গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়া থেকে সাইনবোর্ড, ডেমরা, বনশ্রী, আফতাবনগর, পূর্বাচল, মীরেরবাজার, পূবাইল হয়ে কাপাসিয়া পর্যন্ত ৭৭ কিলোমিটার দীর্ঘ দেশের দ্বিতীয় বিআরটি প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পন্ন করা হয়েছে। সমীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে বিআরটির খরচ তুলে আনতে আবাসন ও জমির ব্যবসার কথা। সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় একই করিডোরে বিআরটির পাশাপাশি এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের প্রস্তাবও দেয়া হয়েছে।
আগেই কিনে রাখা হবে প্রস্তাবিত বাসভিত্তিক গণপরিবহন ব্যবস্থা বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) করিডোর-সংলগ্ন জমি। নির্মাণের পর যখন জমির দাম কয়েক গুণ বেড়ে যাবে, তখন কিনে রাখা জমি বিক্রি করে তুলে আনা হবে নির্মাণ ব্যয়। একইভাবে ব্যক্তিগত জমিতে বহুতল ভবন বানিয়েও লাভের টাকা দিয়ে তোলা হবে বিআরটির খরচ। নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-গাজীপুরের মধ্যে নির্মিতব্য দেশের দ্বিতীয় বিআরটি প্রকল্পের অর্থায়ন নিয়ে এমন প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। জমি কেনাবেচার সুবিধার জন্য প্রকল্পটি রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে (রাজউক) দিয়ে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি যুক্ত করার পরামর্শ দেয়া হয়েছে সিটি করপোরেশনকেও।
সমীক্ষা অনুযায়ী, এক্সপ্রেসওয়েটি নির্মাণে খরচ হবে ২৬ হাজার কোটি টাকা। আর বিআরটি করিডোরটি তৈরি করতে খরচ হবে ৮ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। বিআরটি ও এক্সপ্রেসওয়ের জন্য বিনিয়োগ করা টাকা তুলে আনা হবে পাঁচটি পদ্ধতিতে।
প্রথম পদ্ধতিটি হলো জমির ব্যবসা। সমীক্ষায় বলা হয়েছে, প্রস্তাবিত বিআরটি করিডোরটি যে গতিপথে তৈরি হবে, অবকাঠামো উন্নয়নের আগেই সেই গতিপথ বরাবর জমি কিনে রাখা হবে। এক্সপ্রেসওয়ে ও বিআরটি তৈরির পর এই জমির দাম বেড়ে যাবে অন্তত পাঁচ গুণ। তখন কিনে রাখা জমি বিক্রি করে দেয়া হবে। সমীক্ষা অনুযায়ী, নির্মাণের আগেই প্রস্তাবিত বিআরটির গতিপথ বরাবর জমি কিনতে খরচ হবে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা। বিআরটি ও এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের পর এসব জমির দাম বেড়ে দাঁড়াবে ৪ হাজার ১১৮ কোটি টাকায়। শুধু জমির ব্যবসা করেই প্রায় ২ হাজার ৬০০ কোটি টাকা তুলে আনা সম্ভব হবে। জমির ব্যবসার এ পদ্ধতিকে ‘ল্যান্ড ব্যাংকিং’ নামে অভিহিত করা হচ্ছে।
প্রস্তাবিত বিআরটির নির্মাণ ব্যয় তুলে আনার দ্বিতীয় পদ্ধতিটি অনেকটা আবাসন ব্যবসার মতো। পদ্ধতিটিকে ‘ল্যান্ড পুলিং’ হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে। এ পদ্ধতিতে প্রস্তাবিত বিআরটি করিডোর এলাকায় ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিতে বহুতল ভবন নির্মাণ করবে রাজউক ও সিটি করপোরেশন। বহুতল ভবনের লভ্যাংশ জমির মালিকের সঙ্গে ভাগাভাগি করে তুলে আনা হবে বিআরটি ও এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণ ব্যয়।
