রশ্ন করে যেও বারবার, অনেকবার, ‘একজন মানুষের কতটুকু জমির প্রয়োজন?’

কিযী তাহিনন: গল্পকার

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button