যুদ্ধের এক মাস পেরিয়ে কূটনৈতিক তৎপরতার দাবি ও পাল্টা অস্বীকারের মধ্যে প্রশ্ন উঠছে — কোন পক্ষ সত্য বলছে, আর কে বলছে কৌশলগত মিথ্যা?
গাজীপুর কণ্ঠ, আন্তর্জাতিক ডেস্ক : মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করছেন, ইরানের সঙ্গে ‘ফলপ্রসূ’ আলোচনা চলছে। অন্যদিকে তেহরান বলছে, এ ধরনের কোনো কথাবার্তাই হয়নি।
যুদ্ধের ধোঁয়াশা আর সব পক্ষের প্রচারণার মধ্যে কাকে বিশ্বাস করবেন — সেটা বোঝা কঠিন। তবে প্রতিটি পক্ষ এই পরিস্থিতি থেকে কী পেতে চাইছে, সেই বিশ্লেষণ কিছুটা স্পষ্টতা দিতে পারে।
ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের এক ‘শীর্ষ’ কর্মকর্তার সঙ্গে ‘খুব ভালো’ আলোচনায় ‘গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ঐকমত্য’ হয়েছে। নাম অবশ্য প্রকাশ করেননি।
এই মন্তব্য এসেছে মার্কিন শেয়ারবাজার সপ্তাহের প্রথম দিন খোলার ঠিক সময়ে। আর ইরানকে সাড়া দিতে দেওয়া পাঁচ দিনের সময়সীমা মিলে যাচ্ছে ট্রেডিং সপ্তাহের শেষ দিনের সঙ্গে।
গত দুই সপ্তাহে মধ্যপ্রাচ্যের ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ওঠানামা করেছে তেলের দাম — গত সপ্তাহে যা পৌঁছেছে প্রতি ব্যারেলে প্রায় ১২০ ডলারে। এই প্রেক্ষাপটে আলোচনার দাবির সময়জ্ঞান নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করছেন অনেকে।
ট্রাম্প যে ‘শীর্ষ ইরানি কর্মকর্তা’র কথা বলেছেন, অনেকের ধারণা তিনি ইরানের সংসদ স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের ঘালিবাফ।
ঘালিবাফ নিজেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়নি এবং অর্থ ও তেলবাজার নিয়ন্ত্রণ করতে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যে জলাভূমিতে আটকে গেছে সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে ভুয়া খবর ব্যবহার করা হচ্ছে।
বাজারে প্রভাব শুধু যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নয়, ইরানের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। তবে দুই পক্ষের স্বার্থ সম্পূর্ণ বিপরীত।
বাজার শান্ত রাখতে আলোচনার কথা বলা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে। আর সেই আলোচনা অস্বীকার করে বাজারে চাপ বজায় রাখা ইরানের স্বার্থে — কারণ এই অর্থনৈতিক ক্ষতিই ভবিষ্যতে হামলা ঠেকাতে কার্যকর প্রতিরোধ হিসেবে কাজ করবে বলে তেহরানের হিসাব। ফলে দুই পক্ষের প্রকাশ্য বক্তব্য দিয়ে আসল চিত্র বোঝার উপায় নেই।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, ট্রাম্প এই সংঘাত শুরু করে পরিণতি আঁচ করতে পারেননি। ইরানীয় রাষ্ট্রের টিকে থাকার ক্ষমতাও অবমূল্যায়ন করেছিলেন।
‘মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দেশগুলোয় ওরা যাবে — এটা কেউ ধরেনি,’ গত সপ্তাহে বলেছেন তিনি নিজেই — যদিও মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তারাসহ বিশেষজ্ঞরা বারবার ঠিক এই সতর্কতাই দিয়েছিলেন।
এরই মধ্যে বাজারে কিছুটা স্বস্তি আনতে কিছু ইরানি তেলের ওপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞা ছাড় দিয়েছেন ট্রাম্প — ২০১৯ সালের পর এই প্রথম।
চলতি বছরের শেষে কংগ্রেস নির্বাচন। পেট্রলের দাম বাড়ায় অখুশি ভোটাররা। রিপাবলিকানদের সম্ভাবনা ভালো নয়। এই প্রেক্ষাপটে ট্রাম্পের সামনে দুটো পথ — যুদ্ধ দীর্ঘ করে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মূল্য দেওয়া, অথবা চুক্তি করে ‘স্বল্পমেয়াদী অভিযান’ শেষ করতে না পারার সমালোচনা মাথায় নেওয়া।
তবে ট্রাম্প চাইলেই সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন না — কারণ বলটি এখন অনেকটাই ইরানের কোর্টে।
এক বছরের মধ্যে দ্বিতীয়বার আক্রান্ত ইরান কার্যকর প্রতিরোধ ছাড়া যুদ্ধ শেষ করতে কম আগ্রহী। এবারের যুদ্ধ শুরু থেকেই স্পষ্ট — ইরান কৌশল বদলেছে, সংযমে আর আগ্রহ নেই।
কট্টরপন্থী নেতৃত্বের হিসাব হলো, ইসরায়েলের ইন্টারসেপ্টর মজুদ ফুরিয়ে আসতে পারে। এই মুহূর্তে থামলে সেই মজুদ পুনরায় ভরার সুযোগ পাবে ইসরায়েল — যা তাঁরা দিতে চান না।
ইরান কিন্তু ক্ষতির বাইরে নেই। সরকারি হিসাবেই দেশটিতে দেড় হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত, বিদ্যুৎ গ্রিড হুমকিতে। উপসাগরীয় প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্ক তলানিতে।
ইরানের মধ্যপন্থী কণ্ঠস্বররা বলছেন, কিছুটা প্রতিরোধ অর্জিত হয়েছে — এখনই আলোচনায় বসার সময়। বিশেষত যদি ছাড় আদায় করা যায়: ভবিষ্যতে হামলা না করার প্রতিশ্রুতি বা হরমুজ প্রণালিতে বৃহত্তর কর্তৃত্ব।
প্রকাশ্য বক্তব্য দিয়ে আসল চিত্র বোঝার উপায় নেই — কারণ দুই পক্ষেরই নিজস্ব আখ্যান গড়ার কারণ আছে।
তবে যেটুকু স্পষ্ট: যুদ্ধ শেষ করতে হলে উভয় পক্ষকেই ছাড় দিতে হবে। ট্রাম্পকে দিতে হবে রাজনৈতিক মূল্য, ইরানকে মানতে হবে কিছু সীমাবদ্ধতা।
প্রশ্ন একটাই — দুই পক্ষই কি এখন সেই মূল্য দিতে প্রস্তুত? নাকি এই ‘আলোচনার গল্প’ আসলে পরবর্তী উত্তেজনার আগের কৌশলগত বিরামমাত্র?