
নিজস্ব সংবাদদাতা : আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে গাজীপুর–২ আসনের দুই প্রার্থী দম্পতির দাখিল করা নির্বাচনী হলফনামায় সম্পদ ও ঋণের বড় ধরনের বৈষম্য উঠে এসেছে।
নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হলফনামা অনুযায়ী, বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ও গাজীপুর মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এম মঞ্জুরুল করিম রনি এবং তাঁর স্ত্রী স্বতন্ত্র প্রার্থী তাপসী তন্ময় চৌধুরীর মোট ঘোষিত সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৪০ কোটি টাকা। তবে একই সঙ্গে তাঁদের নামে রয়েছে প্রায় ১৪০ কোটি টাকার বেশি ঋণ।
মনোনয়নপত্রের সঙ্গে এসব হলফনামা গত সোমবার (২৯ ডিসেম্বর) রিটার্নিং অফিসারের কাছে জমা দেওয়া হয়।
হলফনামা অনুযায়ী, এম মঞ্জুরুল করিম রনির আয়কর রির্টানে দেখানো ঘোষিত সম্পদ মোট সম্পদের পরিমাণ ৩৮ কোটি ২৯ লাখ ৭৯ হাজার ৬০৬ টাকা। তাঁর বার্ষিক আয় দেখানো হয়েছে ৯ লাখ ৪১ হাজার ২৭৫ টাকা।
অন্যদিকে, তাপসী তন্ময় চৌধুরী আয়কর রির্টানে দেখানো ঘোষিত সম্পদ ১ কোটি ৯৬ লাখ ৮ হাজার ৭৮৪ টাকা এবং তাঁর বার্ষিক আয় ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা।
হলফনামায় উল্লেখ করা হয়েছে, এম মঞ্জুরুল করিম রনি তাঁর মালিকানাধীন এভালন এভিয়েশন লিমিটেড ও ফস্টার ট্রেডিং ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের নামে আইএফআইসি ব্যাংকের গুলশান শাখা থেকে মোট প্রায় ১৪০ কোটি ২৫ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছেন। এই ঋণ গত ১০ ডিসেম্বর পুনঃতফসিল করা হয়েছে, যা মনোনয়নপত্র দাখিলের কয়েক দিন আগের ঘটনা।
নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের মতে, সাধারণ ব্যাংকিং বিধি অনুযায়ী জামানত ও সম্পদের অনুপাতে ঋণ দেওয়া হয়। ঘোষিত সম্পদের তুলনায় এত বড় অঙ্কের ঋণ থাকা হলে তা ভোটারদের মধ্যে প্রশ্ন তুলতে পারে—এই ঋণ কীভাবে এবং কোন শর্তে অনুমোদিত হয়েছে।
তবে তাপসী তন্ময় চৌধুরীর নামে কোনো ঋণের তথ্য হলফনামায় উল্লেখ নেই।
হলফনামা অনুযায়ী, মঞ্জুরুল করিম রনির কাছে নগদ রয়েছে ২৩ কোটি ৪৯ লাখ ১০ হাজার ৫০৮ টাকা, অথচ ব্যাংকে জমা রয়েছে মাত্র ৮০ হাজার ৬৬১ টাকা।
এ ছাড়া তাঁর সাতটি কোম্পানিতে মোট পাঁচ লাখ ৫০০টি শেয়ার রয়েছে, যার মূল্য দেখানো হয়েছে পাঁচ কোটি ৫০ হাজার টাকা। আসবাবপত্রের মূল্য দেখানো হয়েছে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা এবং ইলেকট্রনিক পণ্যের মূল্য ৫০ হাজার টাকা। ৩০ লাখ ৫০ হাজার টাকা মূল্যের একটি গাড়ি রয়েছে।
হলফনামায় উল্লেখ করা হয়েছে, তাঁর স্ত্রীর কাছে নগদ রয়েছে ২৫ লাখ ৪০ হাজার ৬২১ টাকা এবং ব্যাংকে জমা আছে ৮ হাজার ১৬৩ টাকা। তাঁর স্ত্রীর নামে ৫ টি কোম্পানিতে মোট ১ লাখ ৩৩ হাজার টি। এসবের মূল্য দেখানো হয়েছে মোট ১ কোটি ৩৩ লাখ টাকা।
