শ্রীপুরে প্রকল্পের অর্থ আত্মসাত: বরমীর চেয়ারম্যান ও এক মেম্বারকে সাময়িক বরখাস্ত

শ্রীপুরে প্রকল্পের অর্থ আত্মসাত: বরমীর চেয়ারম্যান ও এক মেম্বারকে সাময়িক বরখাস্ত

গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : সরকারি অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় শ্রীপুরের বরমী ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান তোফাজ্জল হোসেন এবং একই ইউনিয়নের ৪নং ওয়ার্ডের সদস্য হারুনুর রশিদ খন্দকারের সাময়িক বরখাস্ত করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। একই সঙ্গে তাদের কেন স্থায়ীভাবে অপসারণ (বহিষ্কার) করা হবে না তা জানতে চেয়ে ১০ দিনের সময় দেয়া হয়েছে।

সোমবার (২৬ জুন) স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগের (ইউপি-১ শাখার) সিনিয়র সহকারী সচিব জেসমীন প্রধান স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে, শ্রীপুর উপজেলার ৬নং বরমী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোঃ তোফাজ্জল হোসেন এবং ৪নং ওয়ার্ডের সদস্য হারুনুর রশিদ খন্দকারের বিরুদ্ধে স্থাবর সম্পত্তি হস্তান্তর করের ১% রাজস্ব ব্যয়ের মাধ্যমে একটি ওয়ার্ডে সকল প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে কিন্তু প্রকল্প অনুযায়ী কোন কার্যক্রম যথাযথভাবে করা হয়নি। প্রাক্কলন অনুযায়ী কাজ না করে অর্থ আত্মসাত করা হয়েছে। ফলে সরকারের রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে ৪৬ লাখ‌ ৯০ হাজার টাকা। উল্লেখ্য, তদন্তের ১,২,৩ ও ৪ নং প্রকল্প বিধিবহির্ভূতভাবে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর-এর ৪টি প্রকল্পের সাথে ওভারল্যাপিং করা হয়েছে। স্থাবর সম্পত্তি হস্তান্তর ১% হিসেবে প্রাপ্ত রাজস্ব ব্যয়ের মাধ্যমে গৃহীত প্রকল্পসমূহ স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর গাজীপুর পূর্বেই অনুমোদিত এবং ২ ও ৩ নং প্রকল্পের রাস্তা পূর্বেই সম্পন্ন অবস্থায় ছিল। সর্বোপরি তদন্ত কমিটির কাছে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়েছে যে, জ্ঞাতসারে বায়বীয় প্রকল্পের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের উদ্দেশ্যেই একই ওয়ার্ডে প্রকল্পগুলো নেয়ার আনীত অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ), আইন ২০০৯-এর ৩৪(৪)(খ)(ঘ) ধারা অনুযায়ী গাজীপুরের জেলা প্রশাসক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সুপারিশ করেছেন।

ইউপি সদস্য হারুনুর রশিদ খন্দকার।

আরো উল্লেখ করা হয়েছে, বরমী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোঃ তোফাজ্জল হোসেন এবং ৪নং ওয়ার্ডের সদস্য হারুনুর রশিদ খন্দকারের উল্লিখিত অভিযোগে তাদের দ্বারা ইউনিয়ন পরিষদের ক্ষমতা প্রয়োগ প্রশাসনিক দৃষ্টিকোণে সমীচীন নয় মর্মে সরকার মনে করে। সেহেতু চেয়ারম্যান তোফাজ্জল হোসেন এবং ৪নং ওয়ার্ডের সদস্য হারুনুর রশিদ খন্দকার কর্তৃক সংঘটিত অপরাধমূলক কার্যক্রম ইউনিয়ন পরিষদসহ জনস্বার্থের পরিপন্থী বিবেচনায় স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন, ২০০৯-এর ৩৪ (৪) (খ) (ঘ) ধারার অপরাধ সংঘটিত করায় তাদের স্বীয় পদ হতে সাময়িক বরখাস্ত করা হলো।

