পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্প: আবাসন নয়, জমির সবচেয়ে বড় বাজার তৈরি করেছে রাজউক!

পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্প: আবাসন নয়, জমির সবচেয়ে বড় বাজার তৈরি করেছে রাজউক!

গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : রাজধানী ঢাকার আবাসন সমস্যা সমাধানে আড়াই দশক আগে পূর্বাচলে ‘নতুন শহর প্রকল্প’ হাতে নিয়েছিল রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। প্রকল্পটি হাতে নেয়ার সময় বলা হয়েছিল, রাজধানীর মধ্যবিত্তের আবাসন সংকট সমাধানে বড় ভূমিকা রাখতে যাচ্ছে প্রকল্পটি। যদিও এখন পর্যন্ত ক্রমবর্ধমান নাগরিক চাপে বিপর্যস্ত ঢাকার আবাসন সমস্যা সমাধানে কোনো কাজেই আসেনি পূর্বাচল। বরং এখানকার বরাদ্দকৃত জমি অনেকের জন্যই খুলে দিয়েছে রাতারাতি বিত্তশালী হওয়ার পথ।

রাজউকের পূর্বাচল প্রকল্পটিকে এখন দেশের জমির সবচেয়ে বড় বাজার হিসেবে দেখছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা। তাদের ভাষ্যমতে, রাজউক এখানকার জমি অধিগ্রহণ করেছিল কাঠাপ্রতি সাড়ে ১৪ হাজার টাকারও কম মূল্যে। এরপর সে জমি বরাদ্দে তখন গ্রাহকদের কাছ থেকে নেয়া হয়েছিল দেড় লাখ টাকা করে। প্রতিবার মালিকানা বদলের পর এখানকার জমির দাম বাড়ছে কয়েক গুণ করে। বর্তমানে পূর্বাচলে জমির কাঠাপ্রতি গড় দাম দাঁড়িয়েছে ১ কোটি টাকার বেশিতে।

দাম বাড়তে বাড়তে এখন জমি কেনাবেচার এক রমরমা বাজারে রূপ নিয়েছে পূর্বাচল। এখানকার প্লট মালিকদের মধ্যে পূর্বাচলে আবাসন তৈরির চেয়ে জমি বিক্রির প্রবণতাই দেখা যাচ্ছে বেশি। সেভাবে আবাসন গড়ে না উঠলেও একেক জমি কয়েকবার হাতবদলের ঘটনাও ঘটেছে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, পূর্বাচলে প্লট কেনার পর জমির মালিকরা কিছুদিন অপেক্ষা করেন। এর মধ্যে প্লটের দাম কয়েক গুণ বাড়িয়ে তা আবার বিক্রি করে দিচ্ছেন তারা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এসব প্লট ক্রয়মূল্যের চেয়ে ১৫-২০ গুণ বেশি দামে বিক্রি করে দেয়ার নজিরও পাওয়া যায়।

এখানকার প্লট মালিক ও কয়েকজন জমি কেনাবেচায় মধ্যস্থতাকারীর ভাষ্যমতে, নতুন শহরে আবাসন গড়ে না ওঠার বড় কারণ জমির উচ্চমূল্য। হাত বদল হলেই জমির দাম কয়েক গুণ বেড়ে যাচ্ছে। এমনকি এখানে সব ধরনের নাগরিক সুবিধাও যদি নিশ্চিত করা যায়, তার পরেও অদূরভবিষ্যতে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় আবাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলা যাবে না শুধু জমির উচ্চমূল্যের কারণে। বরং জমি কেনাবেচার মাধ্যমেই একটি শ্রেণী ক্রমাগত লাভবান হতে থাকবে।

কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল বাংলাদেশের (সিএজি) পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পসংক্রান্ত এক নিরীক্ষা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটির জন্য রাজউক মোট জমি অধিগ্রহণ করেছে ৬ হাজার ২১৩ দশমিক ৫৫ একর (১ একরে ৬০ দশমিক ৫ কাঠা)। জমি অধিগ্রহণ বাবদ রাজউককে পরিশোধ করতে হয়েছে ৫২৪ কোটি ৭৫ লাখ ৪৪ হাজার টাকা। রাজউকের অধিগ্রহণ মূল্য পড়েছে একরপ্রতি ৮ লাখ ৭৩ হাজার ৫০১ টাকা। সে অনুযায়ী, প্রতি কাঠা জমি অধিগ্রহণে রাজউককে মূল্য পরিশোধ করতে হয়েছে গড়ে ১৪ হাজার ৪৩৮ টাকা।

নতুন শহর এলাকায় সরেজমিন পরিদর্শন ও প্লট মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এখানে এখন কাঠাপ্রতি গড় দাম ১ কোটি টাকা। সে হিসেবে রাজউকের অধিগ্রহণের পর এখানকার জমির দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭০০ গুণে।

পূর্বাচল নতুন শহরে ১৩ নম্বর সেক্টরে পাঁচ কাঠার প্লট পেয়েছেন আমজাদ আলী। তিনি বলেন, ‘আমরা ছিলাম এখানকার স্থানীয় অধিবাসী। অধিগ্রহণের সময় ৪০ বিঘা জমির বিনিময়ে একটি প্লট পেয়েছি। যদিও এখানে বাড়ি করার সামর্থ্য নেই। এখন বিক্রি করলে প্লটটি অন্তত সাড়ে ৫ কোটি টাকায় বিক্রি করতে পারব। আরেকটু বেশি দাম উঠলেই প্লট বিক্রি করে অন্যত্র গিয়ে বাড়ি করব।’

পূর্বাচল প্রকল্পটি এখন বিশেষ একটি শ্রেণীর টাকা বানানোর মেশিনে পরিণত হয়েছে বলে মনে করছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) নগর ও আঞ্চলিক পরিকল্পনা (ইউআরপি) বিভাগের অধ্যাপক ড. ইশরাত ইসলাম। তিনি বলেন ‘রাজউক এ জমি বিক্রি করেছে আড়াই লাখ টাকায়। এখন এর দাম উঠেছে কোটি টাকায়। এখানে রাজউক বা যারা আদি নিবাসী তারা কেউই লাভবান হলো না। লাভবান হয়েছে তৃতীয় পক্ষ। এ তৃতীয় পক্ষের টাকার মেশিন তৈরির জন্যই কি রাজউকের এত কর্মযজ্ঞ? উচ্চবিত্তরা তো বাজার থেকেই উচ্চমূল্যে আবাসন কিনতে পারে। এখন রাজউকও যদি উচ্চবিত্তদের কথা ভেবে পরিকল্পনা করে তাহলে বাকিরা কোথায় যাবে?’

আবাসন খাতের ব্যবসায়ীরাও পূর্বাচল জমির বড় বাজার হয়ে ওঠার পেছনে রাজউককেই দায় দিচ্ছেন সবচেয়ে বেশি। আবাসন খাতের ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) সভাপতি আলমগীর শামসুল আলামিন কাজল বলেন, ‘পূর্বাচলে জমির কাঠা এখন কোটির আশপাশে। কোনো সন্দেহ নেই এ অস্বাভাবিক বাজার রাজউক সৃষ্টি করেছে। রাজউক মাথাপ্রতি একটি করে প্লট বরাদ্দ দিয়েই ভুল করেছে। তারা যদি নিবন্ধিত ডেভেলপারদের কাছে প্লট বুঝিয়ে দিত, তাহলে একটি প্লটে অনেকের আবাসন সমস্যার সমাধান হতো।’

পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্প থেকে সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়েছেন সরকারি কর্মকর্তারা। পূর্বাচলের প্লট বরাদ্দ তাদের আর্থিকভাবে অভাবনীয় মাত্রায় লাভবান হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। সারা জীবন চাকরির পর পেনশন হিসেবে মোট যে পরিমাণ অর্থ তাদের প্রাপ্য হতো, তার চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণ অর্থ তারা আয় করে নিচ্ছেন শুধু পূর্বাচলের প্লট বিক্রি করে।

