কালীগঞ্জকে আধুনিক জনপদে রূপান্তরের প্রতিশ্রুতি দিয়ে জামায়াত প্রার্থীর ইশতেহার

কালীগঞ্জকে আধুনিক জনপদে রূপান্তরের প্রতিশ্রুতি দিয়ে জামায়াত প্রার্থীর ইশতেহার

নিজস্ব সংবাদদাতা : নিরাপদ, কর্মসংস্থানমুখী, শিক্ষা ও প্রযুক্তিনির্ভর’ জনপদে রূপান্তরের লক্ষ্য নির্ধারণ করে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিজের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছেন গাজীপুর-৫ আসনের বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মনোনীত সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী মো. খায়রুল হাসান। ইশতেহারে ১০টি খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

শুক্রবার (০৬ ফেব্রুয়ারি) কালীগঞ্জ উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ ইশতেহার উপস্থাপন করা হয়।

‘আল্লাহর আইন চাই, সৎ লোকের শাসন চাই’—এই স্লোগানে প্রকাশিত ইশতেহারে খায়রুল হাসান বলেছেন, ‘আমরা শাসক হবো না, সেবক হবো।’

তিনি দাবি করেছেন, নির্বাচিত হলে দলীয় বিবেচনার ঊর্ধ্বে থেকে সৎ, যোগ্য ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের সমন্বয়ে সেক্টরভিত্তিক উন্নয়ন কমিটি গঠন করা হবে।

ঘোষিত ইশতেহারে গাজীপুর-৫ কে একটি নিরাপদ, কর্মসংস্থানমুখী, শিক্ষা ও প্রযুক্তিনির্ভর এবং ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক আধুনিক জনপদে রূপান্তরের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

ইশতেহার ঘোষণা অনুষ্ঠানে ছিলেন সাবেক সচিব শেখ এ কে মোতাহার হোসেন, তামিরুল মিল্লাত কামিল মাদ্রাসা সাবেক অধ্যক্ষ ও জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মাওলানা যাইনুল আবেদিন, জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিসের শূরা সদস্য ও গাজীপুর জেলা জামায়াতের আমির ড. জাহাঙ্গীর আলম প্রমূখ।

ইশতেহারে যে ১০টি খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে তা হলো, সবার জন্য নিরাপত্তা ও পরিবেশ সংরক্ষণ, সামাজিক অনাচার প্রতিরোধ ও মানবিক মূল্যবোধের বিকাশ, শিক্ষা ও সংস্কৃতি, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো ও সার্বিক উন্নয়ন, যুব ও ক্রীড়া, দুস্থ ও অসহায় পুনর্বাসন, কর্মসংস্থান, তথ্য ও প্রযুক্তি এবং কৃষি, শিল্প ও বাণিজ্য খাত।

শিক্ষা খাতে নতুন স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের পাশাপাশি বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোর অবকাঠামো উন্নয়ন ও মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম চালুর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। মেধাবী শিক্ষার্থীদের বিশেষ কাউন্সেলিং, বিসিএসসহ প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতিতে সহায়তা এবং দরিদ্র শিক্ষার্থীদের মাসিক শিক্ষা সহায়তা প্রদানের কথা বলা হয়েছে।

স্বাস্থ্য খাতে কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আধুনিকায়ন, কমিউনিটি ক্লিনিককে ‘স্মার্ট কমিউনিটি ক্লিনিক’-এ রূপান্তর, ২৪ ঘণ্টা অ্যাম্বুলেন্স সেবা এবং নিয়মিত ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্পের আয়োজনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

অবকাঠামো খাতে টঙ্গী থেকে পূবাইল, কালীগঞ্জ হয়ে নরসিংদী-সিলেটগামী সড়ককে চার লেনে উন্নীতকরণ এবং কালীগঞ্জ উপজেলার সব কাঁচা, আধা-পাকা ও অসমাপ্ত রাস্তা, ব্রিজ ও কালভার্ট নির্মাণের কথা বলা হয়েছে। কালীগঞ্জ বাজারকে আধুনিক, পরিচ্ছন্ন ও সুশৃঙ্খল বাজারে উন্নীত করা এবং স্মার্ট ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।

কর্মসংস্থান খাতে দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ, নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য সুদবিহীন ঋণ তথা ‘কর্জে হাসানা প্রজেক্ট’, ‘ইউথ টেক ল্যাব’ স্থাপন এবং বিদেশগামীদের জন্য ভাষা শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার কথা বলা হয়েছে।

যুব ও ক্রীড়া খাতে শিশু পার্ক প্রতিষ্ঠা, কালীগঞ্জ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে ‘মিনি স্টেডিয়াম’ নির্মাণ এবং নিয়মিত টুর্নামেন্ট আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে।

