গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর আগে থেকেই বাড়তে থাকা চালের দাম লাগামহীন হয়ে পড়েছে। অথচ ভরা মৌসুমে চালের সরবরাহ থাকে সবচেয়ে বেশি। কিন্তু ভরা মৌসুমেই প্রতিদিন হু হু করে বাড়তে থাকে সব ধরনের চালের দর। পণ্যটির সরবরাহে কোনো সংকটও নেই। তারপরও বাজারে অস্থিরতা।
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির অজুহাতে খরচ যতোটা বেড়েছে, তার চেয়ে অনেক বেশি দাম বেড়েছে বাজারে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর প্রতি কেজিতে চালের দাম বেড়েছে ৫ থেকে ৭ টাকা। অথচ পরিবহন ব্যয়বৃদ্ধির হিসাবে চালের দাম বাড়ার কথা কেজিপ্রতি সর্বোচ্চ ৫০ পয়সা। গরিব মানুষ এখন ৬০ টাকার নিচে কোনো চাল কিনতে পারছে না। মোটা চালের কেজি এখন এতোটাই বেশি যে, ২ বছর আগেও ছিল ৩০ টাকা।
ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ-এর (টিসিবি) পণ্যমূল্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, এক মাসের ব্যবধানে চালের দাম বেড়েছে ১৫ শতাংশ। এভাবে চালসহ নিত্যপণ্যের দাম বাড়ায় দিশাহারা হয়ে পড়েছেন মধ্য ও নিম্নআয়ের মানুষ। চালের পাশাপাশি সপ্তাহের ব্যবধানে বেড়েছে খোলা আটার দাম। প্রতিকেজি বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৫৫ টাকায়। গত সপ্তাহে ছিল ৪৫-৫০ টাকা। চিনি প্রতিকেজি ৯৫ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। রাজধানীর কাওরান বাজারসহ বিভিন্ন বাজার ঘুরে এবং ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে। বাজারে চালের দাম বাড়তে থাকায় সরকার আমদানির অনুমতি দিয়েছে। তবে ডলার সংকটের কারণে আমদানিতেও গতি নেই। বাড়তি দামে এখন বড় চালানে চাল আমদানি করতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা।
দাম বৃদ্ধির জন্য খুচরা ও পাইকারি ব্যবসায়ীরা জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি দায়ী করছেন মিল মালিকদের কারসাজিকে। আর মিল মালিকদের অজুহাত, লোডশেডিংয়ের কারণে ডিজেল দিয়ে চালকল চালু রাখায় খরচ বাড়ছে। আর হাটে ধানের সরবরাহ কম। তবে ট্রাক মালিকদের দাবি, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির তুলনায় চালের দাম কয়েক গুণ বেশি বেড়েছে। কয়েকটি বাজার ঘুরে দেখা গেছে, যুক্তিসঙ্গত কোনো কারণ ছাড়াই প্রতিদিন বাড়ছে মোটা, সরু সব ধরনের চালের দাম। মানভেদে প্রতিকেজি চালের দাম পাইকারিতে ৩ থেকে ৪ টাকা এবং খুচরা বাজারে ৫ থেকে ৬ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। কয়েক হাত ঘুরে এই চাল কিনতে খুচরা ক্রেতারা রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন। সপ্তাহের ব্যবধানে খুচরায় গত সপ্তাহে প্রতিকেজি মোটা চাল বি-২৮ এর দাম ছিল ৫৫-৫৮ টাকা, এখন বিক্রি করা হচ্ছে ৬০ টাকায়। সরকারি বিপণন সংস্থা টিসিবি’র তথ্য অনুযায়ী, মোটা চালের দাম কেজিতে বেড়েছে ৬ শতাংশেরও বেশি। চিকন চাল মিনিকেট ৭৫ থেকে ৮০ টাকায় এবং নাজিরশাইল প্রতি কেজি ৮০ থেকে ৯০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। শুধু চালই নয়, বেড়েছে ময়দা, সয়াবিন, ডাল ব্রয়লার মুরগি, লবণসহ বেশ কয়েকটি পণ্যের দাম। সিন্ডিকেটকে দায়ী করে নিজের ক্ষোভ ঝাড়ছেন ক্রেতারা। রাজধানীর মধুবাগ বাজারে মুদি ব্যবসায়ী সাব্বির বলেন, দাম বেড়ে এখন প্রতি কেজি মোটা চাল বি-২৮ বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকায়, চিকন চাল মিনিকেট ৭৫ থেকে ৮০ টাকায় এবং নাজিরশাইল প্রতিকেজি বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ৯০ টাকায়। তবে সুপার সপ স্বপ্নে মোটা চাল এখনো ২ টাকা কমে ৫৮ টাকা কেজিতে পাওয়া যাচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, চালের বাজারে অসাধু ব্যবসায়ীদের অপতৎপরতা বন্ধ করা কি খুবই কঠিন? এক বছরেরও বেশি সময় চালের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। বাজারে সরকারের তদারকি বাড়ানোর দাবি সাধারণ মানুষের। সঙ্গে যারা কারসাজিতে শনাক্ত, তাদেরও শাস্তির আওতায় আনার তাগিদ তাদের।