পূর্বাচলে প্লট মালিক এমন এক সরকারি কর্মকর্তার তথ্য পাওয়া যায়, যিনি তিন কাঠার একটি প্লট বরাদ্দ পেতে কাঠাপ্রতি জমির মূল্য পরিশোধ করেছিলেন দেড় লাখ টাকা করে। বর্তমানে তার জমির দাম দাঁড়িয়েছে ৩ কোটি ২০ লাখ টাকায়। গুলশানে তার আরো দুটি ফ্ল্যাট রয়েছে। পূর্বাচলের জমিটি বিক্রির সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি।

আরেক ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তার তথ্য পাওয়া যায়, যিনি পূর্বাচলে প্লট বরাদ্দ পেয়েছিলেন লটারিতে। জমি বরাদ্দ পেতে তাকে মূল্য পরিশোধ করতে হয়েছিল দেড় লাখ টাকা। এরপর জমির ইজারা দলিল হাতে পাওয়া পর্যন্ত তার ব্যয় হয়েছে ১৫ লাখ টাকা। বছর পাঁচেক আগে পূর্বাচল ১৭ নম্বর সেক্টরের প্লটটি কাঠাপ্রতি ৫০ লাখ টাকা দরে মোট আড়াই কোটি টাকায় বিক্রি করেছেন তিনি। পূর্বাচলে এ ধরনের একটি পাঁচ কাঠা প্লটের জমি এখন ওই সময়ের দ্বিগুণ দামে কেনাবেচা হচ্ছে।

রাজউকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রথম পর্যায়ের লটারিতে পূর্বাচলের প্লট সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ পেয়েছিলেন সরকারি কর্মকর্তারা। তাদের প্লট বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল ১ হাজার ৬৩২টি। এছাড়া স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার চাকরিজীবীদের ৬৫৪টি, ব্যবসায়ী ও শিল্পপতি কোটায় ৪৭২, বেসরকারি চাকরিজীবীদের ৫৯১, প্রবাসী কোটায় ৫৯১, মুক্তিযোদ্ধা কোটায় ২৯৬, সচিব কোটায় ২৪, আইনজীবী কোটায় ১১০, বিচারপতি কোটায় ১৪, সংসদ সদস্য কোটায় ৫৭, অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কোটায় ৫৭, অন্যান্য কোটায় ১৮১, শিল্পী কোটায় ১৫১ ও সাংবাদিক কোটায় ৫৫টি প্লট বরাদ্দ দেয়া হয়। এছাড়া রাজউক কর্মকর্তা, সংরক্ষিত ও প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্যও প্লট বরাদ্দ দেয়া হয়। লটারির পরও বিভিন্ন সময় পূর্বাচলের প্লট বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। প্রথম বরাদ্দের পর থেকে এ পর্যন্ত জমি কেনাবেচার মাধ্যমে প্রচুর প্লটের মালিকানা বদল হয়েছে।

পূর্বাচলে রাজউকের প্লটভিত্তিক প্রকল্প আবাসন সংকট সমাধানের পরিবর্তে জমির দাম বাড়িয়ে মালিকদের বিত্তবান হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইউআরপি বিভাগের অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান। তিনি বলেন, ‘রাজউকের উচিত ছিল প্লট বিক্রি না করে ফ্ল্যাট বানিয়ে তা বিক্রি করা। তাহলে আবাসন সমস্যা সমাধানে এ প্রকল্প কিছুটা হলেও কাজে লাগত। কিন্তু রাজউক তা না করে প্লট বরাদ্দ দিচ্ছে। এখন এসব প্লটের ক্রেতারা পরিশ্রম ছাড়াই কোটিপতি বনে যাচ্ছেন। এটি সম্পূর্ণভাবে আইনের শাসন ও ন্যায্যতাবিরোধী কার্যক্রম। বিষয়টিকে এখন অনেকটা জুয়া খেলার সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। কারণ লটারিতে ভাগ্যগুণে প্লট পেলেই কোটিপতি হওয়া যায়। রাজউকের কাজ মানুষকে জুয়ার পদ্ধতিতে ধনী করা নয়।’