স্বর্ণালংকার আছে ১ লাখ টাকার। এ ছাড়া লাখ আসবাবপত্র আছে ১ লাখ টাকার এবং ৩১ লাখ টাকা মূল্যের একটি গাড়ি রয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বিপুল অঙ্কের নগদ অর্থ রাখা এবং ব্যাংকে তুলনামূলকভাবে অল্প টাকা থাকা অর্থ ব্যবস্থাপনার ধরন নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে, যা হলফনামা যাচাইয়ের সময় নির্বাচন কমিশনের নজরে আসার কথা।
হলফনামায় দেখা যায়, মঞ্জুরুল করিম রনির কোনো কৃষিজমি নেই। তবে গাজীপুরের সালনা এলাকায় তাঁর ৪৭৫ দশমিক ৭ শতাংশ অকৃষিজমি রয়েছে, যার বাজারমূল্য দেখানো হয়েছে ৬৬ কোটি ৬২ লাখ ৭৫ হাজার টাকা।
অন্যদিকে, তাঁর স্ত্রীর নামে রয়েছে ৩০ দশমিক ৩৭৫ শতাংশ কৃষিজমি, যার মূল্য দেখানো হয়েছে ৪ লাখ ৬০ হাজার টাকা।
বিশ্লেষকদের মতে, ঘোষিত মোট সম্পদের চেয়ে জমির বাজারমূল্য বেশি হওয়ায় সম্পদের হিসাব ও শ্রেণিবিন্যাসে অসঙ্গতির বিষয়টি স্পষ্ট হয়, যা যাচাইয়ের দাবি রাখে।
হলফনামা অনুযায়ী, মঞ্জুরুল করিম রনির বিরুদ্ধে বর্তমানে নয়টি মামলা চলমান রয়েছে। এর মধ্যে দুটি চেক ডিজঅনারকে (চেক প্রত্যাখ্যান) কেন্দ্র করে নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্ট (এনআই) অ্যাক্টের অধীনে এবং একটি অর্থ ঋণ আইনের মামলা।
এ ছাড়া অতীতে তাঁর বিরুদ্ধে আরও ১২টি মামলা ছিল, যা ২০২৫ সালে নিষ্পত্তি হয়েছে।
তাঁর স্ত্রী তাপসী তন্ময় চৌধুরীর বিরুদ্ধে বর্তমানে পাঁচটি মামলা চলমান রয়েছে। এর মধ্যে দুটি এনআই অ্যাক্ট, দুটি অর্থ ঋণ আইন এবং ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০৮ ধারার একটি মামলা আপিল বিভাগে বিচারাধীন। ২০২৫ সালে তাঁর বিরুদ্ধে আরও দুটি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে।
২০২৫–২৬ অর্থবছরে মঞ্জুরুল করিম রনি ৭৭ হাজার ৪০০ টাকা এবং তাঁর স্ত্রী ১০ হাজার টাকা আয়কর দিয়েছেন বলে হলফনামায় উল্লেখ রয়েছে।
দু’জনের পেশা হিসেবে ব্যবসা উল্লেখ থাকলেও ব্যবসা থেকে কোনো আয় দেখানো হয়নি।
রনির আয়ের প্রধান উৎস হিসেবে দেখানো হয়েছে বাড়ি বা সম্পত্তি ভাড়া। এতে বার্ষিক আয় দেখানো হয়েছে ৯ লাখ ৪০ হাজার টাকা। এছাড়াও ব্যাংক সুদ থেকে আয় দেখানো হয়েছে ১২৭৫ টাকা।
তার স্ত্রীর আয়ের উৎস দেখানো হয়েছে শুধু ব্যাংক সুদ থেকে ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা।
অন্যান্য খাত থেকে তাদের আর কোন আয় দেখানো হয়নি।
নির্বাচন বিশ্লেষকদের মতে, ব্যবসাকে পেশা হিসেবে উল্লেখ করে আয় না দেখানো হলে তা স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করতে পারে, যা কমিশনের যাচাই প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় হতে পারে।
মঞ্জুরুল করিম রনি তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতার তথ্য উল্লেখ করেননি। তবে তাপসী তন্ময় চৌধুরীর শিক্ষাগত যোগ্যতা হিসেবে বিকম পাশ উল্লেখ করা হয়েছে।