কারণ দর্শানোর নোটিশে সাময়িক বরখাস্তের প্রজ্ঞাপন যুক্ত করে জানতে চাওয়া হয়েছে, স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন, ২০০৯-এর ৩৪(৪)(খ)(ঘ) ধারার অপরাধ সংঘটিত করায় কেন আপনাদের পদ হতে চূড়ান্তভাবে অপসারণ করা হবে না তার জবাব পত্র প্রাপ্তির ১০ কার্যদিবসের মধ্যে গাজীপুরের জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে স্থানীয় সরকার বিভাগে প্রেরণ নিশ্চিতকরণের জন্য নির্দেশক্রমে নির্দেশনা প্রদান করা হলো।

বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন স্থানীয় সরকার বিভাগের (ইউপি-১ শাখার) সিনিয়র সহকারী সচিব জেসমীন প্রধান‌।

জানা গেছে, শ্রীপুর উপজেলার বরমী ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মো. তোফাজ্জল হোসেনের বিরুদ্ধে নামমাত্র প্রকল্প দেখিয়ে সরকারের ৫০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার নেওয়ার ঘটনায় ২০২২ সালে ৪ এপ্রিল স্থানীয় সরকার বিভাগ সংশ্লিষ্ট বিভাগের গাজীপুরের উপপরিচালকসহ তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে স্থানীয় সরকার বিভাগ। এরপর দীর্ঘ তদন্ত শেষে গত ২১ নভেম্বর ২০২২ সালে ৮টি ভুয়া প্রকল্প দেখিয়ে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার প্রমাণ পায়। প্রমাণ পাওয়ার পর ৮৫ পৃষ্ঠায় একটি তদন্ত প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়।

তদন্ত প্রতিবেদন উল্লেখ করা হয়েছে, উপজেলার বরমী ইউনিয়ন পরিষদের ৪ নম্বর ওয়ার্ডে ৮টি প্রকল্প দেখিয়ে ৫০ লাখ টাকা হাতির নেওয়া হয়। যেসব রাস্তায় প্রকল্প দেখানো হয়েছে, সেসব রাস্তা আগে থেকেই পাকা করা ছিল। এ ছাড়া যেটুকু কাজ হয়েছে, সেটুকু শুধু লোক দেখানো। বাস্তবে তদন্ত কমিটি দৃশ্যমান কোনো ধরনের মিল খুঁজে পায়নি।

এ ছাড়া একই রাস্তায় চারটি প্রকল্প দেখানো হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা করেননি চেয়ারম্যান। ইউপি সদস্যদের সঙ্গে ইউপি চেয়ারম্যান কোনো ধরনের পরামর্শ ছাড়া প্রকল্প দেখিয়ে অর্থ হাতিয়ে নেন। প্রকল্পের কাজ শেষ করার আগে ব্যাংক থেকে টাকা উত্তোলনের প্রমাণ পাওয়া গেছে। গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর চেয়ারম্যান তড়িঘড়ি মাটি ভরাটের প্রমাণ মিলেছে। এ ঘটনার সঙ্গে ততকালীন সচিব নজরুল ইসলাম ও ৪ নম্বর ওয়ার্ড হারুনুর রশীদ সরাসরি জড়িত ছিল। সচিব ও ইউপি সদস্যদের যোগসাজশে সরকারের অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে।

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, প্রকল্পে সাতখামাইর পাকা রাস্তা থেকে দাইবাড়ি টেক অভিমুখের রাস্তায় কার্যাদেশ অনুযায়ী কোনোরূপ কাজ করা হয়নি, সাতখামাইর বাজার থেকে রেললাইনের পাশ দিয়ে ডালেরশ্বর অভিমুখে রাস্তায় ইট-বালি দিয়ে সংস্কারের কথা থাকলেও কোনো কাজ হয়নি। দরগারচালা বাজার থেকে ডালেরশ্বহর অভিমুখে রাস্তার দৃশ্যমান কোনো কাজ হয়নি। এ ছাড়া বাকি প্রকল্পগুলোর দৃশ্যমান কোনো কাজ হয়নি বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, বরমী ইউনিয়ন পরিষদের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের ৮টি পাকা রাস্তার ভুয়া প্রকল্প দেখিয়ে ৫০ লাখ টাকা তোলার অভিযোগ উঠেছিল ইউপি চেয়ারম্যান মো. তোফাজ্জল হোসেনের বিরুদ্ধে ইউনিয়ন পরিষদের ৭ ইউপি সদস্য চেয়ারম্যানের প্রতি অনাস্থা দিয়েছিল।