গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হাতে গ্রেপ্তার সন্দেহজনক এক আসামি হাসপাতালে মারা গেছেন। তার নাম আলাল উদ্দিন দেওয়ান, বয়স ৫০ বছর। গত শুক্রবার সন্ধ্যায় জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। ডিবি পুলিশ জানায়, গত ১০ জুন থেকে আলাল উদ্দিন তাদের তত্ত্বাবধানে পঙ্গু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। অবস্থার অবনতি হলে তাকে হৃদরোগ হাসপাতালে নেওয়া হয়।
অন্যদিকে আলাল উদ্দিনের স্বজনরা বলছেন, গত ৬ জুন সন্ধ্যার পর তুরাগের বাসা থেকে আলাল উদ্দিনকে নিয়ে আসে ডিবি পুলিশ। এর পর থেকে তার সঙ্গে কোনো স্বজনকে যোগাযোগ করতে দেওয়া হয়নি; আদালতেও তোলা হয়নি। তাদের অভিযোগ, আলাল উদ্দিনকে আটকের পর নির্মম
নির্যাতন চালিয়ে পা ভেঙে দেওয়া হয়েছে। আলালের অসুস্থতার বিষয়ে তার পরিবারকে কিছুই জানায়নি ডিবি। মৃত্যুর পর হাসপাতাল থেকে তাদের পরিবারকে জানানো হয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, গত ৬ জুন রাজধানীর তুরাগ থানাধীন বাউনিয়া আদর্শপাড়ার একটি বাসার দ্বিতীয়তলায় খুন হন ফাতেমা আক্তার মুক্তা (৩৩) নামের এক গৃহবধূ। ওই বাসার কেয়ারটেকার ছিলেন আলাল উদ্দিন। এ ঘটনায় ফাতেমার ভাই মুরাদ মিয়া তুরাগ থানায় মামলা করেন। মামলায় আসামি করা হয় ফাতেমার স্বামী সাইফুল ইসলাম রানাকে। মামলার তদন্তে নেমে ডিবি উত্তরা বিভাগ আলাল উদ্দিনকে আটক করে। পুলিশ বলছে, নিহত আলাল ওই মুক্তা হত্যার সঙ্গে জড়িত। ওই নারীর সঙ্গে ধস্তাধস্তিতেই পায়ে আঘাত পান আলাল। তাকে গ্রেপ্তারের পর হত্যার দায়ও স্বীকার করেন।
নিহত আলালের পা ভাঙার বিষয়ে পুলিশের ভাষ্য- মুক্তাকে হত্যা করার সময় পায়ে আঘাত পান আলাল। এতে করে তার পা ফুলে যায়। কোর্টের নির্দেশে তাকে পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে তার প্রেসার হঠাৎ বেড়ে গেলে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে ভর্তির চার ঘণ্টা পর মৃত্যু হয় আলালের।
মুক্তা হত্যার ঘটনায় গত ৭ জুন তুরাগ থানায় তার ভাইয়ের দায়ের করা মামলার এজাহারে একমাত্র আসামি করা হয়েছে সাইফুল ইসলাম রানাকে। তিনি নিহত মুক্তার স্বামী। হত্যা মামলাটির এজাহারভুক্ত আসামি নন আলাল।
আলালের চাচাতো ভাই জাহিদুল ইসলাম সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, গত ৬ জুন মাগরিবের নামাজের পর বাসা থেকে আলাল উদ্দিনকে ডিবি পুলিশের একটি দল তুলে নিয়ে যায়। এর পর আমরা কয়েকদিন ডিবি কার্যালয়ের সামনে গিয়ে দেখা করতে চেষ্টা করেছি। কিন্তু ভেতরে ঢুকতে পারিনি। গেট থেকে বলেছে তারা কিছুই জানেন না। তিনি বলেন, গত শুক্রবার রাতে হাসপাতাল থেকে আমাদের ফোন করা হয়। এর পর আমরা হাসপাতালে গিয়ে জানতে পারি ভাইয়ের মৃত্যু হয়েছে।
জাহিদুল সংবাদ মাধ্যমকে আরও বলেন, আলাল উদ্দিন খুবই সহজ-সরল মানুষ ছিলেন। কারও সঙ্গে কোনোদিন ঝগড়া করতেন না। সুস্থ সবল মানুষ ছিলেন। তার কোনো ধরনের অসুস্থতা ছিল না। আলাল উদ্দিনের পায়েও কোনো সমস্যা ছিল না। কিন্তু আমরা জানতে পেরেছি তার পা ভাঙা অবস্থায় পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। নির্যাতন করে তাকে অসুস্থ করা হয়েছে বলে আমরা মনে করি। এটা হত্যাকা-। আমরা এই হত্যার বিচার চাই।