৪১ বছর বয়সী রনি এবং ৪৫ বছর বয়সী তাপসী তন্ময় এই প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন।
তাঁদের স্থায়ী ঠিকানা গাজীপুর সিটি করপোরেশনের দক্ষিণ সালনা এলাকায় হলেও বর্তমান ঠিকানা হিসেবে বারিধারা ডিপ্লোম্যাটিক জোনের ১১ নম্বর রোডের ৮১/ক নম্বর বাড়ির ঠিকানা উল্লেখ করা হয়েছে।
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, প্রার্থীদের দাখিল করা হলফনামার তথ্য যাচাই করা হবে। ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা তথ্য দিলে সংশ্লিষ্ট আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
নির্বাচন সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই হলফনামাগুলো ভোটারদের সামনে প্রার্থীদের আর্থিক ও আইনগত অবস্থান স্পষ্ট করে, যা সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
এই আসনে এম. মঞ্জুরুল করিম রনি ও তাপসী তন্ময় চৌধুরীসহ সর্বাধিক মোট ১৮ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। অন্যরা হলেন— মুহাম্মদ হোসেন আলী (জামায়াতে ইসলামী), হানিফ সরকার (ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ), মো. সালাহ উদ্দিন সরকার (স্বতন্ত্র), মো. জিয়াউল কবির (বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি), মাসুদ রেজা (বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল–মার্কসবাদী), আতিকুল ইসলাম (গণফ্রন্ট), জিত বড়ুয়া (স্বতন্ত্র), সরকার তাসলিমা আফরোজ (ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশ), মো. মাহবুব আলম (জাতীয় পার্টি), মোহাম্মদ ইসরাফিল মিয়া (জাতীয় পার্টি), খন্দকার রুহুল আমিন (খেলাফত মজলিশ), মোহাম্মদ শরিফুল ইসলাম (জনতার দল), মো. আব্দুল কাইয়ুম (বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল), আব্বাস ইসলাম খান (এবি পার্টি), আলী নাছের খান (এনসিপি) ও মাহফুজুর রহমান খান (গণ অধিকার পরিষদ)।
উল্লেখ্য, গাজীপুর–২ সংসদীয় আসনটি গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ১৯ থেকে ৩৯ নম্বর এবং ৪৩ থেকে ৫৭ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত। মোট ৩৬টি ওয়ার্ডের পাশাপাশি এ আসনের অন্তর্ভুক্ত রয়েছে রাজেন্দ্রপুর ক্যান্টনমেন্ট এলাকা।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, এ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৮ লাখ ৪ হাজার ৩৩৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৪ লাখ ৪০১ জন, নারী ভোটার ৪ লাখ ৯১৯ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন ১৩ জন।
গাজীপুর–২ আসনে মোট ভোটকেন্দ্র রয়েছে ২৭২টি। ভোটকক্ষের সংখ্যা ১ হাজার ৪৮৯টি, যার মধ্যে ১ হাজার ৩৯৯টি স্থায়ী এবং ৯০টি অস্থায়ী ভোটকক্ষ।
আরো জানতে….



