গাজীপুর কণ্ঠ, আন্তর্জাতিক ডেস্ক : গত সপ্তাহজুড়ে ইরান থেকে প্রতিদিন শত শত ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়ার ফলে ইসরায়েলের বিশ্বখ্যাত “Iron Dome” প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভয়াবহ চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
ইসরায়েল জানিয়েছে, যুদ্ধের প্রথম ছয় দিনে ইরান প্রায় ৪০০টির বেশি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। এর মধ্যে অন্তত ৪০টির বেশি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করে তেলআবিব, হাইফা এবং বিয়ারশেভা শহরে আঘাত হানে, যাতে বহু হতাহতের ঘটনা ঘটে। শুধুমাত্র বৃহস্পতিবারেই বিয়ারশেভার প্রধান হাসপাতালে হামলায় ২০০ জনের বেশি আহত হয়েছেন।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ইসরায়েলের Arrow 3 এবং অন্যান্য উচ্চ প্রযুক্তির প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এখন “অসহনীয় ব্যবহার হারে” চলছে বলে সতর্ক করেছে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র থেকে জরুরি প্রতিরক্ষা সহায়তা পাঠানো হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যৌথ প্রতিরক্ষা
উত্তর ইসরায়েলে THAAD (Terminal High Altitude Area Defense) ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে প্রতিরক্ষা সমন্বয় জোরদার করেছে।
মার্কিন Aegis-সজ্জিত নৌবহর থেকে ইরান থেকে ছোড়া কিছু ক্ষেপণাস্ত্রও ধ্বংস করা হয়েছে।
এদিকে, Institute for the Study of War জানিয়েছে, ইসরায়েলের পাল্টা হামলায় ইরানের ১২০টির বেশি ক্ষেপণাস্ত্র লাঞ্চার ও ৭০টি ব্যাটারি ধ্বংস হয়েছে। তবে এখনো প্রায় ৩০০টি লাঞ্চার সক্রিয় রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
যুদ্ধের সূচনা ও বর্তমান অবস্থা
এই সংঘাতের সূচনা ঘটে যখন ইসরায়েল ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা ও সামরিক ঘাঁটিতে বিমান হামলা চালায়। ইরান এর পাল্টা জবাবে ব্যাপকভাবে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ শুরু করে। এর ফলে তেলআবিবসহ বিভিন্ন শহরে ভবন ধ্বংস, হতাহত ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
ইসরায়েল দাবি করেছে, তারা ইতোমধ্যে ইরানি আকাশসীমায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে, তবে ইরানের Fordo পারমাণবিক কেন্দ্র ধ্বংসে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা চেয়েছে, যেটি পাহাড়ের নিচে ২৬০ ফুট গভীরে অবস্থিত এবং বাঙ্কার-বাস্টার বোমা ছাড়া ধ্বংস করা সম্ভব নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা: দ্বিধায় ট্রাম্প প্রশাসন
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যদিও ইসরায়েলের পাশে থাকার কথা বলেছেন, তবে তিনি ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যার পরিকল্পনা বাতিল করেছেন বলে জানা গেছে।
যুক্তরাষ্ট্র এখনো সরাসরি হামলায় অংশ নেয়নি, তবে ইসরায়েল অনুরোধ করেছে যেন ৩০,০০০ পাউন্ড ওজনের “বাঙ্কার বাস্টার” দিয়ে Fordo কেন্দ্র ধ্বংস করা হয়। কারণ এই ধরনের অস্ত্র বহনের উপযুক্ত বিমান ইসরায়েলের নেই।
বৈশ্বিক প্রতিক্রিয়া ও উদ্বেগ
ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ ইতোমধ্যে চীন, রাশিয়া ও ভেনেজুয়েলার মতো দেশগুলোর কূটনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে।
চীন ইসরায়েলের হামলার কড়া সমালোচনা করে ইরানের পাশে থাকার কথা বলেছে।
রাশিয়া ও ভেনেজুয়েলাও ইসরায়েলবিরোধী অবস্থান নিয়েছে।
মার্কিন গোয়েন্দা সূত্রের আশঙ্কা, চীন, রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়া একত্রে ইরানের পাশে দাঁড়াতে পারে, যদি এই যুদ্ধ বিশ্বযুদ্ধে রূপ নেয়।
অন্যদিকে, ইরাক, তুরস্ক, সিরিয়া ও লেবাননও আতঙ্কে রয়েছে। এই যুদ্ধ বিশ্বজুড়ে জ্বালানির বাজারে অস্থিরতা, শরণার্থী সঙ্কট ও মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
ইসরায়েলের লক্ষ্য কি?
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, এই যুদ্ধ ইসরায়েলের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য অপরিহার্য, কারণ ইরান বহুবার ইসরায়েলকে মানচিত্র থেকে মুছে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে এবং হামাস-হিজবুল্লাহর মতো গোষ্ঠীকে সমর্থন দিয়ে থাকে।
ইসরায়েলের মূল লক্ষ্য এখন ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করা।
তবে নেতানিয়াহু বলেছেন, ইসরায়েল ইরানি সরকারকে সরাতে চায় না, কিন্তু এই হামলাগুলোর ফলে যদি ১৯৭৯ সালের পর থেকে শাসন করা ইসলামিক রেজিম পতনের পথে যায়, তাতে তিনি অবাক হবেন না।
কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা কতটুকু?
পারমাণবিক চুক্তি বা আলোচনার পথ এখন একেবারে বন্ধ। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আগেই ইরানকে ৬০ দিনের সময় দিয়েছিলেন, কিন্তু ১৬ জুন তা শেষ হয়ে গেছে। এখন বিশ্বজুড়ে বড় প্রশ্ন হলো — এই যুদ্ধ কি নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে, নাকি বিশ্বযুদ্ধে রূপ নেবে?
বর্তমানে ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধ শুধু দুটি দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি পরিণত হতে পারে একটি বৈশ্বিক সংঘর্ষে, যেখানে জ্বালানি, নিরাপত্তা, অভিবাসন এবং পারমাণবিক নিরাপত্তার প্রশ্নে গোটা বিশ্ব চরম অনিশ্চয়তার দিকে এগোচ্ছে।