একইভাবে বিআরটি করিডোরের এক কিলোমিটারের মধ্যে নির্মিতব্য অবকাঠামো থেকে রাজস্ব আদায় করেও তোলা হবে প্রকল্পের নির্মাণ ব্যয়। রাজউক যখন এসব এলাকায় ভবন নির্মাণের অনুমোদন দেবে তখনই ‘রাজস্ব’ বাবদ আদায় করা হবে অর্থ। দুই ধরনের রাজস্ব নির্ধারণ করা হবে। করিডোরের আশপাশে নির্মিতব্য ভবনগুলোর রাজস্ব তুলনামূলক দূরের ভবনের চেয়ে বেশি হবে।
এসবের বাইরে এক্সপ্রেসওয়ে থেকে প্রাপ্ত টোল এবং যাত্রীদের কাছ থেকে ভাড়া আদায়ের মাধ্যমে নির্মাণ ব্যয় তুলে আনার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে সম্ভাব্যতা সমীক্ষায়।
মেট্রোরেলের (এমআরটি লাইন-১ ও ৫) উদাহরণ দিয়ে প্রস্তাবিত বিআরটি প্রকল্পের সমীক্ষায় বলা হয়েছে, ২০৩৫ সাল নাগাদ স্টেশনসংলগ্ন জমির দাম বেড়ে দাঁড়াবে প্রায় ২ হাজার ২০০ কোটি ডলার। কিন্তু এই টাকার মাত্র ৪ শতাংশ জমির ট্যাক্স ও চার্জ বাবদ পাবে সরকার। ৯৬ শতাংশ অর্থই চলে যাবে জমি মালিকদের কাছে। এমন পরিপ্রেক্ষিতে বিআরটি প্রকল্পে জমি আগে কিনে রেখে পরে বিক্রি করার মাধ্যমে সরকার লাভবান হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে সমীক্ষায়।
২০২৪ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে ধাপে ধাপে বিআরটি ও এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হয়েছে সম্ভাব্যতা সমীক্ষায়।
প্রস্তাবিত বিআরটি করিডোরটি গড়ে তোলা হবে এক্সপ্রেসওয়ের মাঝবরাবর। মাঝখানে তৈরি করা হবে দুই লেনের বিআরটি করিডোর। এর দুই পাশে করা হবে তিনটি করে ছয়টি লেনের এক্সপ্রেসওয়ে। সব মিলিয়ে ২১ মিটার চওড়া হবে এই এক্সপ্রেসওয়ে। এক্সপ্রেসওয়ের দুই পাশে ধীরগতির যান চলাচলের জন্য রাখা হবে আরো দুটি লেন। সঙ্গে দুই পাশে পথচারীদের জন্য নির্মাণ করা হবে আড়াই মিটার চওড়া ফুটপাত। এক্সপ্রেসওয়ে ও বিআরটিতে প্রতি ঘণ্টায় ৩০ হাজার যাত্রী পরিবহন করা সম্ভব হবে।
যদিও এক্সপ্রেসওয়ে এবং বিআরটির এ পরিকল্পনাগুলো একেবারে প্রাথমিক অবস্থায় থাকার কথা জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব নজরুল ইসলাম। তিনি বলেন, এখনো কোনো গতিপথ চূড়ান্ত করা হয়নি। যে সমীক্ষাটি করা হয়েছে, তার ভিত্তিতে মতামত নেয়া হচ্ছে। গতিপথ নিয়ে আরো পর্যালোচনার প্রয়োজন আছে বলে জানান তিনি।
প্রসঙ্গত, ঢাকার বিমানবন্দর থেকে জয়দেবপুর পর্যন্ত নির্মাণ করা হচ্ছে দেশের প্রথম বাসভিত্তিক পরিবহন ব্যবস্থা বিআরটি। এখন পর্যন্ত ৪ হাজার ২৬৮ কোটি টাকা খরচ হচ্ছে প্রকল্পটিতে। আগামী বছর বিমানবন্দর-জয়দেবপুর বিআরটি চালুর লক্ষ্য রয়েছে সরকারের। বিআরটির জন্য সড়কে বাসের জন্য বিশেষায়িত লেন করে নির্দিষ্টসংখ্যক বাস পরিচালনা করা হয়। সুনির্দিষ্ট লেনে থাকায় কোনো ধরনের যানজট ছাড়াই চলতে পারে বিআরটি করিডোরের বাস।
সূত্র: বণিক বার্তা