শুরু থেকে পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্প নিয়ে বিতর্ক উঠেছে অনেক। প্রকল্পটির কাজ শুরু হওয়ার কথা ছিল ১৯৯৫ সালে। যদিও তা অনুমোদন পেতে সময় লেগে যায় ২০০৫ সাল পর্যন্ত। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে কৃষিজমি, বিল, নাল ভরাট করা হয়। পরিবেশবাদীদের আন্দোলনের মুখেও পরিকল্পিত নগরায়ণের কথা বলে অনড় থাকে প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা। যদিও এখন পর্যন্ত সেখানে তেমন কোনো আবাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়নি।

পূর্বাচলে জমির উচ্চমূল্যের বিষয়টিকে দুঃখজনক উল্লেখ করে রাজউকের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘রাজউক কারো কাছে প্লট একেবারে বিক্রি করে দেয়নি। তাকে ৯৯ বছরের জন্য লিজ দেয়া হয়েছে। কারো যদি প্রয়োজন না হয়, সে এটি রাজউককে ফেরত দেবে। কিন্তু তা না করে বারবার হাত বদল হচ্ছে। ফলে জমির দাম বাড়তে বাড়তে প্রতি কাঠা এখন কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এতে কিন্তু সরকারও রাজস্ববঞ্চিত হচ্ছে। এখন আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে, জমি বরাদ্দ পাওয়ার পর নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত এটি যেন আর হাতবদল হতে না পারে। এটি নিশ্চিত করা গেলেই জমির এ কৃত্রিম বাজার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।’

আবার প্রকল্পের অধীন জমির হিসাব নিয়েও আপত্তি রয়েছে সিএজির। নিরীক্ষা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পের অগ্রগতি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অধিগ্রহণকৃত জমির মোট পরিমাণ ৬ হাজার ২১৩ দশমিক ৫৫ একর। কিন্তু পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পের বিভিন্ন খাতে ব্যবহূত জমির হিসাব পাওয়া যায় ৬ হাজার ৮৭ দশমিক ৩৫৫ একর। সে অনুযায়ী, রাজউকের দখলে থাকা জমির পরিমাণ অধিগ্রহণকৃত জমির তুলনায় ১২৬ দশমিক ১৯৫ একর কম। এ জমি রাজউক দখলেই নেয়নি। শুধু অধিগ্রহণমূল্য (একরপ্রতি ৮ লাখ ৭৩ হাজার ৫০১ টাকা বা কাঠাপ্রতি ১৪ হাজার ৪৩৮ টাকা) হিসাব করলেই এ বাবদ সরকারের ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় ১১ কোটি ২ লাখ টাকার বেশিতে।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব কাজী ওয়াছি উদ্দিন বলেন, ‘অস্বীকারের উপায় নেই, পূর্বাচলে জমির কৃত্রিম বাজার সৃষ্টি হয়েছে, আর এটা রাজউকই করেছে। আমরা ভবিষ্যতের প্রকল্পগুলোয় আশপাশের জমিগুলোর বাজারদর বিবেচনায় নিয়ে প্লটের মূল্য নির্ধারণ করব। তাহলে কম দামে প্লট কিনে অতি উচ্চমূল্যে বিক্রির প্রবণতা কমে আসবে।’

 

আরো জানতে…………..

পূর্বাচলে চেয়ারম্যান অলির স্বজনদের নামে ৬৩ প্লট, দুদকের অনুসন্ধান শেষ পর্যায়ে

দুর্নীতির মাধ্যমে ৬৩টি প্লট হাতিয়ে নিয়ে দুদকের জালে নাগরীর চেয়ারম্যানসহ তাঁর স্বজনরা!

এলএ শাখার সহযোগীতায় ‘পূর্বাচলে প্রায় সাড়ে ৫শ কোটি টাকা মূল্যের প্লট’ হাতিয়ে নেয়ার পায়তারা!

পূর্বাচলে ঢাবির ৫২ একর জমির ওপর নজর প্রভাবশালী মহলের

পূর্বাচলে ২৫’শ বিঘা জমিতে ভরাট কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা

 

সূত্র: বণিক বার্তা