সূত্র জানায়, দাম নিয়ন্ত্রণে চাল আমদানিতে আরোপিতে কর ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করার চিন্তা চলছে। খুব শিগগিরই এ বিষয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) প্রজ্ঞাপন জারি করতে পারে। বাজারে গত সপ্তাহের তুলনায় বেড়েছে গরু ও মুরগির মাংসের দাম। এক কেজি গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে ৭০০ টাকায়। যা গত সপ্তাহে ছিল ৬৮০ টাকা। অন্যদিকে ২০ টাকা বেড়ে বাজারে প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে ১৮০ টাকায়। টিসিবি’র তথ্য বলছে, গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে ব্রয়লার মুরগির দাম বেড়েছে ১১ শতাংশের মতো। ক্রেতারা বলছেন, প্রতি কেজি ৬২ টাকার নিচে ময়দা পাওয়া যাচ্ছে না। গত সপ্তাহে যে খোলা ময়দার কেজি ছিল ৬০ টাকা। টিসিবি’র তথ্য অনুযায়ী, গত এক সপ্তাহে ময়দার দাম বেড়েছে ২ শতাংশের বেশি। এদিকে বাজারে নতুন সবজি হিসেবে শিম ও ফুলকপি এলেও তা দাম চড়া। এক পোয়া (২৫০ গ্রাম) শিম বিক্রি হচ্ছে ৪০ টাকা দরে। এক কেজি নিলে ১৫০ টাকা রাখা হচ্ছে। এক সপ্তাহ আগে শিমের কেজি ১৯০ টাকা ছিল। নতুন আসা ছোট ফুলকপির পিস বিক্রি হচ্ছে ৩০-৪০ টাকা। এক কেজি পাকা টমেটো বিক্রি বিক্রি হচ্ছে ১৩০ টাকায়।
গাজর বিক্রি হচ্ছে ১২০ থেকে ১৩০ টাকা কেজি। বরবটির কেজি বিক্রি হচ্ছে ৭০ থেকে ৮০ টাকা। চিনিসহ নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় শিল্প মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির বৈঠকে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন সংসদ সদস্যরা।
বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত বৈঠকে একাধিক সদস্য এ বিষয়ে কথা বলেন। সেখানে তারা ক্ষোভ প্রকাশ করেন বলে সূত্র জানিয়েছে। সরকারি সংস্থা টিসিবি’র হিসাবে, গত এক মাসে চিনির দাম বেড়েছে কেজিতে ৮ টাকা। শিল্প মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির বৈঠকের একটি আলোচ্য সূচি ছিল চিনিশিল্পের সর্বশেষ অবস্থা নিয়ে আলোচনা। এদিকে বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে এক বৈঠক শেষে খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার বলেন, আগামী ১লা সেপ্টেম্বর দেশব্যাপী ওএমএস (খোলা বাজারে বিক্রি) ও খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় কম দামে চাল বিক্রি কার্যক্রম চালু হলে দাম আরও কমবে।
বাংলাদেশ অটো মেজর হাসকিং মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. তৌফিকুল ইসলাম বাবু বলেন, চালের বাজারের অস্থিরতার জন্য পুরো দায় মিলারদের ওপর দেয়া যাবে না।
এখানে কিন্তু দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা জড়িত। জ্বালানি তেলের দাম জড়িত। সবকিছুই জড়িত।
বাবুবাজার চাল ব্যবসায়ী সমিতির সেক্রেটারি নিজাম উদ্দিন বলেন, এ বছর বোরোতে উৎপাদন অনেক কম হয়েছে। সেজন্য সরকার ভারত থেকে চাল আমদানির অনুমতি দিয়েছে। কিন্তু বাজারে ভারতের চাল এখনো আসেনি। এ পর্যন্ত যা এসেছে তা মিল মালিকদের কাছে আছে।
কনজ্যুমার এসোসিয়েশনের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, আমাদের দেশের ব্যবসায়ীরা যখন আন্তর্জাতিক বাজারে বাড়ে তখন সঙ্গে সঙ্গে দেশের বাজারেও বাড়িয়ে দেন। কিন্তু যখন কমে তখন নানা অজুহাতে বাড়তি দাম ধরে রাখেন। সঙ্গে যোগ হয়েছে ডলারের বাড়তি দামের অজুহাত। যদিও ডলার এখন কিছুটা সহনীয় অবস্থায় রয়েছে। কিন্তু ডলারের দাম কম হলেও মনে হয় না দাম সহসাই কমবে।