ইরানের পারমাণবিক কেন্দ্রে যুক্তরাষ্ট্রের বোমা হামলা হলে কী ঘটতে পারে?

ইরানের পারমাণবিক কেন্দ্রে যুক্তরাষ্ট্রের বোমা হামলা হলে কী ঘটতে পারে?

গাজীপুর কণ্ঠ, আন্তর্জাতিক ডেস্ক : প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি ইরানের ফোর্দো পারমাণবিক কেন্দ্রে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় প্রচলিত বোমা (Massive Ordnance Penetrator – MOP) ব্যবহার করেন, তাহলে এটি ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের সৃষ্টি করবে—তবে পারমাণবিক বিস্ফোরণ বা ব্যাপক তেজস্ক্রিয়তার ঝুঁকি খুবই কম।

ফোর্দো, যা তেহরানের দক্ষিণে একটি পাহাড়ের নিচে অবস্থিত, মূলত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণে ব্যবহৃত হয়। এটি পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বা সম্ভাব্য পারমাণবিক বোমা তৈরির প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। তবে এখানে কোনও পারমাণবিক চুল্লি বা প্রস্তুত যুদ্ধাস্ত্র নেই, যার ফলে চেরনোবিল ধাঁচের বিপর্যয় ঘটার সম্ভাবনা নেই বলে জানিয়েছেন বিশ্লেষকরা।

প্রাক্তন ব্রিটিশ সামরিক কর্মকর্তা হামিশ ডে ব্রেটন-গর্ডন জানান, “যদি আপনি নিচে থাকেন এবং সেখানে বোমা পড়ে, তাহলে আপনি শেষ। তবে এটি চেরনোবিলের মতো কিছু হবে না।”

তিনি বলেন, এই বোমাটি প্রায় ৩০,০০০ পাউন্ড ওজনের এবং এর মধ্যে ৫,৫০০ পাউন্ডের বিস্ফোরক থাকে, যা শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্রের কাছেই আছে। এই বোমা পাহাড় ভেদ করে আঘাত হানতে সক্ষম — এটি ‘মাউন্টেন বাস্টার’ নামেও পরিচিত।

তেজস্ক্রিয়তার ঝুঁকি কতটুকু?
ফোর্দোতে ব্যবহৃত ইউরেনিয়াম গ্যাস বা এর উপজাত সামগ্রী তুলনামূলকভাবে দুর্বল তেজস্ক্রিয় এবং এটি পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে না। যদিও কোনও বিস্ফোরণে গ্যাস ছড়িয়ে পড়লে তা হাইড্রোফ্লোরিক অ্যাসিডে পরিণত হতে পারে, যা ত্বকে পুড়ে যাওয়া এবং নিঃশ্বাসের মাধ্যমে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে।

বিশ্লেষক মার্ক নেলসন বলেন, বিস্ফোরণের পর পার্শ্ববর্তী এলাকায় তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা ‘ডিটেক্টেবল’ হলেও তা ‘ক্ষতিকর’ হবে না। তবে যদি কেউ খুব কাছাকাছি অবস্থানে থাকেন এবং সুরক্ষা সরঞ্জাম ছাড়া থাকেন, তাহলে তাদের জন্য পরিস্থিতি হতে পারে অত্যন্ত বিপজ্জনক।

পারমাণবিক চুক্তির প্রেক্ষাপট
২০১৫ সালে ওবামা প্রশাসনের সময় ইরান একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল (Joint Comprehensive Plan of Action – JCPOA), যার আওতায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সীমিত করা হয়। তবে ট্রাম্প ২০১৮ সালে একতরফাভাবে চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসার পর ইরান পুনরায় ৬০% পর্যন্ত সমৃদ্ধকরণ শুরু করে—যা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় ৯০% মাত্রার কাছাকাছি।

ফোর্দো কেন্দ্রের সামরিক তাৎপর্য
বিশ্লেষকদের মতে, ফোর্দোর ভিতরে ৩,০০০টি সেন্ট্রিফিউজ বসানো হয়েছে, যা একটি শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। এমনকি ওবামা প্রশাসনও বলেছিল, এর আকার ও কনফিগারেশন সন্দেহজনক।

বিশ্লেষক ব্রেটন-গর্ডন বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি ফোর্দোতে এই বিশাল বোমা ব্যবহার করে, তাহলে পুরো কেন্দ্রটি পাহাড়ের নিচে ধ্বংস হয়ে গিয়ে এক ধরনের “সারকোফ্যাগাস”-এ পরিণত হবে—যেমনটি চেরনোবিল দুর্ঘটনার পর করা হয়েছিল। তবে এখানে সেই আবরণ হতে পারে ২০০ ফুট পুরু।

যুক্তরাষ্ট্র যদি ফোর্দোতে হামলা চালায়, তবে তা একটি বিস্ফোরক হামলা হবে—পারমাণবিক নয়। কিছু সীমিত রেডিওঅ্যাকটিভ ও রাসায়নিক ঝুঁকি থাকলেও সেগুলো অপেক্ষাকৃত ছোট পরিসরের এবং নিয়ন্ত্রিত হতে পারে। তবে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো মানবিক ক্ষয়ক্ষতি এবং এর ভূরাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া।