নিহতের বড় ভাই মো. লিয়াজ উদ্দিন সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, আলাল উদ্দিনের বিরুদ্ধে কোনো মামলা নেই। গত ৬ জুন সন্ধ্যায় তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য উঠিয়ে নিয়ে যায় ডিবি। এর পর তার আর কোনো খোঁজ পাইনি। মৃত্যুর পর জানতে পেরেছি ১০ তারিখ সকালে তাকে পঙ্গু হাসাপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে আলাল উদ্দিন ছয় দিন ছিল। সেখান থেকে হৃদরোগ হাসপাতালে নেওয়া হলে মারা যায় সে। একজন সুস্থ সবল মানুষ কীভাবে মারা গেল আমরা জানি না?
স্বজনরা বলছেন, আলাল উদ্দিনকে ৬ জুন নিয়ে আসা হয়। এর পর ১০ তারিখে পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তা হলে ৬ থেকে ১০ তারিখ পর্যন্ত কেন তাকে আটকে রাখা হলো? গতকাল শনিবার দুপুর পর্যন্ত তাদেরকে আলালের লাশও দেখতে দেওয়া হয়নি, জানান নিহতের স্বজনেরা।
এদিকে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উত্তরা বিভাগের উপকমিশনার আকরামুল হোসেন সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, হত্যা মামলার আসামি হিসেবে আলাল উদ্দিনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর পর তার অসুস্থতার বিষয়ে আদালতে কাগজপত্র পাঠানো হয়। আদালতের নির্দেশে তাকে পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। পরে ‘কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট’ হলে তাকে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত বলে জানান। তার পায়ে ফ্র্যাকচারের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আলাল উদ্দিনের পায়ে কোনো ফ্র্যাকচার ছিল না।
দুপুরে হৃদরোগ হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, জরুরি বিভাগের সামনে ডিবি পুলিশের কর্মকর্তারা। মৃতের কোনো স্বজন হাসপাতালে নেই। এ বিষয়ে হাসপাতালের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী প্রকাশ্যে কথা বলতে রাজি হননি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হাসপাতালের এক কর্মচারী সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় ডিবি পুলিশ আলাল উদ্দিনকে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে আনেন। আলাল উদ্দিনের বাম পায়ে ব্যান্ডেজ ছিল। হাসপাতালের ট্রলি থেকেই চিকিৎসকরা দেখে বলেন মারা গেছে। নিশ্চিত হওয়ার জন্য তার ইসিজি করা হয়।
আলালের ডেথ নোটে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট হাসপাতালের চিকিৎসক উম্মে হাবিবা উল্লেখ সংবাদ মাধ্যমকে করেন, শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টা ৫ মিনিট থেকে ১০ মিনিট তিনি আলাল উদ্দিনকে দেখেন। এ সময় তার পালস ও বিপি ছিল না।
হাসপাতালের ওয়ার্ড মাস্টার বেলাল হোসেন সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, আলাল উদ্দিনের বিষয়ে শেরেবাংলা নগর থানায় লিখিতভাবে অবহিত করা হয়। পরে শুক্রবার ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে থানার এসআই আনোয়ার হোসেন সুরতহাল করেন। পরে লাশটি এসআই ফাহাদের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়।