নিরাপত্তা খাতে মাদক, সন্ত্রাস, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি নির্মূল এবং গাজীপুর-ইটাখোলা মহাসড়ক এলাকায় চুরি-ডাকাতি প্রতিরোধে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি ও নিয়মিত টহলের কথা বলা হয়েছে। নারীদের নিরাপত্তা ও সম্মান নিশ্চিত করতে এবং সর্বস্তরে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিতকরণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।

সামাজিক অনাচার প্রতিরোধে ইভটিজিং ও মাদক নির্মূলে ‘সামাজিক প্রতিরোধ কমিটি’ গঠন, কমিউনিটি কাউন্সেলিং সেবা এবং ‘এমপি সাহেব হিসাব চাই’ ক্যাম্পেইনের আওতায় প্রতিবছর কার্যক্রমের হিসাব তুলে ধরার কথা বলা হয়েছে।

কৃষি খাতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, ন্যায্যমূল্যে উন্নত বীজ ও সার সরবরাহ, সুদমুক্ত কৃষি ঋণ এবং জাতীয় ফল কাঁঠালের সংরক্ষণ ও রপ্তানি বৃদ্ধির উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে। এক ফসলি জমিকে দুই বা তিন ফসলি জমিতে রূপান্তর এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে কৃষিবিদ নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে।

তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ফ্রিল্যান্সিং, সফটওয়্যার, গ্রাফিক্স ও ডিজিটাল মার্কেটিং প্রশিক্ষণ, গ্রামীণ এলাকায় হাই স্পিড ইন্টারনেট সুবিধা এবং ডিজিটাল সেবা চালুর কথা বলা হয়েছে।

ইশতেহার বাস্তবায়নে তিন পর্যায়ের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রথম এক বছরে সামাজিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, যুব প্রশিক্ষণ, কৃষি সহায়তা এবং শিক্ষা খাতে জোর দেওয়া হবে। এক থেকে তিন বছরে সড়ক ও অবকাঠামো উন্নয়ন, তথ্যপ্রযুক্তি কেন্দ্র স্থাপন এবং বাজার আধুনিকায়নের কাজ করা হবে। তিন থেকে পাঁচ বছরে পরিকল্পিত শিল্প জোন স্থাপন ও বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে।

সংবাদ সম্মেলনে মো. খায়রুল হাসান বলেন, ‘এলাকার সামগ্রিক উন্নয়নে দলীয় বিবেচনার ঊর্ধ্বে থেকে সৎ, যোগ্য ও অভিজ্ঞ নবীন-প্রবীণদের সমন্বয়ে সেক্টরভিত্তিক উন্নয়ন কমিটি গঠন করা হবে। সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালনায় দলীয় প্রভাবমুক্ত, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা হবে।’

গাজীপুর-৫ সংসদীয় আসনটি জাতীয় সংসদের ১৯৮ নম্বর আসন। এই আসনটি গঠিত হয়েছে কালীগঞ্জ পৌরসভা ও কালীগঞ্জ উপজেলার সাতটি ইউনিয়ন, পাশাপাশি গাজীপুর সদর উপজেলার বাড়িয়া ইউনিয়ন এবং গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ৪০, ৪১ ও ৪২ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে।

এই আসনে প্রথমে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ফজলুল হক মিলনসহ মোট আটজন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দেন। অন্য প্রার্থীরা হলেন—মো. খায়রুল হাসান (জামায়াতে ইসলামী), মো. আল আমিন দেওয়ান (ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ), কাজল ভূঁইয়া (গণফোরাম), মো. আজম খান (জনতার দল), রুহুল আমিন (বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস), গাজী আতাউর রহমান (ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ) এবং ডা. মো. সফিউদ্দিন সরকার (জাতীয় পার্টি)।

গত ৩ জানুয়ারি মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের সময় রিটার্নিং কর্মকর্তা খেলাফত মজলিস ও জাতীয় পার্টির দুই প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল করেন। পরে আপিলের মাধ্যমে তারা দুজনই প্রার্থিতা ফিরে পান। তবে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিনে খেলাফত মজলিসের প্রার্থী নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান।

নির্বাচন কমিশনের সর্বশেষ হালনাগাদ ভোটার তালিকা অনুযায়ী, এই আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৫০ হাজার ৯৬৬ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৭৬ হাজার ৬১ জন, নারী ভোটার ১ লাখ ৭৪ হাজার ৯০৩ জন এবং হিজড়া ভোটার রয়েছেন ২ জন। ভোট গ্রহণের জন্য এ আসনে ১২৪টি ভোটকেন্দ্রের ৬৭৮টি কক্ষ প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

এছাড়াও পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিতে নিবন্ধন করেছেন ৩ হাজার ৩২ পুরুষ এবং ৬৪৫ নারীসহ মোট ৩ হাজার ৬৭৭ জন ভোটার।

তফসিল অনুযায়ী, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।