গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : বাংলাদেশের সরকারি সেবাখাতে সবচেয়ে বেশি ঘুষ ও দুর্নীতির শিকার হচ্ছেন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) থেকে সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাম্প্রতিক ‘সিটিজেন পারসেপশন সার্ভে ২০২৫’ অনুযায়ী, বিআরটিএ থেকে সেবা নিতে গিয়ে গত এক বছরে ৬৩.২৯ শতাংশ নাগরিক ঘুষ দিতে বাধ্য হয়েছেন।
জরিপ অনুযায়ী, ঘুষ লেনদেনে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, যেখানে ৬১.৯৪ শতাংশ সেবাগ্রহীতা ঘুষ দিয়েছেন। এরপর যথাক্রমে পাসপোর্ট অফিস (৫৭.৪৫%), ভূমি রেজিস্ট্রি অফিস (৫৪.৯২%), বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের অফিস (৫৩.৭৭%) এবং ভূমি রেকর্ড ও অধিগ্রহণ সংক্রান্ত অফিস (৫১.৪০%)।
বিবিএসের এ জরিপে মোট ২১টি সরকারি দপ্তরে ঘুষ লেনদেনের চিত্র উঠে এসেছে।
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে দেশের ৬৪টি জেলার ৮ লক্ষাধিক নাগরিকের অংশগ্রহণে এই জরিপ পরিচালনা করা হয়। ৪৫,৮৬৮টি মৌজা বা মহল্লা থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয় ১,৯২০টি প্রাইমারি স্যাম্পলিং ইউনিটের মাধ্যমে। অংশগ্রহণকারীদের বয়স ছিল ১৮ বছর ও তদূর্ধ্ব।
ঘুষ ও হয়রানির শিকার সাধারণ নাগরিক
জরিপে দেখা গেছে, গত এক বছরে সরকারি সেবা নিতে গিয়ে মোট ৩১ শতাংশ নাগরিক ঘুষ বা দুর্নীতির শিকার হয়েছেন। পুরুষদের ক্ষেত্রে এ হার ৩৮.৬২ শতাংশ, যেখানে নারীদের মধ্যে তা ২২.৭১ শতাংশ।
দেশের ১৯.৩১ শতাংশ নাগরিক গত এক বছরে বৈষম্য বা হয়রানির সম্মুখীন হয়েছেন বলেও জরিপে উঠে এসেছে। এর মধ্যে নারীদের হার ১৯.৬২% এবং পুরুষদের ১৮.৯৭%। শহরাঞ্চলের মানুষ তুলনামূলক বেশি হয়রানির শিকার হচ্ছেন (২২.০১%)।
বৈষম্যের কারণ ও প্রেক্ষাপট
জরিপে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ৬.৮২% আর্থ-সামাজিক অবস্থান এবং ৪.৪৭% লিঙ্গভেদের কারণে বৈষম্যের শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছেন। অধিকাংশ হয়রানির ঘটনা ঘটেছে পরিবারে (৪৮.৪৪%), গণপরিবহন বা উন্মুক্ত স্থানে (৩১.৩০%) এবং কর্মস্থলে (২৫.৯৭%)। তবে এসব ঘটনায় মাত্র ৫.৩৫% ভুক্তভোগী অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে।
বিরোধ ও সমাধানের উপায়
গত দুই বছরে ১৬.১৬% নাগরিক কোনো না কোনো বিরোধ বা দ্বন্দ্বের মুখোমুখি হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৮৩.৬০% ব্যক্তি আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় সমাধান পাওয়ার চেষ্টা করেছেন।
বিরোধ নিষ্পত্তিতে ৪১.৩৪% আদালত বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মতো আনুষ্ঠানিক সংস্থার সহায়তা নিয়েছেন, আর ৬৮.৯৬% ভরসা রেখেছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, ধর্মীয় নেতা বা পারিবারিক সালিশের মতো অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থার ওপর।
বিবিএসের এ জরিপ বাংলাদেশের সরকারি সেবাখাতে ঘুষ, হয়রানি ও বৈষম্যের বাস্তবতা যেমন তুলে ধরেছে, তেমনি বিচারপ্রাপ্তি ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিতকরণে বিদ্যমান সীমাবদ্ধতার দিকটিও স্পষ্ট করেছে।