ইসলামাবাদে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট, ৪৬ বছর পর মুখোমুখি ওয়াশিংটন ও তেহরান

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে দুই সপ্তাহের বিরতির মধ্যে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ঐতিহাসিক আলোচনা শুরু

ইসলামাবাদে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট, ৪৬ বছর পর মুখোমুখি ওয়াশিংটন ও তেহরান

গাজীপুর কণ্ঠ, আন্তর্জাতিক ডেস্ক

মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স শনিবার সকালে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে পৌঁছেছেন। ইরানি নেতৃত্বের সঙ্গে ঐতিহাসিক আলোচনায় অংশ নিতেই এই সফর, যা দুই দেশের সম্পর্কে একটি ‘সংকটনির্ণায়ক’ মুহূর্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

নুর খান বিমান ঘাঁটিতে অবতরণের পর ভ্যান্সকে স্বাগত জানান পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ইসহাক দার এবং সেনাপ্রধান ও প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির।

চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে ব্যাপক অভিঘাত সৃষ্টি করে। গত ৮ এপ্রিল পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়, যার আওতায় দুই সপ্তাহের বিরতিতে এই আলোচনা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

শনিবার ভোরে ইরানি প্রতিনিধিদল ইসলামাবাদে পৌঁছায়। লেবাননে ইসরায়েলি হামলার প্রশ্নে শেষ মুহূর্তে বাধা তৈরি হলেও তা কেটে গেলে তেহরানের দল যাত্রা করে। ইরান আলোচনায় যোগ দেওয়ার আগে লেবাননে হামলা বন্ধের শর্ত দিয়েছিল, যা পাকিস্তান মার্কিন-ইরান যুদ্ধবিরতির অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছে বলে জানানো হয়।

মার্কিন প্রতিনিধিদলে ভ্যান্সের পাশে রয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার এবং মধ্যপ্রাচ্য দূত স্টিভ উইটকফ। জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ, পররাষ্ট্র দপ্তর ও প্রতিরক্ষা দপ্তরের কর্মকর্তারাও দলে রয়েছেন।

ইরানি প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন সংসদ স্পিকার মোহাম্মদ বাগের গালিবাফ। তাঁর সঙ্গে আছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি, সুপ্রিম ন্যাশনাল ডিফেন্স কাউন্সিলের সচিব আলী আকবর আহমাদিয়ান এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আবদোলনাসের হেম্মাতি।

এই আলোচনা ১৯৭৯ সালের পর ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে প্রথম সরাসরি উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। তবে বৈঠকটি একাধিকবার ভেস্তে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল।

শুক্রবার সন্ধ্যায় গালিবাফ স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ইরানের অংশগ্রহণ দুটি শর্তের ওপর নির্ভরশীল—লেবাননে যুদ্ধবিরতি এবং বিদেশে আটকে থাকা প্রায় ৭০০ কোটি মার্কিন ডলারের ইরানি সম্পদ মুক্তি। তিনি বলেন, আলোচনা শুরুর আগেই এই পদক্ষেপগুলো নিশ্চিত করতে হবে।

ইরানের এক কর্মকর্তা জানান, বৈরুত ও দাহিয়েহতে হামলা বন্ধ করাকে ‘রেড লাইন’ ঘোষণা করেই তারা বিরতি আদায় করেছেন এবং পুনরায় হামলা হলে আলোচনা ভেঙে পড়বে বলে সতর্ক করেছেন।

মূল বিষয়গুলোতে দুই পক্ষের অবস্থান এখনো দূরত্বে। যুক্তরাষ্ট্র চাইছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিতে বিধিনিষেধ—ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণে সীমা এবং পারমাণবিক উপকরণ সরানো। অন্যদিকে ইরান দাবি করছে পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, পারমাণবিক অধিকারের স্বীকৃতি, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের কাঠামো এবং আটকে পড়া তহবিলে প্রবেশাধিকার।

এ ছাড়া আঞ্চলিক প্রক্সি নেটওয়ার্ক, ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা এবং ছাড় দেওয়ার ক্রমবিন্যাস নিয়েও মতবিরোধ বিদ্যমান।

ওয়াশিংটন থেকে রওনা হওয়ার আগে ভ্যান্স আলোচনার সম্ভাবনাকে ‘ইতিবাচক’ বলে বর্ণনা করেন এবং ‘কালক্ষেপণের কৌশলে’ আমেরিকা সাড়া দেবে না বলে সতর্ক করেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আরও কঠোর অবস্থান নিয়ে বলেছেন, ইরানের হাতে ‘বেশি তাস নেই’ এবং আলোচনা ব্যর্থ হলে সামরিক অভিযান আবার শুরু হতে পারে।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ বলেছেন, আলোচনা সফল করতে তাঁর দেশ ‘সর্বোচ্চ চেষ্টা’ করবে।

বিশ্লেষক ও কর্মকর্তারা মনে করছেন, দুই দিনের এই প্রথম দফা আলোচনায় বড় কোনো অগ্রগতি আশা করা বাস্তবসম্মত নয়। সর্বোচ্চ যা হতে পারে তা হলো ভবিষ্যৎ আলোচনার একটি রূপরেখা তৈরি বা তাৎক্ষণিক উত্তেজনা প্রশমনে সীমিত ঐকমত্য।

লেবাননে অব্যাহত সহিংসতা, পারস্য উপসাগরে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন এবং দুই দেশের মধ্যে গভীর অবিশ্বাস—এই পরিস্থিতিতেই ইসলামাবাদে শুরু হচ্ছে কূটনীতির এক বিরল অধ্যায়।